Ajker Patrika

‘ইরানিদের হাতেই হবে তেহরানের শাসন পরিবর্তন, শুরুটা আগামী বছরই’

মার্কিন অর্থনীতিবিদ ও পরামর্শক ড. নুরিয়েল রুবিনি—যিনি ড. ডুম নামেও পরিচিত—ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, আগামী এক বছরের মধ্যেই ইরানের বর্তমান রেজিমের পতন ঘটবে। ইরানি রেজিমের এই পরিবর্তন মধ্যপ্রাচ্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলে মনে করেন তিনি। এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে। অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান।

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭: ৫৯
ড. নুরিয়েল রুবিনি। ছবি: এএফপি
ড. নুরিয়েল রুবিনি। ছবি: এএফপি

গত নভেম্বরেই আমি পূর্বাভাস দিয়েছিলাম, ইসরায়েল সম্ভবত ইরানের পারমাণবিক ও অন্যান্য সামরিক স্থাপনায় হামলা চালাবে, এমনকি ‘শাসকগোষ্ঠীর শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাদের’ নির্মূল করার পথেও হাঁটতে পারে। আমি তখন আরও বলেছিলাম, যেকোনো মার্কিন প্রশাসন অবশ্যম্ভাবীভাবেই ইসরায়েলকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়ে যাবে।

গাজায় যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে ইসরায়েলের ভেতরে গভীর বিভাজন থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে—প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্য-বাম সমালোচকদের মধ্যেও—বিস্তৃত ঐকমত্য ছিল যে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, যা ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। বরং বেনি গান্তজ ও ইয়ার লাপিদের মতো মধ্যপন্থী নেতারা নেতানিয়াহুকে ইরানের ব্যাপারে নরম অবস্থানের জন্য সমালোচনা করেছিলেন।

ইরান যে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে হামাস, হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি এবং সিরিয়া ও ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছিল, তারপর ইসরায়েলের ইরানে আঘাত হানা কেবল সময়ের ব্যাপার ছিল। ইসরায়েল এসব প্রক্সিকে ব্যাপকভাবে ধ্বংস করার পর এবং ইরান তার কৌশলগত প্রতিরোধক্ষমতা হারানোর পর তেহরানের সামনে একমাত্র পথ ছিল পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন—যা ইসরায়েল ও সামগ্রিকভাবে পশ্চিমা বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের হামলা অনিবার্য হয়ে ওঠে। আর যেহেতু ইরানের কিছু শক্তভাবে সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনা ইসরায়েলি অস্ত্রের আঘাত সহ্য করতে সক্ষম ছিল, তাই এটি স্পষ্ট ছিল যে, পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ করতে হবে, যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকগোষ্ঠীর মধ্যে হস্তক্ষেপবিরোধী মনোভাব প্রবল।

জবাবে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে ইসরায়েলে পাল্টা আঘাত হানে এবং এখন অঞ্চলটিতে থাকা মার্কিন বাহিনীগুলোকে হুমকি দিচ্ছে। কিন্তু শাসনব্যবস্থা এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, তারা নিজেদেরই ঠিকমতো রক্ষা করতে পারছে না, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর বিরুদ্ধে সীমিত অস্ত্র ব্যবহার করা তো দূরের কথা। হ্যাঁ, কিছু শিয়া মিলিশিয়া অঞ্চলজুড়ে সুরক্ষিত মার্কিন ঘাঁটি ও সেনাদের ওপর হামলার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু আরও কঠোর মার্কিন ও ইসরায়েলি পাল্টা আঘাতের ঝুঁকি বাদ দিলেও তারা যে ক্ষতি করতে পারে, তা সীমিতই থাকবে।

এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি অবরোধ, পারস্য উপসাগরে মাইন পেতে রাখা কিংবা আরব প্রতিবেশীদের জ্বালানি উৎপাদন স্থাপনা ও পাইপলাইনে হামলা চালানোর ইরানি শাসনের সক্ষমতা ও আগ্রহ এখন অনেকটাই কমে গেছে। শাসনব্যবস্থা আপাতত টিকে থাকার দিকেই মনোযোগ দিচ্ছে, তবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এর পতন ঘটার সম্ভাবনা প্রবল।

এ কথা সত্য যে, আপাতত ইসরায়েলের হামলা এমনকি শাসনবিরোধী শক্তিগুলোকেও ‘জাতীয় পতাকার নিচে’ একত্র করেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যে বিপুলসংখ্যক ইরানি এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে ঘৃণা করে—যা দেশকে অর্থনৈতিক ও আর্থিক ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে এবং এখন ভূরাজনৈতিক ও সামরিক বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে—তারা এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে এবং এর পরিবর্তে অন্য কিছু প্রতিষ্ঠা করবে। ১৯৯০ সালে ইরানের মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ইসরায়েলের সমান ছিল; আজ ইসরায়েলের মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ১৫ গুণ বেশি। ইরানের জ্বালানি মজুত সৌদি আরবের সমান, এমনকি তারচেয়েও বেশি হতে পারে, অথচ গত পাঁচ দশক ধরে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে অর্থহীন সংঘাতে জড়িয়ে তারা সম্ভাব্য শত শত বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আয় হারিয়েছে।

আজ ইরানিরা আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতি, বাস্তব আয়ের পতন, ব্যাপক দারিদ্র্য এমনকি ক্ষুধার মুখোমুখি। এর কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং তাদের শাসকদের অবাস্তব ও অযৌক্তিক নীতিমালা। যে দেশটি উপসাগরীয় যেকোনো তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্রের চেয়ে ধনী হতে পারত, তা এখন প্রায় দেউলিয়া—শাসনব্যবস্থায় দুর্নীতি, অদক্ষতা ও কৌশলগত বেপরোয়াপনার কারণে।

নিজ জনগণের জন্য অভিশাপ হওয়ার পাশাপাশি ইসলামি প্রজাতন্ত্রটি কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে’ অর্থায়ন করেছে এবং ইয়েমেন, লেবানন, সিরিয়া, গাজা বা ফিলিস্তিন ও ইরাকে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা বা আধা ব্যর্থতার জন্য দায়ী। মধ্যপ্রাচ্যের ব্যর্থ ও ভঙ্গুর রাষ্ট্রগুলোকে স্থিতিশীল করা ও পুনর্গঠনের জন্য এখন ইরানে শাসন পরিবর্তন অপরিহার্য। ইরানি জনগণই—বাইরের কোনো শক্তি নয়—আগামী এক বছরের মধ্যে সেই পরিবর্তনের সূচনা করবে। গত কয়েক দশকে ইরানিরা অন্তত ছয়বার তাদের শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে এবং সুযোগ পেলে তারা সব সময়ই ধর্মতান্ত্রিক উগ্রপন্থীদের বদলে মধ্যপন্থী নেতাদের বেছে নিয়েছে।

আপাতত আর্থিক বাজারগুলো সঠিকভাবেই ধারণা করছে যে—সাম্প্রতিক এই যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাব সীমিতই থাকবে। তেলের দাম, যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক শেয়ারবাজার, বন্ডের সুদের হার এবং মুদ্রাবাজারের বর্তমান গতিবিধি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পারস্য উপসাগর থেকে উৎপাদন ও জ্বালানি রপ্তানিতে বড় ধরনের বিঘ্নের ফলে মারাত্মক স্থবির-মূল্যস্ফীতি (স্ট্যাগফ্লেশন) সৃষ্টির ঝুঁকি এখনো কেবল একটি পার্শ্বঝুঁকি, মূল দৃশ্যপট নয়।

১৯৭৩ সালের ইয়োম কিপ্পুরের যুদ্ধ ও ১৯৭৯ সালের ইরানের ইসলামি বিপ্লব তেলের দামে ব্যাপক উল্লম্ফন ঘটিয়েছিল, যা ১৯৭৪-৭৫ ও ১৯৮০-৮২ সালের তীব্র স্থবির-মূল্যস্ফীতির জন্ম দেয়। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, নানা কারণে—তেল আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে ভোগ ও উৎপাদনে জ্বালানির ব্যবহার ১৯৭০-এর দশকের তুলনায় অনেক কম; যুক্তরাষ্ট্রসহ নতুন বড় ওপেকের বাইরের জ্বালানি উৎপাদকদের উত্থান ঘটেছে; সৌদি আরব ও অন্যান্য দেশ বড় ধরনের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ও মজুত ব্যবহার করতে পারছে।

আর যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধে সম্পৃক্ততার ফলে যদি তেলের দাম বাড়ে এবং নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়, তবে স্থবির-মূল্যস্ফীতির প্রভাব কমাতে নানামুখী সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি ও অন্যান্য উপায় ব্যবহার করা যেতে পারে।

একটি পারমাণবিক শক্তিধর ইরান কেবল ইসরায়েলের জন্যই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের সব সুন্নি শাসনব্যবস্থা, নিকটবর্তী ইউরোপ এবং শেষপর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও হুমকি হয়ে উঠত। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ এমন কথাই বলেছেন, যা অনেক বিশ্বনেতা মনে করেন, কিন্তু প্রকাশ্যে বলতে চান না—‘ইসরায়েল আমাদের সবার হয়ে নোংরা কাজটা করছে।’ এমনকি ইরানের কার্যত মিত্র চীন ও রাশিয়াও সংযম দেখিয়েছে।

চরমপন্থী শক্তিগুলো দশকের পর দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করেছে, যার প্রভাব সন্ত্রাসবাদ, রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ও ব্যাপক অভিবাসনের মাধ্যমে ইউরোপ ও পশ্চিমা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। অবশেষে ইসরায়েলই শিয়া চরমপন্থী শক্তি ও তাদের প্রক্সিগুলোকে দুর্বল করে পরে ধ্বংস করেছে।

ইরানে শাসনব্যবস্থার পতন, আশা করা যায়, অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে এবং পুনর্গঠনের পথ খুলে দেবে; একই সঙ্গে ইসরায়েল ও সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সুযোগ তৈরি করবে। এরপর ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে শান্তির ব্যাপারে আরও উন্মুক্ত একটি নতুন ইসরায়েলি সরকার এবং শেষপর্যন্ত দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাও সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন ইরানি হাইড্রা রেজিমের জায়গায় এমন এক যুক্তিবাদী শাসনব্যবস্থার আবির্ভাব, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আক্রমণ করার বদলে তার সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হতে আগ্রহী হবে।

লেখক: ড. নুরিয়েল রুবিনি। তাঁকে ‘ড. ডুম’ বলার পেছনে মূল কারণ হলো বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ে তাঁর অতিমাত্রায় নেতিবাচক বা হতাশাবাদী পূর্বাভাস। বিশেষ করে, ২০০৮ সালের ভয়াবহ আর্থিক মন্দার বিষয়ে তিনি আগেভাগেই যে নিখুঁত সতর্কবাণী দিয়েছিলেন, তা তাঁকে এই তকমা এনে দেয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্টার্ন স্কুল অব ইকোনমিকসের ইমেরিটাস অধ্যাপক।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

নির্বাচনের পর কী করবেন ড. ইউনূস, জানাল প্রেস উইং

বাংলাদেশে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচনের নতুন ব্যাখ্যা দিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন

৫১ বছর পর মার্কিন আকাশে ডুমসডে প্লেন, পারমাণবিক যুদ্ধের শঙ্কায় কাঁপছে সোশ্যাল মিডিয়া

নিজের চরকায় তেল দাও—মামদানিকে ভারতের তিরস্কার

বিদেশে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীর নির্দেশে খুন হন মুছাব্বির, পাঠানো হয় ১৫ লাখ টাকা

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত