
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন, তখন তিনি দ্রুত চূড়ান্ত বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সংঘাতের মাত্র ১০ দিন পরই তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘অনেক দিক থেকেই ইতিমধ্যে যুদ্ধ জিতে গেছে।’
তাঁর সেই দাবির পর দুই মাস পেরিয়ে গেছে। লড়াই আপাতত স্থগিত, কিন্তু যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তি এখনো দৃষ্টিগোচর নয়। ওয়াশিংটন স্পষ্ট কৌশলগত সাফল্যের ঘাটতিতে ভুগছে। আর যে সংঘাতকে একসময় সীমিত বলে মনে করা হয়েছিল, সেটিই এখন বিশ্বের বড় একটি অংশকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে এক বিস্তৃত অচলাবস্থার দিকে—যেখানে কেউই প্রকৃত অর্থে লাভবান হচ্ছে না।
মার্কিন থিংক ট্যাংক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো মেলানি সিজন বলেন, ‘এই যুদ্ধে প্রকৃত কোনো বিজয়ী নেই। তবে কিছু দেশ তুলনামূলকভাবে এর প্রভাব সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা ভালো অবস্থানে রয়েছে।’
বিশ্বের যেকোনো সংঘাতে, সব সময়ই সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইরানের ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা সবচেয়ে নির্মমভাবে সত্য। ইরানি জনগণ একদিকে বাইরের আক্রমণ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ দমন—দুই দিক থেকেই চাপে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে—যার মধ্যে বেসামরিক অবকাঠামোও ছিল।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট ইন ইরানের তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় ৩ হাজার ৬০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৭০০ জনের বেশি বেসামরিক নাগরিক। ট্রাম্প এমন হুমকিও দিয়েছেন যে—ইরানের শাসকেরা তাঁর দাবির কাছে নতি স্বীকার না করলে তিনি দেশটির ‘পুরো সভ্যতা ধ্বংস’ করে দেবেন। একই সময়ে, ইরানি রেজিম ভিন্নমত দমনে আরও কঠোর হয়ে উঠেছে। সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নেতৃত্বাধীন নতুন প্রশাসন আগের চেয়েও কঠোর বলে মনে হচ্ছে। তারা যে কোনো ধরনের চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে কঠিন বার্তা দিতে আগ্রহী।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বছরের শুরু থেকে ইরান সরকার ৬০০ জনের বেশি মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। ডিসেম্বরের শেষ ও জানুয়ারিতে হওয়া বিক্ষোভে হাজারো মানুষ নিহত হওয়ার পর এই দমন-পীড়ন আরও তীব্র হয়েছে। পাশাপাশি, আট সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ইরানে সরকার-নিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট বন্ধ রয়েছে। ইরানের অর্থনীতিও বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে, যার ফলে চাকরি হারানো এবং দারিদ্র্য বেড়েছে।
লেবাননের জনগণ দীর্ঘদিন ধরে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের সংঘাতের মধ্যে আটকে আছে। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর ছিল। কিন্তু ইসরায়েল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করার পর, হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে হামলা শুরু করে। জবাবে ইসরায়েল প্রাণঘাতী বিমান হামলা এবং স্থল অভিযান শুরু করে, যার লক্ষ্য ছিল হিজবুল্লাহকে ধ্বংস করা। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় ২ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে সিএনএন জানিয়েছে ইসরায়েল লেবাননে সেই একই কৌশল প্রয়োগ করছে, যা তারা আগে গাজায় ব্যবহার করেছিল। গ্রামের পর গ্রাম মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ইসরায়েল জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের প্রায় ৬ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষ তাদের বাড়িতে ফিরতে পারবে না, যতক্ষণ না হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলের জন্য হুমকি হিসেবে থাকে।
উপসাগরীয় দেশগুলো এমন একটি যুদ্ধে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে, যা তারা চায়নি এবং ঠেকানোর চেষ্টা করেছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোর বহু বিধ্বংসী সংঘাতের কাছাকাছি থাকা সত্ত্বেও, তারা দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি উপভোগ করেছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ইরানকে হামলা শুরু করলে ইরানও জবাবে এসব দেশকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
ইরানের পাল্টা হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসরায়েলসহ অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় ইরানের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার লক্ষ্য হয়েছে এই দেশটি। যদিও বেশির ভাগ হামলাই প্রতিহত করা হয়েছে, তবুও যা ক্ষতি হয়েছে তাতে দেশটির আঞ্চলিক ব্যবসা ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে অবস্থানকে হুমকির মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে, ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় ইরাক, কাতার ও কুয়েত মারাত্মক অর্থনৈতিক আঘাতের মুখে পড়েছে। এই সরু সমুদ্রপথের ওপর নির্ভর করেই তারা তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও অন্যান্য পণ্য রপ্তানি করে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এসব দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছে এবং ধারণা করছে, চলতি বছরে ইরাক, কাতার ও কুয়েতের অর্থনীতি সংকুচিত হবে।
এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে কেবল দূরের সংঘাত হয়ে থাকেনি, বরং তাদের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি আঘাত হয়ে নেমে এসেছে। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ইতিমধ্যে পেট্রোলের খরচ বেড়েছে, বিমান ভাড়াও চড়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখন তাদের পণ্যের দামে অতিরিক্ত ‘ফুয়েল সারচার্জ’ যোগ করছে, ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবার খরচও বাড়ছে। মার্চ মাসে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ। ভোক্তাদের আস্থা দ্রুত কমে যাচ্ছে, অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের সিজন বলেন, ‘এটা ঘুরিয়ে বলার কোনো উপায় নেই—এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি ভালো নয়।’ তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এখনো ব্যাপকভাবে তেলের ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে মানুষ ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে, অথচ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ যথেষ্ট হয়নি।
যুদ্ধের অভিঘাত শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নয়; বিশ্বজুড়ে ভোক্তারা ইতিমধ্যে এর চাপ অনুভব করতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে এশিয়ায় পরিস্থিতি বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে, কারণ এই অঞ্চলের অনেক দেশ তেল ও অন্যান্য পেট্রোকেমিক্যাল আমদানির ওপর নির্ভরশীল, যা উৎপাদন খাতে ব্যবহৃত হয়। লাতিন আমেরিকার মানুষ জ্বালানি ও খাদ্যের উচ্চমূল্যের সঙ্গে লড়াই করছে। আফ্রিকার অনেক দেশ, যেগুলো আগে থেকেই অর্থনৈতিক সংকটে ছিল, সেখানে এই পরিস্থিতি আরও চাপ সৃষ্টি করছে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও বড় ধরনের ধাক্কার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
আইএমএফ-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে চলতি বছরে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৩ দশমিক ৮ শতাংশে নামবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু এখন সংস্থাটি বলছে, মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে আইএমএফ তাদের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কমিয়েছে। জানুয়ারিতে যেখানে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল, এখন তা কমিয়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশ ধরা হয়েছে।
আইএমএফ সতর্ক করে বলেছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্র দেশগুলো। এর একটি বড় কারণ সার বা ফার্টিলাইজারের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়া। এসব দেশের মানুষ কৃষির ওপর বেশি নির্ভরশীল এবং তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্যের পেছনে ব্যয় করতে হয়।
ট্রাম্প একটি বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ঝুঁকি এখনো সফল হয়নি। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন একটি স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধের, যার লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি দূর করা—এমনকি প্রয়োজনে শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো। কিন্তু সেই লক্ষ্যগুলো এখনো অর্জিত হয়নি, আর যুদ্ধের শেষও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই এই যুদ্ধ শুরু থেকেই খুব জনপ্রিয় ছিল না। সময় যত গড়াচ্ছে, ট্রাম্পের জনসমর্থন ততই কমছে। সিএনএনের বিভিন্ন জরিপের গড় হিসেবে দেখা গেছে, সোমবার পর্যন্ত তিন সপ্তাহে প্রেসিডেন্টের অনুমোদন হার নেমে এসেছে মাত্র ৩৭ শতাংশে। সিজন আরও বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে গ্যাসের দাম ইতিমধ্যেই খারাপ অবস্থায় আছে এবং আরও খারাপ হচ্ছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য অস্বস্তিকর। কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও ট্রাম্পকে দুর্বল মনে হচ্ছে। তিনি এখন বুঝতে পারছেন, যুদ্ধ পুনরায় শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্রের বড় খরচ হবে এবং তিনি যে ফলাফল চান—পারমাণবিক ইস্যু, প্রণালি নিয়ন্ত্রণ বা শাসন পরিবর্তন—তা পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।’
তবে এখনো একটি সম্ভাবনা রয়ে গেছে—যদি ইরান শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়, তাহলে ট্রাম্প নিজেকে বিজয়ী হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন। যদিও স্বল্পমেয়াদে এমন সম্ভাবনা খুবই কম।
কয়েক বছর আগেও ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষের ধারণা প্রায় অকল্পনীয় ছিল—বিশেষ করে যখন বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, তা ঠেকাতে সক্রিয় ছিল। কিন্তু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, ইরানের শাসনব্যবস্থা ও তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি মোকাবিলার একমাত্র উপায় হলো যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলা। শুরুতে এটি নেতানিয়াহুর জন্য একটি কৌশলগত সাফল্য ছিল। গত সপ্তাহে তিনি আবারও বলেন, তিনি ‘মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলে দেবেন’ এবং তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ‘পূর্ণ সমন্বয়ে কাজ করছেন।’
এই সামরিক অভিযানে ইরানের সামরিক শক্তির বড় অংশ ধ্বংস হওয়ায়, এটি ইসরায়েলের নির্বাচনী বছরে নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিকভাবে সুবিধা এনে দিতে পারে। তবে একাধিক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ ইহুদি ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধকে সমর্থন করলেও তারা মনে করেন না যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই যুদ্ধে জয়ী হচ্ছে। একই সঙ্গে, গাজায় চলমান ধ্বংসাত্মক সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি আগে থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত ছিল, এই যুদ্ধ সেটিকে আরও দুর্বল করেছে।
এ ছাড়া, ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য নিরাপত্তা উদ্বেগ আবারও বেড়েছে, কারণ হিজবুল্লাহর রকেট ও ড্রোন হামলার হুমকি পুনরায় বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংঘাতে ইরানের শাসনব্যবস্থা বড় ধরনের আঘাত পেয়েছে। বহু শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত হয়েছেন। তবুও শাসনব্যবস্থা টিকে আছে। নতুন নেতৃত্ব আগের তুলনায় আরও বেশি কট্টর এবং মুখোমুখি সংঘাতে যেতে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার সক্ষমতা দেখিয়ে ইরান নতুন কূটনৈতিক প্রভাব অর্জন করেছে। তারা প্রমাণ করেছে, চাইলে তারা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অচল করে দিতে পারে।
মার্কিন থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক মোনা ইয়াকুবিয়ান বলেন, ‘তারা এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু সেই পদক্ষেপের মাধ্যমে তারা কার্যত প্রমাণ করেছে যে প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এর ভবিষ্যৎ প্রভাব অঞ্চল এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।’
স্বল্পমেয়াদে, ইরান যুদ্ধ কিয়েভের জন্য খারাপ খবর হয়ে এসেছে। গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র সরবরাহ অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গত সপ্তাহে জানান, যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন সক্ষমতা সীমিত থাকায় অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ কমে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট বিশ্ব মনোযোগও ইউক্রেন থেকে সরিয়ে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফের নেতৃত্বাধীন আলোচনা দল এখন ইরান নিয়েই বেশি ব্যস্ত। তবে এর মধ্যেও একটি সম্ভাব্য ইতিবাচক দিক আছে। চার বছরের বেশি সময় ধরে রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গিয়ে ইউক্রেন ড্রোন প্রযুক্তিতে এক ধরনের পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। ইরানের হুমকি বিশ্বকে সেই সক্ষমতার দিকে নজর দিতে বাধ্য করেছে।
ইয়াকুবিয়ান বলেন, ‘এই যুদ্ধ ইউক্রেনের জন্য উপসাগরীয় অঞ্চলে কিছু আকর্ষণীয় সুযোগ তৈরি করেছে। জেলেনস্কি উপসাগরীয় দেশগুলো সফর করেছেন, এবং তারা তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছে…ড্রোনবিরোধী প্রযুক্তি উন্নয়নে তাদের যৌথ আগ্রহ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সূচনা হতে পারে।’
বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশ চীন। তারা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংঘাত থেকে বেইজিং আরও শক্ত অবস্থানে বেরিয়ে আসতে পারে। চীন তুলনামূলকভাবে তেল সংকট সামাল দিতে পেরেছে। গত এক দশকে তারা বিপুল তেল মজুত গড়ে তুলেছে। আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করেছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎভিত্তিক অর্থনীতির দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে। সেখানে কয়লা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ নিজস্ব উৎস বড় ভূমিকা রাখছে। এতে তেলের বাড়তি দামের চাপ সামলানো সহজ হচ্ছে। ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির চাহিদা বাড়লে চীনের সৌর প্যানেল ও বায়ু টারবাইনের চাহিদাও বাড়তে পারে।
আরেকটি দিক আছে—কূটনীতি। এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিতে যে আঘাত করেছে, তা থেকেও চীন লাভবান হতে পারে বলে মনে করেন ইয়াকুবিয়ান। তিনি বলেন, ‘এই যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিকভাবে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। এটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, বিশ্বজুড়েই অজনপ্রিয় যুদ্ধ…আর চীন নিজেকে বৈশ্বিক শান্তি, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে একজন গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছে।’
নিরাপত্তা ও কৌশলগত দিক থেকেও চীন লাভবান হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রকে এশিয়া থেকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদ সরিয়ে নিতে বাধ্য করেছে। এতে এমন এক অঞ্চলে তাদের প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়েছে, যেখানে চীন ক্রমেই শক্তি প্রদর্শন করছে এবং তাইওয়ান নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষা বজায় রেখেছে।
তবে ঝুঁকিও আছে। চীনের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে রপ্তানিনির্ভর। বৈশ্বিক অর্থনীতি দুর্বল থাকলে তাদের পণ্যের ক্রেতা কমে যাবে। এর প্রভাব ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে—যা চীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার—রপ্তানি কমে আসছে।
বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেলেও তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা করছে। শেভরন, শেল, বিপি, কনোকোফিলিপস, অ্যাক্সনমবিল এবং টোটালএনার্জিস—সবগুলোই তেলের বাড়তি দাম এবং দামের অস্থিরতার কারণে বড় অঙ্কের লাভ করছে। বৈশ্বিক অলাভজনক সংস্থা অক্সফামের একটি নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ছয়টি কোম্পানি চলতি বছরে মোট ৯৪ বিলিয়ন ডলার মুনাফা করতে পারে।
তবে এই অতিরিক্ত লাভের কারণে বিভিন্ন দেশে তাদের ওপর ‘উইন্ডফল ট্যাক্স’ আরোপের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে এই সংকট নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে। এতে জীবাশ্ম জ্বালানির পতন আরও দ্রুত হতে পারে।
রাশিয়া
সংঘাত যে রুশ অর্থনীতিকে কিছুটা হলেও চাঙা করেছে, এ নিয়ে খুব একটা সন্দেহ নেই। তেলের উচ্চ দাম এবং সার বাজারের উল্লম্ফন ক্রেমলিনের কোষাগারে অতিরিক্ত অর্থ ঢুকিয়েছে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন তেলের দাম বাড়তে থাকায় বাজারে সরবরাহ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে সমুদ্রে থাকা রুশ অপরিশোধিত তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছিল।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা চলতি সপ্তাহের শুরুতে জানিয়েছে, মার্চে রাশিয়ার জ্বালানি খাত থেকে আয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। তবে ইউক্রেনের ধারাবাহিক হামলা—বিশেষ করে রুশ তেল স্থাপনা, বন্দর ও শোধনাগারগুলোতে—রাশিয়ার তেল বিক্রির সক্ষমতাকে সীমিত করে দিচ্ছে।
মোনা ইয়াকুবিয়ান বলেন, ‘তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু আছে।’ তিনি উপসাগরীয় অঞ্চলে ইউক্রেনের নতুন কূটনৈতিক সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘রাশিয়ার জন্য, যারা নিজেরাও উপসাগরে অবস্থান করছে, তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ যদি ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্যে জায়গা করে নেয়, সেটি অবশ্যই গভীর উদ্বেগের কারণ।’ মস্কোর দীর্ঘদিনের উপস্থিতি ও আঞ্চলিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটও তিনি তুলে ধরেন।
বিশ্বব্যাপী তেল সংকট অনেক দেশের জন্য পরিষ্কার জ্বালানিতে রূপান্তরের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যা নবায়নযোগ্য খাতের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। গত সপ্তাহে ইউরোপীয় কমিশন এক নতুন কৌশল চালু করেছে, যার লক্ষ্য ‘জীবাশ্ম জ্বালানির দামের ধাক্কা’ থেকে জনগণকে সুরক্ষা দেওয়া এবং ‘নিজস্ব ক্লিন এনার্জি’ উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রতিক্রিয়াতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে এখানেও একটি সতর্কবার্তা রয়েছে। ইরান সংকট নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ব্যবহৃত কাঁচামালের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে—যেমন অ্যালুমিনিয়াম—এবং গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। এর ফলে নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
যেকোনো সংঘাতের মতোই, অস্ত্র নির্মাতারা লাভের মুখ দেখার পথে রয়েছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট গত সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ২ দশমিক ০১৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। প্রতিষ্ঠানটির সামরিক ব্যয় ও অস্ত্র উৎপাদন কর্মসূচির গবেষক জিয়াও লিয়াং বলেন, এই বৃদ্ধি এসেছে এমন এক সময়ে যখন দেশগুলো ‘আরেকটি যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার বছরে’ বড় আকারে অস্ত্র সংগ্রহ বাড়িয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান সংকটগুলোর বিস্তৃতি এবং বহু দেশের দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ব্যয়ের লক্ষ্য বিবেচনায় নিলে, এই প্রবৃদ্ধি সম্ভবত ২০২৬ এবং তার পরেও অব্যাহত থাকবে।’
তবে প্রতিরক্ষা খাতও দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিতভাবে লাভবান হবে—এমনটা বলা যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিশ্বের কিছু বৃহৎ প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর চাপের মুখে পড়েছে, যদিও গত কয়েক বছরে এগুলো ধারাবাহিকভাবে বেড়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এর একটি কারণ যুক্তরাষ্ট্রে ইরান যুদ্ধের অজনপ্রিয়তা এবং ভবিষ্যতে নীতিগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে প্রত্যাশা। পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিরক্ষা বাজেট কংগ্রেসে অনুমোদন পাবে কি না—এই অনিশ্চয়তাও বাজারে প্রভাব ফেলছে।
অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

দীর্ঘদিনের সামরিক উত্তেজনার পর মধ্যপ্রাচ্যের দাবার বোর্ডে নতুন চাল দিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের ৯ দফার শান্তি প্রস্তাবের জবাবে তেহরান পাকিস্তানের মাধ্যমে তাদের ১৪ দফার পাল্টা প্রস্তাব পেশ করেছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রাথমিক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া...
৬ ঘণ্টা আগে
সৌদি-আমিরাত সম্পর্কের এই ফাটল নতুন কিছু নয়, তবে ২০২৫ সালের শেষের দিকে তা এক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর সৌদি আরবের বিমানবাহিনী ইয়েমেনের মুক্তা বন্দরে আমিরাত-সমর্থিত একটি সামরিক যান (অস্ত্রবাহী) লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
১ দিন আগে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক-কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই একটি অত্যন্ত সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়েছে পাকিস্তান। হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌ অবরোধকে পাশ কাটিয়ে ইরানে পণ্য পরিবহনের জন্য ছয়টি স্থলপথ বা ‘ল্যান্ড ব্রিজ’ উন্মুক্ত করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে ইসলামাবাদ।
১ দিন আগে
ভারতের কর্মকর্তারা এক বিতর্কিত পরিকল্পনার কথা তুলেছেন। এতে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী নদী-খাল ও জলাভূমিতে কুমির ও বিষধর সাপের মতো শিকারি প্রাণী ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। উদ্দেশ্য—যেসব এলাকায় বেড়া দেওয়া কঠিন, সেখানে অনিয়মিত অভিবাসন ও চোরাচালান ঠেকাতে ‘প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক’ তৈরি করা।
২ দিন আগে