Ajker Patrika

মিডল ইস্ট আই এর নিবন্ধ /যে স্বার্থে ইয়েমেনে অস্থিরতা জিইয়ে রাখতে চায় আরব আমিরাত ও ইসরায়েল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬: ৩৭
ইয়েমেনে এক বিন্দুতে মিশে গেছে ইসরায়েল ও আরব আমিরাতের আঞ্চলিক স্বার্থ। ছবি: সংগৃহীত
ইয়েমেনে এক বিন্দুতে মিশে গেছে ইসরায়েল ও আরব আমিরাতের আঞ্চলিক স্বার্থ। ছবি: সংগৃহীত

ইয়েমেনকে ঘিরে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মধ্যে দ্বন্দ্ব বহুদিন ধরেই নীরবে জ্বলে উঠছিল। তবে ইসরায়েল ও ইউএইর মধ্যকার উদীয়মান জোট এবং বৃহত্তর ঐতিহ্যগত শক্তিগুলোকে দুর্বল করার তাদের অভিন্ন নীতি রিয়াদকে স্বভাববিরুদ্ধভাবে কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য করেছে।

এক দশকেরও বেশি আগে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সাবেক কমান্ডার জেমস ম্যাটিস আবুধাবিকে স্মরণীয়ভাবে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘লিটল স্পার্টা’ বলে। যারা নিজ ওজনের চেয়েও বেশি আঘাতে সক্ষম। ইরান, ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে নিরাপত্তা রক্ষাকারী হিসেবে দেখার মতো ইস্যুতে তেল আবিবের সঙ্গে অভিন্ন ধারণা এই দুই আঞ্চলিক ‘ডিসরাপ্টরকে’ একত্র করে। এরই ফলাফল ছিল ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডস, যার তত্ত্বাবধান করেছিল ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদ।

২০০৪ সালে আমিরাতের শাসক শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ানের মৃত্যুর পর ইউএই তাঁর ঐকমত্যভিত্তিক প্যান-আরব নীতির সম্পূর্ণ উলটো পথে যাত্রা শুরু করে। এই নতুন পথ নির্মাণ করেন তাঁর পুত্র মোহাম্মদ বিন জায়েদ। তিনি পিতার সময়ে ‘এমিনেন্স গ্রিস’ হিসেবে কাজ করেন এবং ২০১৪ সাল থেকে দেশটির কার্যত শাসক ছিলেন এবং ২০২২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট হন।

ম্যাটিস যে সামরিকবাদী প্রবণতার কথা বলেছিলেন, তা ইসরায়েলের মতো দৃঢ় দমননীতি নয়; বরং বিপুল তেলসম্পদের জোরে প্রক্সি শক্তিকে কাজে লাগিয়ে হস্তক্ষেপকে প্রাধান্য দেওয়া হতো, যেখানে জনমতকে তোয়াক্কা করা হয় না। বাস্তবে, ইউএইতে নাগরিকদের সংখ্যা সীমাবদ্ধ রাখার নীতিই অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা প্রায় শূন্যে নামিয়ে এনেছে।

কিন্তু আরব বসন্তের গণ-অভ্যুত্থান শাসক পরিবারের মধ্যে ভীতি জাগায়। ইউএই নাগরিকদের ক্ষীণ ও দুর্বল পরিসরের মধ্যেও শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের দাবি উঠতে শুরু করে। স্বাধীনতার পর থেকেই রাষ্ট্র প্রশাসনে উপস্থিত মুসলিম ব্রাদারহুড–সম্পৃক্ত ইসলামপন্থী বুদ্ধিজীবীদেরই এসব ‘উসকানিদাতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এসব বুদ্ধিজীবীর বিরুদ্ধে মানুষকে নিজেদের অবস্থানের ঊর্ধ্বে ভাবতে শিখিয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়।

এরপর ইউএই সৌদি আরবের সঙ্গে জোট বেঁধে অঞ্চলজুড়ে ইসলামপন্থী নির্বাচনী শক্তির মোকাবিলায় নামে। এই ইসলামপন্থী শক্তিগুলো তুরস্ক ও কাতারের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সমর্থন পাচ্ছিল। এই সংঘাত বিস্তৃত ছিল মিসর থেকে লিবিয়া পর্যন্ত, এমনকি তুরস্কেও। অনেকে সন্দেহ করেন, তুরস্কে ২০১৬ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানে ইউএইর ভূমিকা রয়েছে।

ইসরায়েলের মতোই ইউএইর কাছে গাজা যুদ্ধ ছিল হামাস ও মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রভাব শেষ করার একটি সুযোগ। ইউএইর প্রেসিডেনশিয়াল উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ অক্টোবরে বলেন, ‘ফিলিস্তিনি ইস্যুতে সর্বোচ্চবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আর গ্রহণযোগ্য নয়।’ যদিও হামাসসহ প্রধান ফিলিস্তিনি দলগুলো দুই-রাষ্ট্র সমাধানে একমত হওয়ায়, কী ধরনের ছাড় চাওয়া হচ্ছে—তা স্পষ্ট নয়।

ইয়েমেন ইস্যুতে সানায় ক্ষমতা দখলকারী হুতি গোষ্ঠীকে উৎখাত করতে সৌদি আরবই ইউএইকে সামরিক হস্তক্ষেপে অংশীদার হতে আমন্ত্রণ জানায়। ২০১৪ সালে হুতিরা উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) সমর্থিত সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর, ইরান–সমর্থিত হিজবুল্লাহ-ধাঁচের একটি শক্তি সীমান্তে দাঁড়িয়ে পড়তে পারে—এই আশঙ্কায় রিয়াদ আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। এ কারণে সৌদি আরব ইয়েমেনের ইসলামপন্থী আল-ইসলাহ দলকে সমর্থন দেওয়া অব্যাহত রাখে।

মিসর, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ যে যুদ্ধে সেনা পাঠাতে রাজি হয়নি, সে কারণে রিয়াদের সামনে আবুধাবির শরণ নেওয়া ছাড়া তেমন বিকল্প ছিল না। আবুধাবি রাজি হলেও, আমিরাতের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সৌদি সরলতা ছিল চরম মাত্রার। অচিরেই ইউএইর আগ্রহ স্পষ্ট হয়—হুতিদের চ্যালেঞ্জ করা নয়, বরং দক্ষিণ ইয়েমেনকে নিজস্ব প্রভাববলয়ে পরিণত করা, প্রধানত প্রক্সি শক্তির মাধ্যমে।

ইউএইর পৃষ্ঠপোষকতায় ২০১৫ সালে গঠিত হয় জায়ান্টস ব্রিগেডস, ২০১৭ সালে সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি) এবং এর কিছু পরেই ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে আমিরাত গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও কৌশলগত বাব আল-মান্দাব প্রণালির ওপর প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

ইউএই ও সৌদি আরব উভয়ই সুদানের আধাসামরিক র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) থেকে ভাড়াটে যোদ্ধা নিয়োগ করেছিল। তবে আবুধাবি সেই সম্পর্ক আরও গভীর করে—এমনকি বর্তমানে আরএসএফের যোদ্ধাদের নৃশংসতা সত্ত্বেও, সুদানের সরকারের বিরুদ্ধে গোষ্ঠীটিকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইউএইর বিরুদ্ধে।

এ ছাড়া, ইয়েমেনে ইউএই ইসরায়েলের সঙ্গেও সহযোগিতা করেছে। সোকোত্রা, পেরিম, আবদ আল-কুরি ও জুকার দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি, রাডার ব্যবস্থা ও নজরদারি অবকাঠামো স্থাপন করেছে; বিষয়টি ভালোভাবেই নথিভুক্ত, যদিও খুব কম আলোচিত।

ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দিয়েছে এরই স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে। কারণ, তার আমিরাতি মিত্র সোমালিয়ার বিচ্ছিন্ন অঞ্চলটিতে সড়ক নির্মাণ, বেরবেরা বন্দরের উন্নয়ন, হারগেইসা বিমানবন্দর আধুনিকীকরণ এবং একটি সামরিক ঘাঁটি গড়ে তুলেছে—একই সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে মোগাদিসুকে সমর্থনের অবস্থান বজায় রেখে।

মুসলিম ব্রাদারহুড–সম্পৃক্ত ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রধান আঞ্চলিক পৃষ্ঠপোষক তুরস্কও হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে সামরিক ও বাণিজ্যিক উপস্থিতি গড়ে তুলেছে—সোমালিয়া, সুদান, জিবুতি ও ইথিওপিয়ায় ব্যাপক বিনিয়োগের মাধ্যমে।

ইউএই একই কায়দায় দক্ষিণ ইয়েমেনে নিজস্ব অবস্থান গড়ে তুলেছে—ইয়েমেনি প্রজাতন্ত্র ও নির্বাসিত সরকারের প্রতি আনুষ্ঠানিক সমর্থনের কাঠামোর ভেতর থেকেই। ইয়েমেনের প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের অন্তত তিন সদস্য—আইদারুস আল-জুবাইদি, আবদুলরহমান আল-মুহাররামি ও ফারাজ আল-বাহসানি—এর প্রতি ইউএইর সমর্থন, যাদের মধ্যে দুজন এসটিসি বিচ্ছিন্নতাবাদী, কার্যত এই পরিষদকে অচল করে দিয়েছে।

এসটিসি নেতা আল-জুবাইদি চিত্রনাট্যটি ভালোভাবেই জানেন। শেষ পর্যন্ত যদি তিনি স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চান, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সন্দেহ কাটিয়ে উঠতে ইউএই ও ইসরায়েলের সমর্থনই হবে তাঁর প্রধান ভরসা—কারণ ইয়েমেন ইতিমধ্যেই এমন এক সমস্যাগ্রস্ত দেশ হিসেবে বিবেচিত, যেখানে অতিরিক্ত চেষ্টা করতে পশ্চিমারা অনাগ্রহী।

গত এক বছরে জুবাইদি এই বক্তব্য জোরালোভাবে প্রচার করছেন যে, ইয়েমেনে কার্যত দুটি শক্তিই টিকে আছে—উত্তরে হুতি এবং দক্ষিণে এসটিসি। দক্ষিণকে স্বীকৃতি দেওয়া পশ্চিমা দৃষ্টিতে দ্রুত স্থিতিশীলতা আনার পথ, একই সঙ্গে ইরান–সমর্থিত হুতিদের আরও বিচ্ছিন্ন করার উপায়—যাদের যুক্তরাষ্ট্র আশঙ্কা করছে চীন ও রাশিয়ার আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে।

সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ফাঁকে জুবাইদি স্পষ্টভাবে জানান, তাঁর ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই এসটিসির রয়েছে। ইয়েমেনে ঐতিহ্যগত শক্তি এবং এসটিসি–অন্তর্ভুক্ত সরকারের প্রধান রাজনৈতিক ও আর্থিক পৃষ্ঠপোষক হয়েও সৌদি আরব কীভাবে পরিস্থিতিকে এতটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দিল—তা ইয়েমেনি মিত্র ও আঞ্চলিক অংশীদারদের কাছে সমানভাবে বিস্ময়কর।

ইয়েমেন সংঘাতের অপ্রকাশ্য সত্য হলো, ২০২২ সালে জাতিসংঘ–সমর্থিত যুদ্ধবিরতির পর থেকেই রিয়াদ তার স্বার্থ সুরক্ষার সর্বোত্তম পথ হিসেবে হুতিদের সঙ্গে শান্তি স্থাপনকে বিবেচনা করছে। বিশেষ করে, আগামী এক দশকে ১ দশমিক ২৫ ট্রিলিয়ন ডলারের গিগা–প্রজেক্ট বাস্তবায়নের প্রেক্ষাপটে—যখন সৌদি আরব অতিরক্ষণশীল একঘরে নীতি ছেড়ে গণ–পর্যটনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধবিরতি সৌদি আরবকে নীরবে হুতিদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ আলোচনা পুনরায় শুরু করার সুযোগ দিয়েছে, যা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর স্থগিত ছিল। এসব আলোচনা বানচাল করাই ছিল এসটিসি–ইউএই জোটের একটি প্রধান লক্ষ্য। কারণ সৌদি–হুতি শান্তিচুক্তির পর যে সরকার–হুতি আলোচনা হওয়ার কথা ছিল, তাতে তেল ও গ্যাসসহ দক্ষিণের রাজস্ব ভাগাভাগির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

হাজরামাউত ও মাহরার অভ্যন্তরীণ এলাকায় সামরিক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় থাকা এসটিসি এখনই পদক্ষেপ নিয়েছে। কারণ, তাদের আশঙ্কা ছিল, সৌদি আরব ও ওমান একটি নতুন হাজরামি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে উসকে দিচ্ছে, যা দক্ষিণে তাদের প্রকল্পকে ভেস্তে দেবে। গত এক বছরে সৌদি আরব মাহরায় নিজেদের সংশ্লিষ্ট ন্যাশনাল শিল্ড মিলিশিয়া মোতায়েনও করেছে।

ইউএইর ক্ষেত্রে, বৃহত্তর লক্ষ্যটি স্পষ্টতই ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে সৌদি আরব, তুরস্ক ও ইরানের মতো বড় শক্তিগুলোকে দুর্বল করা এবং আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে খণ্ডিত করা। তাদের দৃষ্টিতে, এই পথই দুটি ‘বিগড়ে যাওয়া’ রাজনৈতিক সত্তার—বর্তমান রূপে টিকে থাকা এবং পরিবর্তনের চাপ প্রতিরোধ করার—সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

তারেক রহমানের অনুরোধে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন হাসনা মওদুদ

‘চাইলে বাংলাদেশে ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের আচরণ অনুসরণ করুন, কিন্তু খেলোয়াড় কেন বলির পাঁঠা’

উত্তরবঙ্গ সফরে যাচ্ছেন তারেক রহমান, যা থাকছে সফরসূচিতে

যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ, আটলান্টিকে তেলের ট্যাংকার পাহারা দেবে রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ

নিখোঁজ এনসিপি সদস্য ওয়াসিমের সন্ধান মিলল মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত