Ajker Patrika

২০০ উপকারভোগী, ৪০০ ছাগল—বিতরণ নিয়ে যত প্রশ্ন

ইউসুফ আরাফাত, ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম)
২০০ উপকারভোগী, ৪০০ ছাগল—বিতরণ নিয়ে যত প্রশ্ন
ছাগল বিতরণ করছেন প্রকল্পের মাঠ সহকারী থোয়াইংনিং মার্মা। ছবি: সংগৃহীত

সরকারি নথিতে ২০০ উপকারভোগীর হাতে ৪০০টি ছাগলসহ বিভিন্ন উপকরণ বিতরণের তথ্য রয়েছে। বিতরণের প্রমাণ হিসেবে মাস্টাররোলে রয়েছে উপকারভোগীদের স্বাক্ষরও। তবে মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে ওই হিসাবের সঙ্গে বাস্তবতার বড় ধরনের অমিলের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

কয়েকজন উপকারভোগী জানিয়েছেন, তাঁদের নামে মাস্টাররোলে যে স্বাক্ষর দেখানো হয়েছে, সেটি তাঁদের নয়। শুধু তা-ই নয়, ছাগল পাওয়া কয়েকজন উপকারভোগীর অভিযোগ, বিতরণের এক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁদের ছাগল অসুস্থ হয়ে মারা গেছে।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে সমতল ভূমিতে বসবাসরত অনগ্রসর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়নে নেওয়া ‘সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের’ আওতায় দুই দফায় ছাগল, খাদ্য, ফ্লোর ম্যাট, সিআই শিট ও কংক্রিট পিলার বিতরণের তথ্য রয়েছে সরকারি নথিতে। তবে নথিতে বিতরণের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে তার সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাওয়া যায়নি।

মাস্টাররোলে স্বাক্ষর নিয়ে প্রশ্ন

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে সরবরাহ করা মাস্টাররোল অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পর্যায়ে ১০০ উপকারভোগীর প্রত্যেককে দুটি করে ছাগল, ২৫ কেজি খাদ্য, পাঁচটি ফ্লোর ম্যাট ও ২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা দেওয়ার কথা। দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ১০০ উপকারভোগীকে দুটি করে ছাগল, ৫০ কেজি খাদ্য, পাঁচটি ফ্লোর ম্যাট, দুটি সিআই শিট ও চারটি কংক্রিট পিলার দেওয়ার তথ্য রয়েছে।

প্রথম পর্যায়ের বিতরণের শেষ সময় ছিল ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। দুই পর্যায়ের মাস্টাররোলে উপকারভোগীদের নাম, পিতা বা স্বামীর নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর ও স্বাক্ষর রয়েছে।

এসব তথ্যের ভিত্তিতে ২২ থেকে ২৪ আগস্ট দাঁতমারা ইউনিয়নের সোনারখীল ও পেলারখীল, নারায়ণহাটের নেপচুন এবং বাগানবাজারের রামগড় চা-বাগান এলাকায় সরেজমিন কয়েকজন উপকারভোগীর তথ্য যাচাই করা হয়।

এ সময় লালমতি ত্রিপুরা, ললিন্দ্র ত্রিপুরা, কাঞ্চন কুমার ত্রিপুরা, মজিব ত্রিপুরা, সশিন্দ্র ত্রিপুরা, মাধুরী ত্রিপুরা, কাঞ্চন মালা ত্রিপুরা, নিরেন্দ্র ত্রিপুরা, সোনালক্ষ্মী ত্রিপুরা, সংগ্রাম ত্রিপুরা, শিবু কুমার ত্রিপুরা, মনিবালা ত্রিপুরা ও চাকষী ত্রিপুরা জানান, তাঁরা মাস্টাররোলে স্বাক্ষর করেননি। তবে তাঁদের নাম, পিতা বা স্বামীর নাম, মোবাইল নম্বর ও ঠিকানা সঠিক রয়েছে বলে তাঁরা নিশ্চিত করেন।

স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই ছাগল বিতরণের অভিযোগ

প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী, উপকারভোগীদের মধ্যে ছাগল বিতরণের আগে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা ছাগল প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভেটেরিনারি সার্জনের মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পিপিআর টিকা দেওয়ার কথা। এরপর সংক্রমণমুক্ত ও সুস্থ ছাগল উপকারভোগীদের মধ্যে বিতরণের বিধান রয়েছে।

তবে অনুসন্ধানে অভিযোগ পাওয়া গেছে, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই তড়িঘড়ি করে ছাগলগুলো বিতরণ করা হয়েছে। বিতরণের আগে প্রকল্পের বিতরণ কমিটির সভাপতি ও অন্য সদস্যদের যথাযথভাবে অবহিত করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এমনকি প্রকল্প পরিচালকের স্বাক্ষরিত কার্যাদেশের কপি হাতে পাওয়ার আগেই নিয়মবহির্ভূতভাবে ছাগল বিতরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশের মাধ্যমে দ্রুত ছাগল বিতরণ করা হয়েছে।

ফলে বিতরণের আগে ছাগলগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পিপিআর টিকা প্রদান ও সংক্রমণমুক্ত করার প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আরও অনুসন্ধানে দেখা যায়, কোন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ছাগলগুলো সরবরাহ করেছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয়। ছাগল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের নাম, সরবরাহ-সংক্রান্ত নথি, স্বাস্থ্য পরীক্ষার সনদ কিংবা টিকাদানের স্বতন্ত্র রেকর্ডও কার্যালয় থেকে পাওয়া যায়নি।

নগদ সহায়তা নিয়েও ভিন্ন তথ্য

প্রথম পর্যায়ের ১০০ উপকারভোগীর প্রত্যেককে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে মোট ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা নগদ সহায়তা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এই অর্থ বিতরণের কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ অর্থ বিতরণের পৃথক রসিদ বা ভাউচার, ব্যাংক কিংবা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের লেনদেনের নথিও পাওয়া যায়নি।

প্রকল্পের ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর থোয়াইংনিং মার্মা বলেন, ‘২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তার বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। ফলে অর্থ বিতরণ করা হয়নি।’

তবে তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবদুল মমিন। তাঁর দাবি, ‘প্রকল্পের সব উপকরণ ও অর্থ উপকারভোগীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে, প্রকল্পটি শেষ পর্যায়ে রয়েছে।’

একই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্য নগদ সহায়তার অর্থ ছাড় ও বিতরণ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

উপকরণ বিতরণেও অমিল

প্রথম পর্যায়ে প্রত্যেক উপকারভোগীকে পাঁচটি করে ফ্লোর ম্যাট দেওয়ার কথা থাকলেও সরেজমিন যাচাই করা অধিকাংশ উপকারভোগী তা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেননি। তবে তাঁরা ২৫ কেজি করে দানাদার খাদ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

দ্বিতীয় পর্যায়েও খাদ্য বিতরণের পরিমাণ নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। সরকারি নথিতে ৫০ কেজি করে খাদ্য দেওয়ার কথা থাকলেও কয়েকজন উপকারভোগী জানিয়েছেন, তাঁরা এর অর্ধেক পরিমাণ খাদ্য পেয়েছেন।

দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রত্যেক উপকারভোগীকে দুটি করে সিআই শিট ও চারটি করে কংক্রিট পিলার দেওয়ার কথা। সে হিসাবে ১০০ উপকারভোগীর মধ্যে ২০০টি সিআই শিট ও ৪০০টি কংক্রিট পিলার বিতরণের তথ্য রয়েছে। কিন্তু সরেজমিন যাচাই করা উপকারভোগীদের বাড়িতে এসব উপকরণ দিয়ে গৃহনির্মাণের চিত্র পাওয়া যায়নি। ফলে নথিতে দেখানো এসব উপকরণ আদৌ বিতরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

৩০ ছাগলের ২৭টিই মারা গেছে

প্রকল্পের আওতায় বিতরণ করা ছাগলের মৃত্যুর ঘটনাও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

দ্বিতীয় পর্যায়ে যাচাই করা ১৫ জন উপকারভোগীর মধ্যে ১২ জনের দুটি করে এবং তিনজনের একটি করে ছাগল মারা গেছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই ১৫ জনের পাওয়া মোট ৩০টি ছাগলের মধ্যে ২৭টিই মারা গেছে।

দাঁতমারা ইউনিয়নের পেলারখীল ত্রিপুরাপাড়ার কয়েকজন উপকারভোগী জানান, ছাগলগুলো পাওয়ার সময়ই দুর্বল ছিল। কেউ কেউ ছাগল পাওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই সেগুলো মারা যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

নারায়ণহাট ইউনিয়নের নেপচুন চা-বাগানের শ্রমিক সংগ্রাম ত্রিপুরা এবং রামগড় চা-বাগানের শিবু কুমার ত্রিপুরা ও মনিবালা ত্রিপুরা জানান, ছাগল পাওয়ার সময় সেগুলো দুর্বল ছিল। বিতরণের এক সপ্তাহের মধ্যেই ছাগল মারা যায়। বিষয়টি তদারকি কর্মকর্তাকে জানানোর পরও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাঁদের অভিযোগ।

তবে মৃত ছাগলের ছবি, ভিডিও কিংবা চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি না থাকায় মৃত্যুর কারণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কয়েকজন উপকারভোগী ছাগলের ওজন কম ছিল বলেও অভিযোগ করেছেন। এ ছাড়া বিতরণের সময় ছাগলের ওজন যাচাইয়ের কোনো স্বতন্ত্র রেকর্ড, স্বাস্থ্য সনদ বা টিকাদানের নথি-সংশ্লিষ্ট কার্যালয় থেকে পাওয়া যায়নি।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবদুল মমিন বলেন, ‘বিতরণের সময় ছাগলগুলো সুস্থ-সবল ছিল। পরে উপকারভোগীদের পরিচর্যার ঘাটতি ও পরিবেশগত সমস্যার কারণে ছাগল মারা যেতে পারে।’

ইউএনওকে জানানো হয়নি

প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ছাগল বিতরণের আগে বিতরণ কমিটির চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জরুরি ভিত্তিতে অবহিত করার কথা অফিস আদেশে উল্লেখ থাকলেও ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীমকে বিষয়টি জানানো হয়নি।

এ বিষয়ে ইউএনও সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ‘ছাগল বিতরণের বিষয়টি আমাকে অবহিত করা হয়নি। বিষয়টি দুঃখজনক। সরকারি নিয়মনীতি অনুসরণ করে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করব।’

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর বলেন, ‘ছাগল বিতরণ করা হয়েছে, এটি ঠিক।’ তবে রোগাক্রান্ত ছাগল বিতরণের অভিযোগের বিষয়ে তিনি প্রকল্প পরিচালকের দায় রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে এর জন্য প্রকল্পের মাঠ কর্মকর্তাকে দায়ী করেন তিনি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত