
মিয়ানমারের বাংলাদেশ সংলগ্ন রাখাইন রাজ্যের (পূর্বতন আরাকান) জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মি (এএ) সাম্প্রতিক দুটি পৃথক অনুষ্ঠানে তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। এতে তারা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, রাষ্ট্র গঠন এবং কেন্দ্রীয় সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই—এই দুই প্রক্রিয়া একে অপরের পরিপূরক।
গত ১০ এপ্রিল সংগঠনটির ১৭ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় এএ-এর কমান্ডার ইন চিফ তুন মিয়াত নাইং তাদের স্লোগান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘লড়াই করতে করতে গড়ে তোলা, আর গড়ে তুলতে তুলতে লড়াই করা।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, তাদের কৌশল হলো একই সঙ্গে সামরিক নিয়ন্ত্রণ বিস্তৃত করা এবং জান্তাবাহিনীর হাত থেকে মুক্ত এলাকাগুলোতে প্রশাসনিক শাসনব্যবস্থা সুসংহত করা।
তিনি ‘অনিশ্চিত’ আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বিরুদ্ধে সতর্ক করেন। তাঁর মতে, জান্তা সরকারের অপরাধের বিচার নিজেদের শক্তির মাধ্যমেই নিশ্চিত করতে হবে। তুন মিয়াত নাইং প্রতিশ্রুতি দেন, ২০২৭ সালের মধ্যে রাখাইন রাজ্যের বাকি অংশ দখলের মাধ্যমে ‘চূড়ান্ত বিজয়’ অর্জন করা হবে। তবে প্রয়োজনে এই সময়সীমার পরেও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন তিনি। বর্তমানে এএ রাখাইনের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪ টির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে এবং তারা রাজ্যের রাজধানী সিতওয়ে দখলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
এর তিন দিন পর, পার্শ্ববর্তী চিন রাজ্যে মিত্র সংগঠন ইন্টেরিম চিন ন্যাশনাল কনসালটেটিভ কাউন্সিলের (আইসিএনসিসি) পঞ্চম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ভাষণ দেন এএ-এর ডেপুটি কমান্ডার ইন চিফ নিয়ো তুন অং। তিনি সশস্ত্র বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যে পরিষ্কার হয়, এএ নেতৃত্ব মনে করে—একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলা তাদের জনগণের মুক্তির জন্য অপরিহার্য।
এএ এখনও তিন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর জোট ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের সদস্য। তবে তাদের গতিপথ ক্রমশ উত্তর শান রাজ্যের মিত্র সংগঠন—মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এমএনডিএএ) এবং তাআং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির (টিএনএলএ) থেকে ভিন্ন হয়ে উঠছে। চীনের তীব্র চাপের মুখে এই দুই সংগঠন জান্তার সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। এমনকি তারা লাশিও ও মোগোকের মতো দখলকৃত শহরও ফেরত দিয়েছে। এর ফলে জান্তা বাহিনী অন্যত্র লড়াইয়ের জন্য সৈন্য সরানোর সুযোগ পেয়েছে, যা কেন্দ্রীয় মিয়ানমারে প্রতিরোধ আন্দোলনকে অনিবার্যভাবে দুর্বল করেছে।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই করা এএ অতীতে এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতি করেছে, যখন সেনাবাহিনী স্থানীয় জনগণের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। তবে তারা নতুন গঠিত ‘ফেডারেল ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার স্টিয়ারিং কাউন্সিলের’ অংশ নয়। এই ইউনিয়নে চারটি প্রধান জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন এবং ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট একজোট হয়েছে। একইভাবে, তারা ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মির (ইউডব্লিউএসএ) নেতৃত্বাধীন ফেডারেল পলিটিক্যাল নেগোসিয়েশন অ্যান্ড কনসালটেটিভ কাউন্সিলেও সক্রিয় নয়। এই জোটটি চীনের হস্তক্ষেপে মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এএ-এর কার্যক্রমের ক্ষেত্র চীন সীমান্ত থেকে অনেক দূরে হওয়ায় বেইজিংয়ের প্রভাব এখানে সীমিত। চীন উত্তর শানের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ক্ষেত্রে যেমন সামরিক হুমকি বা অবরোধ প্রয়োগ করতে পারে, এএ-এর ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়। বরং এএ নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক শক্তি, কারণ তারা বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার, বাংলাদেশ সীমান্ত এবং আংশিকভাবে ভারতের ওপর প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা রাখে। ফলে চীন এএ-কে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির দিকে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি নিতে পারে না এবং তাদের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে নরম ও কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছে।
অন্যদিকে, এমএনডিএএ ও টিএনএলএ শুধু চীনের চাপেই যুদ্ধবিরতিতে যায়নি। তারা ইতোমধ্যেই নিজেদের ভৌগোলিক লক্ষ্য অর্জন বা অতিক্রম করেছিল। এমএনডিএএ তাদের মূল এলাকা ছাড়িয়ে বিস্তৃতি ঘটিয়েছে, আর টিএনএলএও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভূখণ্ড নিশ্চিত করেছে। কিছু শহর ফেরত দেওয়া ছিল একটি হিসেবি কৌশলগত ছাড়, যার পেছনে চীনের গ্যারান্টি ছিল যে জান্তা বাহিনী আক্রমণ ও বিমান হামলা বন্ধ করবে। এই দুই গোষ্ঠীর জন্য যুদ্ধবিরতি ছিল অর্জিত সাফল্যকে সংহত করা এবং তাদের ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি নিশ্চিত করার একটি উপায়—যদিও জান্তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সেই স্বীকৃতি দেয়নি।
রাখাইনে রাজধানী সিতওয়ে এবং কায়াউকফিউয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, পাশাপাশি স্বল্প জনবসতিপূর্ণ মানাউং দ্বীপ এখনও জান্তার নিয়ন্ত্রণে। এএ বারবার ঘোষণা করেছে, তারা পুরো রাখাইন রাজ্য মুক্ত করবে। চীন যদি আলোচনার অনুরোধ করে, তাহলে এএ তা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান নাও করতে পারে। তবে তারা নিরস্ত্রীকরণ বা ২০০৮ সালের সংবিধানের অধীনে জান্তার অধীনতা মেনে নেবে—এমন সম্ভাবনা খুবই কম। একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি এএ-কে পুনর্গঠনের সুযোগ দিতে পারে, যেমনটি ২০২০ সালে হয়েছিল। আর জান্তা এখন ঠিক এই আশঙ্কাটিই করছে—যে এমন বিরতি এএ-কে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে। এ কারণেই বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা কম।
বর্তমানে এএ শুধু ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের মধ্যেই নয়, বরং পুরো মিয়ানমারের জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মধ্যেও সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অর্থ ও সরঞ্জামে অন্য বাহিনীগুলো এগিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু এএ-এর সেনা সংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি, যা এটিকে দেশের সবচেয়ে বড় সক্রিয় জাতিগত সেনাবাহিনী করে তুলেছে।
তাদের ভৌগোলিক ভিত্তিও অনেক শক্তিশালী। এমএনডিএএ-এর কোকাং জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কয়েক লাখ মাত্র, আর টিএনএলএ-এর তাআং জনগোষ্ঠী প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার। তুলনায়, রাখাইন রাজ্যের ২৫ থেকে ৩০ লাখ মানুষের জনসংখ্যা এএ-কে অনেক বিস্তৃত সামাজিক ভিত্তি দিয়েছে।
এমএনডিএএ ও টিএনএলএ-এর নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলো স্থলবেষ্টিত এবং চীনের ওপর নির্ভরশীল। বিপরীতে, এএ বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার এবং ভারত ও বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত সংযোগের সুবিধা ভোগ করে। এর পাশাপাশি, রাখাইন অঞ্চলে এএ যে মাত্রার জনসমর্থন পেয়েছে, তা অন্য কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে তুলনীয় নয়। এই শক্তিশালী সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তির কারণে তারা দুই বছরের বেশি সময় ধরে ছয়টি ভিন্ন ফ্রন্টে উচ্চমাত্রার যুদ্ধ পরিচালনা করেও গতি হারায়নি।
নিজেদের বৈধতা জোরদার করতে এএ তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বিভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণ করেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গিও তাদের উত্তর শানের মিত্রদের থেকে আলাদা করে তোলে।
মাঠ পর্যায়ে জান্তা সফল হতে পারছে না, আর চীনও আত্মসমর্পণে বাধ্য করার মতো পর্যাপ্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারছে না—এই বাস্তবতায় এএ রাখাইনে তাদের সামরিক অভিযান আরও জোরদার করার পথেই এগোচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে, যুদ্ধবিরতির পথে হাঁটার পরিবর্তে।
এএসহ অন্যান্য জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনের রাজনৈতিক লক্ষ্য পুরো মিয়ানমার জুড়ে নয়; বরং নিজ নিজ রাজ্য, জনগণ ও ভূখণ্ডকে কেন্দ্র করে সীমাবদ্ধ। তবে যখন তারা উপলব্ধি করতে শুরু করবে যে তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য বৃহত্তর জাতীয় সংগ্রামের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, তখনই তারা মিয়ানমারের সামগ্রিক সংকট সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। দ্য ইরাবতীকে দেওয়া সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তুন মিয়াত নাইং খোলাখুলিভাবে স্বীকার করেছেন, এএ এখনো জাতীয় পর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রস্তুত নয়। তিনি বলেন, এই ধরনের দায়িত্ব নেওয়ার আগে সংগঠনটির আরও সময় প্রয়োজন।
দ্য ইরাবতী থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

গত বৃহস্পতিবার রাতে তেহরান এই প্রস্তাব পাকিস্তানের কাছে পাঠায়। এর আগে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে পাকিস্তানই মধ্যস্থতা করেছিল। ইরানি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৯ দফা শান্তি প্রস্তাবের বিপরীতে ইরান এই ১৪ দফা পরিকল্পনা পেশ করেছে।
১৪ ঘণ্টা আগে
২০১০ সালের ডিসেম্বরে তিন দিনের ভারত সফরের শেষ দিনে এক কাব্যিক ইশারা করেছিলেন তৎকালীন চীনা প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাও। তিনি বলেছিলেন, ‘ড্রাগন আর হাতির একসঙ্গে নাচা উচিত।’ তিনি মূলত ‘ট্যাঙ্গো’ শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন। সাধারণত, সমান অংশীদারত্ব বোঝাতে এই শব্দটা ব্যবহার করা হয়।
২১ ঘণ্টা আগে
ইরান যুদ্ধের বাস্তব চিত্রে স্পষ্ট কোনো বিজয়ী নেই; বরং ইরানের জনগণ, লেবানন, উপসাগরীয় দেশ, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে, আর চীন, জ্বালানি কোম্পানি ও আংশিকভাবে রাশিয়া কিছু কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সুবিধা পেলেও দীর্ঘমেয়াদে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
১ দিন আগে
দীর্ঘদিনের সামরিক উত্তেজনার পর মধ্যপ্রাচ্যের দাবার বোর্ডে নতুন চাল দিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের ৯ দফার শান্তি প্রস্তাবের জবাবে তেহরান পাকিস্তানের মাধ্যমে তাদের ১৪ দফার পাল্টা প্রস্তাব পেশ করেছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রাথমিক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া...
১ দিন আগে