
মার্কিন প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে চালানো যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পরস্পরবিরোধী দুটি চুক্তিতে সই করেছে। এসব চুক্তির মাধ্যমে ইরানের ক্ষেত্রে শান্তির শর্ত নির্ধারণের যে ক্ষমতা ইসরায়েল হারিয়েছে, সেটা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছে তারা লেবাননে।
এ কাজে তারা বড় ধরনের সহায়তা পেয়েছে লেবানন সরকারের কাছ থেকে। কারণ, সরকার এমন এক চুক্তিতে সই করেছে, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের ভূখণ্ডের ওপর সার্বভৌমত্বের একটি অংশ এবং ইসরায়েলের সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচার চাওয়ার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব কার্যত ত্যাগ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে যে চুক্তিতে সই করেছেন, সেখানে ওয়াশিংটন স্পষ্টভাবে ইরান ও লেবাননের মধ্যকার যোগসূত্র স্বীকার করেছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, ‘লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে।’
এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হলে, ওয়াশিংটনে লেবানন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতিনিধিদের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিতীয় চুক্তিটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ওই ‘ফ্রেমওয়ার্ক’ চুক্তির মাধ্যমে দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে থাকা ইসরায়েলি বাহিনীকে অনির্দিষ্টকাল সেখানে অবস্থান করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
প্রথম চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার মধ্যে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের অধিকারও অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু দ্বিতীয় চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরায়েলের ওপর লেবাননের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বরং ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত একটি ‘সামরিক সমন্বয় গোষ্ঠী’ গঠনের মাধ্যমে লেবাননের সার্বভৌমত্ব আরও দুর্বল করা হয়েছে।
এই চুক্তির আওতায় লেবাননের সেনাবাহিনীকে যুদ্ধে অভিজ্ঞ সশস্ত্র এক গোষ্ঠীকে—হিজবুল্লাহ—নিরস্ত্র করতে হবে। ওয়াশিংটন ও ইসরায়েল লেবাননের সেনাবাহিনী কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে, সে বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর ভেটো প্রয়োগ করে তাদের ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল রেখেছে। অথচ লেবাননের বহু মানুষের কাছে ওই সশস্ত্র গোষ্ঠীই ইসরায়েলি হামলা ও বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধশক্তি হিসেবে বিবেচিত।
ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তিতে লেবানন সরকারকে আরও বাধ্য করা হয়েছে যে, যাতে আগ্রাসনের সময় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের জন্য ইসরায়েলি সেনা ও জেনারেলদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, চুক্তির ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদের মাধ্যমে লেবানন সরকার আন্তর্জাতিক আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো আইনি অভিযোগ করার অধিকারও ত্যাগ করেছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে লেবাননে ১০ লাখের বেশি মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং অন্তত ৮ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন ইসরায়েলি আগ্রাসনের কারণে। ইসরায়েলের বহু হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল বেসামরিক মানুষ, যার মধ্যে সাংবাদিক ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও ছিলেন। লেবাননের এমপি এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ হালিমা কাকুরের মতে, ‘এই ধারাটি লেবাননিজ কর্তৃপক্ষের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতিফলন। তারা ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহারের বিনিময়ে আন্তর্জাতিক ফোরামে আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অথচ সেনা প্রত্যাহার তো ইসরায়েলের একটি বাধ্যবাধকতা, এটি এমন কোনো বিষয় নয় যার বিনিময়ে অন্য কিছু আদায় করতে হবে।’
এই চুক্তি ঘিরে বৈরুতের রাজপথে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালামকে পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরিকে পরিস্থিতি শান্ত রাখার জন্য প্রকাশ্যে ধন্যবাদ জানাতে হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। বেরি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধ ঠেকাতে তিনি এই চুক্তি পাস হতে দেবেন না। লেবাননের ইতিহাস বিবেচনায় নিলে তাঁর এই সতর্কবার্তাকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
বেরি বলেন, ‘যারা এই চুক্তি তৈরি করেছে, তারা একটি ফিতনা (অভ্যন্তরীণ গৃহদ্বন্দ্ব) সৃষ্টি করতে চায়। কিন্তু আমি তা চাই না এবং বিস্ফোরণ ঠেকাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। এমনকি হিজবুল্লাহও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি শান্ত রাখতে কাজ করছে। কিন্তু তারা এমন একটি চুক্তি চাপিয়ে দিতে অনড়, যা ১৭ মে চুক্তির চেয়েও খারাপ...তারা একটি ফিতনা সৃষ্টি করতে চায়।’ বেরি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ ‘টানাপোড়েনের’ মূল্য পুরো অঞ্চলকে দিতে হতে পারে।
লেবাননের প্রধান আগ্রাসী শক্তি হিসেবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনের এই চুক্তিতে অত্যন্ত সন্তুষ্ট ছিলেন। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের লিতানি নদীর আশপাশের যে দুটি এলাকা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলোকে তিনি গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দেন। নেতানিয়াহু এই চুক্তিকে ইরানের বিরুদ্ধে ‘একটি বড় আঘাত’ বলেও অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘ইরান শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আমাদের দক্ষিণ লেবানন থেকে সরিয়ে নিতে চাইছে। কিন্তু বাস্তবে ইসরায়েল, লেবানন এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের বলছে, এটি তোমাদের কোনো বিষয় নয়।’
দুটি চুক্তির মধ্যে এত বড় পার্থক্যের কারণ হলো, এগুলোর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের ভেতরে থাকা পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি নীতিনির্ধারণী ধারা কাজ করেছে। নাবিহ বেরি যে ‘টানাপোড়েনের’ কথা বলেছেন, সেটিই এর প্রতিফলন।
ট্রাম্পের ইরানের সঙ্গে করা চুক্তিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের চিন্তাধারার প্রতিফলন দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলা ইরানে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য অর্জনে পুরোপুরি ব্যর্থ হওয়ায়, ভ্যান্সের অবস্থান যে সঠিক ছিল, সেটি যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভ্যান্স ইরান যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার বিরোধিতার বিষয়টি খুব একটা গোপন করেননি। গত ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প যখন তৎকালীন মোসাদ পরিচালক ডেভিড বার্নিয়া এবং নেতানিয়াহুর কাছ থেকে ব্রিফিং নেওয়ার পর ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন পরিস্থিতি কক্ষ (সিচুয়েশন রুমে) ভ্যান্সের অনুপস্থিতি ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে হওয়া ওয়াশিংটন কাঠামো চুক্তির মূল কারিগর ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ভেনেজুয়েলায় যেমন তিনি সরকার পরিবর্তনের পক্ষে ছিলেন, কিউবার ক্ষেত্রেও যেমন আছেন, তেমনি ইরানেও সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য থেকে তিনি সরে আসেননি। রুবিও মনে করেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার পর আলোচনার মাধ্যমে যে রাজনৈতিক সমঝোতা হবে, তার ফল হিসেবে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ হওয়া উচিত নয়। বরং হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণই শান্তির পূর্বশর্ত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে তাঁর বিশ্বাস, ইসরায়েলই মধ্যপ্রাচ্যের একচ্ছত্র আঞ্চলিক প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে থেকে যাবে।
অন্যদিকে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের দৃষ্টিতে ইরানের বিরুদ্ধে বোমা হামলা অব্যাহত রাখার নেতিবাচক দিক অনেক বেশি। বিশেষ করে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি সামরিক স্থাপনা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে বাহরাইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটিও রয়েছে। পাশাপাশি, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত পুনরায় পূরণ করতেও দীর্ঘ সময় লাগবে।
কিন্তু রুবিও এখনো সেই ধারণা আঁকড়ে আছেন যে, হিজবুল্লাহ লেবাননের নিজস্ব শক্তি নয়, বরং এটি কেবল ইরানের একটি হাতিয়ার। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিঃসন্দেহে অঞ্চলে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার জন্য এক বড় ধাক্কা। তবে একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, তেহরানে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অর্জনও করত, তাহলেও যুদ্ধ সেখানেই শেষ হতো না। কারণ, এখন তেল আবিবের রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাদের মনোযোগ ঘুরিয়ে নিয়েছে তুরস্কের দিকে।
দিনের পর রাত যেমন অবধারিতভাবে আসে, তেমনি এখন তুরস্ককে ইসরায়েলের নতুন অস্তিত্বগত শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। সমস্বরে ইসরায়েলের একদল রাজনীতিক সতর্কবার্তা দিতে শুরু করেছেন একটি নতুন ‘সুন্নি অক্ষ’ গড়ে ওঠা নিয়ে। তাঁদের মতে, এই অক্ষ গঠিত হয়েছে তুরস্ক, সিরিয়া ও কাতারকে নিয়ে।
এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভালো লাগেনি। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যখন দাবি করেন, তাঁর ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক বন্ধু তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান একজন ‘ইহুদিবিদ্বেষী স্বৈরশাসক’ এবং তিনি ‘কুর্দিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালাচ্ছেন’, তখন ট্রাম্প এসব অভিযোগ কার্যত উড়িয়ে দিয়ে হাস্যরসের সঙ্গেই প্রতিক্রিয়া জানান।
ট্রাম্প বলেন, ‘এরদোয়ান একজন মহান নেতা, অত্যন্ত শক্তিশালী একজন ব্যক্তি...আমি তাঁর কাছে যত কিছু চেয়েছি, সবই তিনি করেছেন।’
নেতানিয়াহু যখন বলেন, ইসরায়েলের ‘নতুন’ নিরাপত্তা নীতি হলো ‘আগে তাদের হত্যা করো’, তখন ভ্যান্স আরও স্পষ্ট ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানান। নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভার দুই কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রীর উদ্দেশে বলা হলেও, প্রকৃতপক্ষে তিনি প্রধানমন্ত্রীকেই বার্তা দিচ্ছিলেন। ভ্যান্স বলেন, ‘আপনাদের দেশটির জনসংখ্যা ৯০ লাখ। জাতীয় নিরাপত্তার প্রতিটি সমস্যার সমাধান মানুষ হত্যা করে করা সম্ভব নয়।’
তবে তুরস্ককে লক্ষ্যবস্তু করার ব্যাপারে ইসরায়েল যতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, ইরানকে ঘিরেও তারা ঠিক ততটাই গুরুত্ব দিয়েছিল। প্রথমত, তুরস্কবিরোধী এই বক্তব্য ইসরায়েলের দুই প্রধান রাজনৈতিক ধারার মধ্যেই সমানভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে যাঁর নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত, সেই নাফতালি বেনেতও একই সুর তুলেছেন। তিনি বলেছেন, নতুন একটি তুর্কি হুমকি তৈরি হচ্ছে।
বেনেত বলেন, ‘আমি খুব স্পষ্টভাবে বলতে চাই। তুরস্ক ও কাতার সিরিয়ায় প্রভাব বাড়িয়েছে এবং এখন তারা পুরো অঞ্চলজুড়েই প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। তাই আমি এখান থেকেই সতর্ক করছি, তুরস্কই নতুন ইরান।’
এই বক্তব্যের সুরই পরে তুলে ধরেন প্রবাসবিষয়ক মন্ত্রী আমিখাই চিকলি। তিনি বলেন, ‘ইরানের শিয়া সাম্রাজ্যের যুগ শেষ হয়ে গেছে।’ তাঁর ভাষায়, সেই জায়গায় এখন উঠে এসেছে নতুন এক অক্ষ, ‘এরদোয়ানের তুরস্ক, সিরিয়া ও কাতারকে নিয়ে গঠিত মুসলিম ব্রাদারহুড অক্ষ। এখনই চোখ খুলে দেখাই ভালো।’
দ্বিতীয়ত, ইসরায়েলের এই নতুন অভিযানের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল আরও আগে, ২০২৪ সালের নভেম্বরেই। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতনের এক মাস আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার বলেছিলেন, ইসরায়েলের উচিত তাদের ‘স্বাভাবিক মিত্রদের’ কাছে পৌঁছানো। তাঁর মতে, সেই স্বাভাবিক মিত্র হলো কুর্দি ও দ্রুজ জনগোষ্ঠী।
আসাদের পতনের পর ইসরায়েল সিরিয়ার নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী কার্যত ধ্বংস করে দেয় এবং দক্ষিণ সিরিয়ার এমন এক এলাকায় প্রবেশ করে, যার আয়তন গাজার চেয়েও বড়। একই সঙ্গে তেল আবিব প্রকাশ্যেই এমন এক ফেডারেল সিরিয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়, যা বিভিন্ন ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভক্ত স্বশাসিত অঞ্চলে খণ্ডিত থাকবে। নেতানিয়াহু এখন লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর দখলে থাকা এলাকাগুলোকে ‘নিরাপত্তা বেষ্টনী’ বলে উল্লেখ করছেন। এসব এলাকা থেকে সরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছাই তাঁর নেই বলেও তিনি জানিয়েছেন।
এই পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে ইসরায়েল একদিকে প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বে দামেস্কে গঠিত জাতীয় সরকারের কর্তৃত্ব সীমিত করতে চেয়েছে, অন্যদিকে আসাদ-পরবর্তী সিরিয়ার সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ককেও চ্যালেঞ্জ জানাতে চেয়েছে। এ ছাড়া সাইপ্রাস ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরকে কেন্দ্র করে গ্রিস ও তুরস্কের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনাও ইচ্ছাকৃতভাবে আবার উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেছে ইসরায়েল।
এর অংশ হিসেবে সাইপ্রাসকে বারাক এমএক্স আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সরবরাহ করা হয়েছে। পাশাপাশি, পাফোসের একটি বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলকে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে। একই সময়ে সাইপ্রাস ভারতীয় সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কেনার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য একটিই, তুরস্কের ক্রমবর্ধমান নৌ-সামরিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করা।
সম্প্রতি ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম মা’রিভে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের কৌশলগত মহলে এখন দীর্ঘমেয়াদে ইরানের চেয়ে তুরস্ককেই আরও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে বলা হয়, বিষয়টি শুধু তুরস্কের নির্মাণাধীন বিমানবাহী রণতরি কিংবা তাদের ড্রোন, রাডার ও উন্নত ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং পূর্ব ভূমধ্যসাগর, ককেশাস, আফ্রিকা, বলকান অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আঙ্কারার ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক ও সামরিক উপস্থিতিও ইসরায়েলের কৌশলগত উদ্বেগের অন্যতম কারণ।
ইসরায়েলের আরেক মন্ত্রী গিলা গামলিয়েলও বলেছেন, ইসরায়েল ‘অটোমান সাম্রাজ্যের’ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইসরায়েলের পদক্ষেপের প্রতি তুরস্কের প্রতিক্রিয়া ছিল সতর্ক। কেউ কেউ বলবেন, অতিরিক্ত সতর্ক। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বক্তব্য এক পাশে সরিয়ে রেখে যদি দেখা হয়, ইসরায়েল সিরিয়ায় হামলা চালিয়ে দেশটির বিমান ও নৌবাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করার সময় তুরস্ক বাস্তবে কী করেছিল, তাহলে ভিন্ন একটি চিত্র সামনে আসে।
ইসরায়েল সিরিয়ার সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানোর পর তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘর্ষ এড়াতে (ডিকনফ্লিকশন) একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা বা সমন্বয় লাইন নিয়ে আলোচনা হয়। হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে ছিল হামা ও তিয়াস বিমানঘাঁটি। এই ঘাঁটিগুলোতেই তুরস্ক নিজেদের সামরিক উপস্থিতি স্থাপনের পরিকল্পনা করছিল।
গাজায় পুরো সামরিক অভিযান চলাকালেও তুরস্কের জেইহান বন্দর হয়ে আজারবাইজানের তেল ইসরায়েলে প্রবাহিত হতে থাকে। সম্ভবত এটি ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্প এরদোয়ানকে করতে বলেছিলেন এমন ‘কয়েকটি কাজের’ একটি। ‘স্টপ ফুয়েলিং জেনোসাইড’ প্রচারণার কর্মীরা এমন প্রমাণ প্রকাশ করেন, যাতে দেখা যায়, ‘সিভিগর’ নামের একটি তেলবাহী জাহাজ তুরস্কের জেইহান বন্দর থেকে অপরিশোধিত তেল নিয়ে ইসরায়েলের আশকেলনের কাছে একটি পাইপলাইনে অন্তত আটবার সরবরাহ করেছে। ২০২৪ সালে তুরস্ক বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করার পরও এসব চালান অব্যাহত ছিল।
তুর্কি কর্মকর্তারা নেতানিয়াহুর বক্তব্যকেও মূলত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণ হিসেবে গুরুত্ব কমিয়ে দেখিয়েছেন। তাঁরা বারবার উল্লেখ করেছেন, তুর্কি সেনাবাহিনী ও ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে স্থাপিত সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা (হটলাইন), সিরিয়ায় ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো সংঘাতে জড়ানোর বিরোধিতা করা তুর্কি জেনারেলদের অবস্থান এবং তুর্কি ও ইসরায়েলি নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে বিদ্যমান যোগাযোগের বিষয়টি।
এর আগে, ২০২২ সালে, অর্থাৎ হাকান ফিদান গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার আগের বছর তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থা ইরানের গোয়েন্দা ব্যবস্থার তিনটি পৃথক শাখার পরিকল্পিত ১০টি ভিন্ন হত্যাচেষ্টা নস্যাৎ করে। লক্ষ্যবস্তু ছিলেন তুরস্ক ও ককেশাস অঞ্চলে অবস্থানরত ইহুদিরা। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো মিডল ইস্ট আইকে এ তথ্য জানিয়েছে।
তবে ২০২৪ সালের স্থানীয় নির্বাচনের পর এই শিথিল নীতিতে পরিবর্তন আসে। গাজা ইস্যুতে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের নেতৃত্বাধীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) বড় ধরনের ধাক্কা খায়। এরপর তুরস্ক যে ধারাবাহিক পদক্ষেপ নেয়, তার বেশির ভাগই ছিল কূটনৈতিক। একই সঙ্গে সিরিয়া ইস্যুতে ট্রাম্প এবং তাঁর রাষ্ট্রদূত টম বারাককে নিজেদের পক্ষে আনার কৌশলের ওপরও এসব পদক্ষেপ নির্ভরশীল ছিল।
আজ আঙ্কারার পরিবেশ বদলে গেছে। সেখানে এখন এই উপলব্ধি তৈরি হয়েছে যে—আসন্ন সংঘাত নিয়ে ইসরায়েল যা বলছে, তা সত্যিই বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে বলছে। তাই তুরস্ক এখন নিজেদের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। তা নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী কিংবা ড্রোন সক্ষমতা, সব ক্ষেত্রেই।
বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসন তুরস্ককে তাদের নতুন প্রজন্মের কান স্টেলথ যুদ্ধবিমান তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন সরবরাহ করছে। একই সময়ে আঙ্কারা ৬০ হাজার টন ধারণক্ষমতার একটি বিমানবাহী রণতরী নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে এবং আরও ৩০টি যুদ্ধজাহাজ তৈরি করছে। সম্প্রতি দেশটি মিসরের নৌবাহিনীর সঙ্গেও একটি যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনা করেছে।
তারপরও তুরস্ক সময় কিনতে চাইছে। দেশটির প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের ধারণা, ইসরায়েলের বিমানবাহিনীর মোকাবিলায় কার্যকর সক্ষমতা অর্জন করতে তুরস্কের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আরও তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে। গাজা যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে তুরস্কের প্রধান কৌশল ছিল সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে নিয়ে একটি প্রতিরক্ষা জোট গঠনের উদ্যোগে মনোযোগ দেওয়া। এই একই আঞ্চলিক শক্তিগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও পালন করেছিল। ইসরায়েল ঠিক এই জোটকেই ভয় পায় এবং এখন সেটিকে ভেঙে দিতে কাজ করছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে সামনে যা-ই ঘটুক না কেন, ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচলের বাকি অঞ্চলের মধ্যে প্রধান সংঘর্ষরেখা গড়ে উঠবে লেবানন ও সিরিয়াকে কেন্দ্র করে। এই পুরো পরিস্থিতি থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের সীমান্ত পুনর্গঠনের যে অঙ্গীকার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী করে আসছেন, সে বিষয়ে ইসরায়েল সত্যিই আন্তরিক। এই বাস্তবতা ঠেকাতে প্রয়োজন কঠোর সামরিক শক্তি।
অঞ্চলের আরব রাষ্ট্রগুলো যত বেশি সময় তাদের প্রতিক্রিয়া জানাতে দেরি করবে, অথবা কেবল ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর ভরসা করে দুর্বল অবস্থান নেবে, তত বড় ধাক্কার মুখে পড়বে তারা, যখন ইসরায়েল আবারও তার ‘আগে হত্যা, পরে ব্যাখ্যা’ নীতিতে এগোবে।
মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকা সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন ওষুধ-বাণিজ্য চুক্তির ফলে ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা (এনএইচএস) থেকে বিপুল অর্থ নতুন মার্কিন ওষুধ কেনায় ব্যয় করতে হবে। এর ফলে স্বাস্থ্যসেবার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাত অর্থসংকটে পড়বে এবং ২০৩৬ সালের মধ্যে প্রায় ২ লাখ ২৯ হাজার অতিরিক্ত
৪০ মিনিট আগে
বিশাল পর্দাটি ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে গেছে। কিন্তু হাজারো সমর্থক তখনো গলা ফাটিয়ে স্লোগান দিচ্ছেন ‘আর্জেন্টিনা! আর্জেন্টিনা! মেসি! মেসি!’ চারদিকে বেজে চলেছে ভুভুজেলা। জনসমুদ্র যেন আকাশি-সাদা রঙে রঞ্জিত। এর কিছুক্ষণ আগেই আর্জেন্টিনার ত্রাণকর্তা লিওনেল মেসি আলজেরিয়ার বিপক্ষে দলের বিশ্বকাপের...
৪ ঘণ্টা আগে
তারেক রহমানের এই সফরকে খুব বড় কোনো ঘটনা বলে মনে নাও হতে পারে। চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অংশীদার ও উন্নয়ন সহযোগী। এক দশকের বেশি সময় ধরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে গভীর হয়েছে। তবে সফরটি কেবল আরেকটি উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সফর নয়।
৭ ঘণ্টা আগে
এবার (২০২৬ সাল) ফিফা বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই টিকিটের মূল্য নিয়ে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। সমালোচকদের মতে, ফিফার নতুন ‘ডাইনামিক প্রাইসিং’ বা চাহিদাভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা বিশ্বকাপকে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের নাগালের বাইরে ঠেলে দিচ্ছে এবং সংস্থাটির ঘোষিত মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক লক্ষ্যকে প্রশ্নের
২১ ঘণ্টা আগে