Ajker Patrika

২০২৬ সালে ইন্দিরার পদাঙ্ক অনুসরণ করে মমতা কি ফিরে আসতে পারবেন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
২০২৬ সালে ইন্দিরার পদাঙ্ক অনুসরণ করে মমতা কি ফিরে আসতে পারবেন
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও ইন্দিরা গান্ধী। ছবি: দ্য টেলিগ্রাফের সৌজন্যে

বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন রাজনৈতিক মহলে একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে—তিনি কি ১৯৭৭ সালের ইন্দিরা গান্ধীর মতো প্রত্যাবর্তন করতে পারবেন? তাঁর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও অনমনীয় মনোভাব দেখে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, তিনি এত সহজে মাঠ ছেড়ে বা রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাওয়ার পাত্রী নন।

গত ২১ জুলাই শহীদ দিবসের র‍্যালির জেরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কলকাতার ক্যাথেড্রাল রোডে অনুষ্ঠিত ওই সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা আড়াই হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার জন্য কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ ছিল। কিন্তু দলীয় কর্মী-সমর্থকদের বাঁধভাঙা জোয়ারে সেই নির্দেশ টেকেনি। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবির নিজেদের আসল তৃণমূল বলে দাবি করার চেষ্টা করলেও, তৃণমূলের মূলধারার কর্মীরা মমতার ডাকেই রাজপথে সমবেত হন।

সমাবেশের মঞ্চ থেকে নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে মমতা হুংকার দিয়ে বলেন, ‘খেলা হবে! কিছুক্ষণ প্র্যাকটিস করুন। এবার ব্যাট ও বলের খেলা শুরু হবে।’

১৯৭৭-এর ইন্দিরা বনাম ২০২৬-এর মমতা: মিলগুলো কোথায়

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে দল বড় ধরনের পতনের মুখে পড়ার প্রায় তিন মাস পর, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেন ১৯৭৭ সালের ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক কৌশল থেকেই পাঠ নিচ্ছেন। দল এবং নিজের ভেঙে পড়া ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের জন্য তিনি সরাসরি সংঘাতের পথ বেছে নিয়েছেন।

সাবেক আমলা ও রাজ্যসভার সংসদ সদস্য জওহর সরকার দ্য টেলিগ্রাফ অনলাইনকে বলেন, ‘মমতারও ঠিক তাঁর মতো লড়াই করে ঘুরে দাঁড়ানোর বিরল ক্ষমতা রয়েছে।’

ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে ১৯৭৭ সালের ইন্দিরা গান্ধী এবং বর্তমানের মমতার রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে বেশ কিছু মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থার পর দেশজুড়ে কংগ্রেস যখন ধরাশায়ী হয়েছিল, তখন দমে না গিয়ে ইন্দিরা গান্ধী দ্রুত জনতার মাঝে ফিরে এসেছিলেন। ঠিক একইভাবে, পরাজয়ের বেদনা ভুলে মমতাও সরাসরি রাজপথের রাজনীতির পথ বেছে নিয়েছেন।

সাংবাদিক নীরজা চৌধুরীর ‘হাউ প্রাইম মিনিস্টারস ডিসাইড’ বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, সেই সময় তরুণ কংগ্রেস নেত্রী অম্বিকা সোনিকে ইন্দিরা বলেছিলেন, ‘মুখে কান্নার ভাব রাখবে না। সব সময় হাসিখুশি থাকবে। চামড়া মোটা করতে হবে, পাতা উল্টে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’ বিশ্লেষকদের মতে, পরাজয়ের পর মমতার আচরণেও সেই মানসিকতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

ইন্দিরা গান্ধীর মতো মমতাও দলে সুবিধাবাদী ও ক্ষতিকর অংশকে ছেঁটে ফেলার ঘোষণা দিয়েছেন। ২১ জুলাইয়ের মঞ্চে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘বিজেপির পাশবালিশ (কোলের বালিশ) হয়ে কাজ করা বন্ধ করুন। ওই চোরেরা বিজেপিতে চলে গেছে। আমি তাদের আর কখনো দলে ফিরিয়ে নেব না।’

মোরারজি দেশাইয়ের আমলে ইন্দিরা গান্ধী মনে করতেন, তাঁর বাড়িতে আড়িপাতা হয়েছে। তাই তিনি বাড়ির ভেতরের বদলে বাগানে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে দেখা করতেন, কথা বলতেন।

অন্যদিকে নির্বাচনে হারের পর সম্প্রতি বারুইপুরে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার এক শিশুর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যেতে পারেননি মমতা। তাঁর অভিযোগ, কালিঘাটের বাড়ির সামনে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করে তাঁকে কার্যত ‘গৃহবন্দী’ রাখা হয়েছিল।

ক্ষমতার পটপরিবর্তনের ঠিক পরপরই ইন্দিরা যেমন আধ্যাত্মিক আশ্রয়ের জন্য হরিদ্বারে আনন্দময়ী মার কাছে ছুটে গিয়েছিলেন, মমতাও ভোটের পর পরই কালীমন্দিরে গিয়ে পুজো দেন। এমনকি পরাজয়ের মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি সোনিয়া ও রাহুল গান্ধীর সঙ্গেও গোপন ও প্রকাশ্য বৈঠক করেন।

সুযোগ করে দিচ্ছেন শুভেন্দু

জওহর সরকারের মতে, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের কিছু পদক্ষেপ মমতার জন্য রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করছে। তিনি বলেন, ‘হকার উচ্ছেদ, রেড রোড থেকে মুসলিমদের সরানো, নির্দিষ্ট এলাকায় বুলডোজার অভিযান—সবকিছু খুব দ্রুত করা হচ্ছে। উত্তর ভারতের যোগী আদিত্যনাথ ধাঁচের প্রশাসনিক মডেল মমতার জন্য সুযোগ তৈরি করছে।’

মমতাও এ সুযোগ কাজে লাগানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। সাম্প্রতিক এসব ঘটনার পর তিনি বলেছেন, ‘আমি এবার জেলা থেকে জেলায় ঘুরব। কোথাও সভার অনুমতি দিচ্ছে না পুলিশ। আমি হার মানব না। অনুমতি না দিলে রাস্তায় হাঁটব।’ তিনি আরও বলেন, দিল্লির সরকার টালমাটাল হলে কলকাতার সরকারও কেঁপে উঠবে।

জওহর সরকারের মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারও আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এখন সারা ভারতে বিজেপিই প্রধান প্রতিপক্ষ। আগের মতো প্রভাবশালী ও কৌশলী শক্তি আর মোদি সরকারের নেই।’

এর মধ্যে রামমন্দিরের দানবাক্সের অনুদান কেলেঙ্কারি এবং ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলনের ফলে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ—এই দুই ঘটনাও কেন্দ্রীয় সরকারকে নাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করেন জওহর সরকার।

তবে পথ সহজ নয়

যদিও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে কিছু মিল রয়েছে, তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা। মুম্বাইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সের উপাচার্য ও বিশিষ্ট লেখক অধ্যাপক বদ্রী নারায়ণ মনে করেন, মমতার জন্য এই পথটি ইন্দিরার মতো অতটা মসৃণ বা নিশ্চিত নয়। তাঁর মতে, বেশ কিছু মৌলিক কারণে এই লড়াই বেশ কঠিন।

প্রথমত, ইন্দিরা গান্ধীর আমলে বিরোধীরা নানা দল ও মতাদর্শে বিভক্ত ছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) অত্যন্ত সুসংগঠিত, আক্রমণাত্মক এবং সুদূরপ্রসারী কৌশলী একটি রাজনৈতিক শক্তি। ফলে কেবল প্রথাগত রাজপথের আন্দোলন দিয়ে এই বহুমাত্রিক শক্তির মোকাবিলা করা সহজ নয়।

দ্বিতীয়ত, পশ্চিমবঙ্গের সমাজব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিবর্তনে একটি বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর ঘটেছে। তৃণমূলের চিরায়ত ‘মা-মাটি-মানুষ’ ও ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতির বিপরীতে বর্তমান জনমানসে হিন্দুত্ববাদী বা বিকল্প জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগ অনেক বেশি জোরালো হয়ে উঠেছে, যা রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

তৃতীয়ত, ইন্দিরার সময় দলে তাঁর একচ্ছত্র নেতৃত্ব বজায় ছিল। কিন্তু বর্তমান তৃণমূলে সেকেন্ড ইন কমান্ড বা উত্তরাধিকার এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়ে দলের অন্দরেই নানা ধরনের গুঞ্জন ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর আজন্ম লড়াকু মানসিকতা, ব্যক্তিত্ব ও ক্যারিশমাটিক নেতৃত্ব দিয়ে রাজনীতির মাঠে টিকে থাকার প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে একবিংশ শতাব্দীর এই পরিবর্তিত ও জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তিনি সত্যিই ১৯৭৭ সালের ইন্দিরা গান্ধীর মতো কোনো রাজকীয় প্রত্যাবর্তন করতে পারবেন কি না, তা সময়ই নির্ধারণ করে দেবে।

দ্য টেলিগ্রাফ থেকে সংক্ষেপে অনূদিত

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত