Ajker Patrika

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন /রাতের আঁধারে ‘নিষ্ঠুরভাবে’ হাজারো মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাচ্ছে ভারত, অধিকাংশই মুসলিম

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৬, ১০: ৫৬
রাতের আঁধারে ‘নিষ্ঠুরভাবে’ হাজারো মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাচ্ছে ভারত, অধিকাংশই মুসলিম
শূন্য রেখায় আটকে পড়া ভারত থেকে ঠেলে পাঠানো আপেল মিয়া ও তাঁর পরিবার। ছবি: ফাইন্যানসিয়াল টাইমস

বিশ্বের দীর্ঘতম সীমান্তগুলোর একটি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। সেখানকারই এক জলাভূমিময়, আর্দ্র প্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি) মেগাফোনে ভারতের সীমান্তরক্ষীদের উদ্দেশে বলছেন, ‘মানুষকে সীমান্ত পেরিয়ে ঠেলে পাঠাবেন না।’

বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির ল্যান্স করপোরাল মাহমুদ মাসুদ বলেন, ‘তারা (ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ) অন্ধকার হওয়ার অপেক্ষা করে। তারপর স্পটলাইট বন্ধ করে সুযোগ বুঝে কাজটা করে।’ নয়াদিল্লির কিছু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা যে প্রক্রিয়াকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ বহিষ্কারের অভিযান বলে বর্ণনা করছেন তিনি ভারতের সেই প্রচেষ্টার সমালোচনা করেন।

গত মে মাসে নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনে জয়ের পর থেকে এই ‘পুশ ইন’ বা মানুষকে সীমান্ত পেরিয়ে ঠেলে বাংলাদেশে পাঠানোর ঘটনা বেড়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ হাজার হাজার মানুষকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়েছে, যাদের অধিকাংশই ছিলেন বাঙালি মুসলিম বংশোদ্ভূত।

এই ‘পুশ ইনে’ কোনো আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় না। আর যাদের বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে, তাদের অধিকাংশই কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে থাকেননি, এমনকি কেউ কেউ কোনো সময়ই সেখানে বসবাস করেননি।

বিজিবির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, ‘তারা ভারতের সীমান্তের ফটক খুলে মানুষকে অন্ধকারের মধ্যে ঠেলে দেয়...সেখানে নারী আছে, শিশু আছে, আর এই অসহায় মানুষগুলো মাঝখানে আটকা পড়ে যায়।’ তিনি সীমান্তের দুই দেশের মাঝখানের সংকীর্ণ ‘শূন্যরেখায়’ আটকে পড়া কয়েক ডজন মানুষের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে এসব বলেন। এই এলাকা কার্যত দুই দেশের মাঝের জনশূন্য সীমান্ত অঞ্চল।

এই বহিষ্কার অভিযান দুই দেশের মধ্যকার নাজুক সম্পর্ককে আরও খারাপ করেছে। একই সঙ্গে এটি ভারতে ক্রমবর্ধমান হিন্দু জাতীয়তাবাদ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে এবং পশ্চিমবঙ্গ ও অন্যান্য সীমান্তবর্তী রাজ্যে বসবাসরত লাখো মুসলমানের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তীব্র করেছে। ভারতের সবচেয়ে দীর্ঘ স্থলসীমান্ত বাংলাদেশের সঙ্গে। বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দেশ, যার সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গভীর। দুই দেশের সীমান্তের দুই পাশেই লাখো মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। এ ছাড়া বর্তমান বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মানুষের যাতায়াত ও অভিবাসনের ইতিহাস রয়েছে।

বহু বছর ধরে বিজেপি তথাকথিত ‘বাংলাদেশি অভিবাসীদের’ বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রচার চালিয়ে আসছে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং মোদির ঘনিষ্ঠ সহযোগী অমিত শাহ একসময় তাদের ‘উইপোকা’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পর রাজ্য প্রশাসন কঠোর অভিযান শুরু করে। এ সময় ‘হোল্ডিং সেন্টার’ স্থাপন করা হয়। এসব সেন্টারে প্রধানত ‘কাগজপত্রবিহীন তথাকথিত বাংলাদেশি’ অথবা মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা মুসলিম অভিবাসীদের আটক ও বহিষ্কারের ব্যবস্থা করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের ৯ কোটি মানুষের প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলমান।

সমালোচকদের অভিযোগ, এই বহিষ্কার অভিযান ভারতের মুসলিম সংখ্যালঘুদের স্বার্থ উপেক্ষা করে দেশটিকে একটি হিন্দু রাষ্ট্রে রূপান্তরের বিজেপির রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপ্রধান মীনাক্ষী গাঙ্গুলি অভিযোগ করেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ‘নিষ্ঠুরভাবে’ মূলত মুসলিম পরিবারগুলোকে বাংলাদেশে ফেলে দিচ্ছে অথবা সীমান্তে আটকে রেখে যাচ্ছে।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ভারত সরকারের উচিত ‘অবৈধভাবে মানুষ বহিষ্কার বন্ধ করা, প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা এবং মুসলমানদের প্রতি এই হতাশাজনক বৈরিতা বন্ধ করা।’

ভারতীয় কর্মকর্তারা বলেছেন, ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির আওতায় তথাকথিত ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের’ সীমান্ত পার করে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী ও মোদির মিত্র শুভেন্দু অধিকারী জুন মাসে কলকাতায় বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রায় ১০ হাজার অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং আরও ১ হাজার ৮০০ জন বহিষ্কারের অপেক্ষায় রয়েছেন।

প্রতিবেশী রাজ্য আসামে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, তাঁর রাজ্য তথাকথিত ‘বাংলাদেশি মুসলমানদের অবৈধ অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে নিরলস যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে’ এবং তাদের ‘অস্তিত্বই আমাদের জাতির জনমিতিক কাঠামো বদলে দেওয়ার হুমকি।’ তিনি বলেন, আসাম ‘একজন অবৈধ অভিবাসীকেও ছাড় দেবে না’ এবং তাদের ‘যেখানে তাদের স্থান, সেখানে ঠেলে পাঠানো হবে।’

এই নীতিতে ক্ষুব্ধ বাংলাদেশের সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন এই সরকার ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নিয়েছে, তবে এখনো ভারতে সফরে গিয়ে মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেনি। ঢাকার কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। ফলে হাজার হাজার ফেরত পাঠানো অভিবাসীকে গ্রহণ করা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব নয়।

প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘তারা এভাবে মানুষকে শুধু সীমান্তের ওপারে ঠেলে দিতে পারে না।’ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, এই ‘পুশ ইন’ দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। মোদির ঘনিষ্ঠ মিত্র শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধে অনুপস্থিত অবস্থায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক এই নেত্রীকে প্রত্যর্পণের জন্য ঢাকার একাধিক অনুরোধ নয়াদিল্লি উপেক্ষা করেছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারতে অবস্থানরত অবৈধ বিদেশিদের আইনের আওতায় মোকাবিলা করা হবে। তিনি জানান, নয়াদিল্লি বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে ২ হাজার ৬৮০টির বেশি মামলা পাঠিয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জাতীয়তা যাচাইয়ের জন্য। তবে ‘অনেক ক্ষেত্রে এই যাচাই পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে।’

এক জ্যেষ্ঠ ভারতীয় কর্মকর্তা বলেন, ‘বহিষ্কার মানে দ্রুত বহিষ্কার করা, কিন্তু যেই দেশে পাঠানো হবে তাদের সহযোগিতা প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশ থেকে সেই সহযোগিতা কখনো পাওয়া যায় না।’ তাঁর দাবি, তাই ভারত বাধ্য হয়ে অভিবাসীদের ‘পুশব্যাক’ করছে। তিনি আরও বলেন, ‘শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে তাঁকে বন্ধু হিসেবে দেখা হতো, তাই আমরা বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি চাপ দিইনি। কিন্তু এখন তিনি ক্ষমতায় নেই, তাই আমরা এটি অনেক বেশি জোরালোভাবে করব।’

এসব কার্যক্রমের তীব্রতা সীমান্ত এলাকাতেই স্পষ্ট। বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী সেখানে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং ড্রোন নজরদারি বাড়িয়েছে। সীমান্তের বাংলাদেশ অংশে সিঙ্গিমারী নদীর কাছের কলাখেতে দেখা হয় অপেল মিয়ার সঙ্গে। কাগজপত্রবিহীন এই ব্যক্তি জানান, তিনি এক দশক ধরে ভারতে বসবাস করছিলেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের আগে বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব বাড়তে থাকায় তিনি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।

তাঁর ভাষ্য, এরপর ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা গভীর রাতে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে কোনো কাগজপত্র ছিল না। আমাদের একটি মাদ্রাসা থেকে পিকআপ ট্রাকে তোলা হয়। তারা আলো বন্ধ করে দেয়, গেট খুলে ফাঁকা গুলি ছোড়ে এবং বলে, ‘এখন যাও, ভয় পাওয়ার কিছু নেই, তোমরা বাংলাদেশি। কিন্তু আমরা ভয় পেয়েছিলাম। অন্ধকারে পা রেখে কোথায় যাব, সেটাই বুঝতে পারছিলাম না।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত