
অনলাইনে প্রশ্নফাঁস নিয়ে যে ক্ষোভের সূচনা হয়েছিল, তা খুব দ্রুতই এমন এক প্রজন্মগত গণবিদ্রোহে রূপ নিয়েছে, যা একটি সিস্টেম বা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। এই ব্যবস্থা তরুণ ভারতীয়দের ব্যবহার করে ফেলে দেওয়ার মতো বস্তু হিসেবেই বিবেচনা করে। জবাবদিহির প্রশ্নটি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে এই শিক্ষার্থীরা দিল্লির রাজপথকে এমন এক রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত করেছে, যেখানে ক্ষমতাসীনরা আর দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারবে না, কিংবা আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে রাখতে পারে না।
শিক্ষার্থীদের সংসদ অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল আগের আন্দোলনগুলোর তুলনায় একটি গুণগত পরিবর্তনের সূচক। কারণ, তারা একটি একক ইস্যু, অর্থাৎ পরীক্ষা-সংক্রান্ত কেলেঙ্কারিকে মোদি সরকারের শাসনব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে এক সর্বব্যাপী অভিযোগে রূপান্তরিত করেছে। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে ওঠা জেন-জি প্রজন্ম।
আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ, বারবার পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস, শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাগত ব্যর্থতার জন্য তিনি দায়ী। কিন্তু এখন রাজপথের ক্ষোভ স্পষ্টভাবেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং গত ১২ বছরের তাঁর শাসনকালকে লক্ষ্য করে। আন্দোলনকারীদের কাছে এখন শিক্ষামন্ত্রী থাকবেন না যাবেন, সেটি আর মূল প্রশ্ন নয়। বরং তরুণরা সরাসরি মোদির শাসনধারাকেই জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের অত্যন্ত দুর্বল কর্মদক্ষতার পরও তাঁকে রক্ষা করে মোদি কার্যত এই আন্দোলনকে একজন মন্ত্রীর জবাবদিহির দাবির সীমা ছাড়িয়ে তাঁর নিজের নেতৃত্বের ওপর এক ধরনের গণভোটে পরিণত করেছেন।
ভারতের প্রধান বিচারপতির ‘তেলাপোকা’ মন্তব্যের পর ব্যঙ্গাত্মক ও ভাইরাল তরুণদের প্রচারণা হিসেবে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) সূচনা হয়েছিল। কিন্তু জন্তর মন্তর ও সংসদমুখী মিছিলে এখন যা ঘটছে, তা সেই মিম বা সংগঠনের গণ্ডি বহুদূর অতিক্রম করে এক বিস্তৃত, বিকেন্দ্রীভূত তরুণ বিদ্রোহে পরিণত হয়েছে। এটি আর সিজেপির সাংগঠনিক সক্ষমতা বা সোনম ওয়াংচুকের মতো ব্যক্তিত্বদের নেতৃত্বনির্ভর প্রচলিত রাজনৈতিক আন্দোলন নয়। কোনো কোনো নেতাকে ক্ষমতাসীনরা চাপ দিয়ে বা সমঝোতার মাধ্যমে প্রভাবিত করতে পারলেও, এই জনসমুদ্র গঠিত হয়েছে এমন সব স্বাধীনচেতা তরুণদের নিয়ে, যারা নিজেদের উদ্যোগে এসেছে, ভাড়া করা বাসে করে আনা কোনো সমর্থক নয়।
ওয়াংচুকের অনশন প্রত্যাহারের শর্ত নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হলেও শিক্ষার্থীরা সেই গুজব অতিক্রম করে আন্দোলন চালিয়ে যায়। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে তরুণদের হাতে চলে গেছে এবং এটি সহজে আলোচনার টেবিলে নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়।
অতীতে বড় বড় গণআন্দোলনগুলোকে মোদি সরকার ও ‘গোদি মিডিয়া’ পরিচয়ভিত্তিক অপপ্রচারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ বা অকার্যকর করার চেষ্টা করেছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) বিরোধী আন্দোলনকে ‘মুসলিমদের আন্দোলন’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, কৃষক আন্দোলনকারীদের ‘খালিস্তানি’ বলা হয়েছিল, আর বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ভিন্নমতকে ‘দেশবিরোধী’ কিংবা ‘আরবান নকশাল’ আখ্যা দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু বর্তমান আন্দোলন গড়ে উঠেছে পরীক্ষার স্বচ্ছতা, বেকারত্ব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে, যা জাত, ধর্ম ও আঞ্চলিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে। এই আন্দোলনের মূল অংশগ্রহণকারীরা শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশী তরুণ, যারা মূলধারার উচ্চাকাঙ্ক্ষী ভারতের প্রতিনিধিত্ব করে। এর মধ্যে চাকরিপ্রত্যাশী এবং শহুরে পেশাজীবীরাও রয়েছেন। ফলে তাদের কোনো নির্দিষ্ট ‘শত্রু’ পরিচয়ে ফেলে অপপ্রচার চালানো অনেক কঠিন, কারণ এতে মোদির রাজনৈতিক উত্থানের অন্যতম প্রধান সমর্থক জনগোষ্ঠীকেই বিচ্ছিন্ন করার ঝুঁকি রয়েছে।
সমাবেশটিও ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। আন্দোলনকারীরা সচেতনভাবে সর্বোচ্চ শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখছেন এবং প্রকাশ্যে জানিয়ে দিচ্ছেন, তারা কোনোভাবেই ‘গোদি মিডিয়া’র হাতে এমন কোনো অজুহাত তুলে দিতে চান না, যাতে তাদের সহিংস আন্দোলনকারী হিসেবে চিত্রিত করা যায়। ফলে এই আন্দোলন মোদি সরকারের পরিচয়ভিত্তিক পুরোনো দানবায়ন কৌশলকে সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর করে দিয়েছে।
সিজেপির জন্মকাহিনিই উচ্চতর বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক ধরনের অভিযোগপত্র। প্রধান বিচারপতি পরে ‘পরজীবী’ মন্তব্যটি কাদের উদ্দেশে করেছিলেন, তা স্পষ্ট করলেও ‘তেলাপোকা’ মন্তব্যটি বেকার তরুণদের মধ্যে এই ধারণাকে শক্তিশালী করে যে দেশের সর্বোচ্চ আদালতও তাদের প্রতি অবজ্ঞাপূর্ণ মনোভাব পোষণ করে। প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় পরবর্তী সময়ে আদালতের কাছ থেকে কার্যকর প্রতিকার না পাওয়ায় এই অনুভূতি আরও গভীর হয়েছে যে আইনি পথ কার্যত শেষ হয়ে গেছে।
মানুষের রাস্তায় নেমে আসার অন্যতম প্রধান কারণ হলো এই উপলব্ধি যে গণতান্ত্রিক অসন্তোষ প্রকাশের প্রচলিত প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে মূলধারার গণমাধ্যম, সংসদ এবং বিচারব্যবস্থা, কার্যত ভেঙে পড়েছে।
বড় টেলিভিশন চ্যানেলগুলো হয় বিশাল জনসমাগমকে গুরুত্ব দিচ্ছে না, নয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে তা আড়াল করছে, কিংবা আন্দোলনকারীদের অপদস্থ করার চেষ্টা করছে। অতীতের আন্দোলনকারীদের বছরের পর বছর জামিন ছাড়া কারাগারে থাকার স্মৃতিও এখনও মানুষের মনে তাজা। যেহেতু গণতান্ত্রিক অভিযোগ জানানোর প্রাতিষ্ঠানিক দরজাগুলো কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে, তাই জনগণ নিজেদের দাবি তুলে ধরতে বাধ্য হয়ে সরাসরি দিল্লির রাজপথ দখল করেছে।
এক মাস ধরে সরকার শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার চেষ্টা করেছে। আলোচনার জন্য একজন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা সচিবকেও পাঠানো হয়নি। আন্দোলনকারীরা এখন দৃঢ়ভাবে দাবি করছেন, মোদি সরকারকে জনগণের কাছে মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতেই হবে: বারবার পরীক্ষা ব্যর্থ হচ্ছে কেন? এর জন্য দায়ী কে? কী ধরনের সংস্কার করা হবে? এত প্রাণহানির পরও কেন কোনো মন্ত্রী দায় স্বীকার করেননি?
কলেজে ভর্তি মৌসুমের ভিড়ে এই বিষয়টিকে চাপা পড়তে না দিয়ে তরুণরা রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্নকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছে, যেখান থেকে মোদি সরকারের পক্ষে আর বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিপুলসংখ্যক তরুণের এই অংশগ্রহণ পদ্ধতিগত দুর্নীতি, ধারাবাহিক প্রশ্নফাঁস এবং সাশ্রয়ী সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার অবক্ষয়ের প্রশ্নকে সংসদমুখী পদযাত্রার মাধ্যমে সরাসরি রাজনৈতিক নেতৃত্বের দরজায় পৌঁছে দিয়েছে।
এ পর্যন্ত মোদি সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল নীরবতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার আড়ালে বিষয়টি ঠেকিয়ে রাখা এবং অবজ্ঞাসূচক বক্তব্যের মিশ্রণ। যে কৌশলটি খণ্ডিত বা সহজে কলঙ্কিত করা যায় এমন আন্দোলনের বিরুদ্ধে আগে কার্যকর হয়েছিল, সেটিই এখন সরকারকে এমন এক হরিণের মতো দেখাচ্ছে, যে হঠাৎ গাড়ির হেডলাইটের সামনে পড়ে স্থবির হয়ে গেছে। সরকার আলোচনায় বসতে চাইছে না, আবার দৃশ্যত শান্তিপূর্ণ এই তরুণ নেতৃত্বাধীন আন্দোলনকে শক্তি প্রয়োগ করে দমনও করতে পারছে না। একই সঙ্গে এমন এক প্রজন্মের মুখোমুখি হয়েছে, যারা ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে, তারা দীর্ঘ লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত।
ক্ষমতাসীন শিবির এবং তাদের সমর্থকেরা হয়তো প্রকাশ্যে এই আশঙ্কার কথা বলতে চান না, কিন্তু তারা জানেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরুণদের কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করা হলে রাজপথের আন্দোলন কী ধরনের পরিবর্তন এনে দিতে পারে।
এই মুহূর্তটিকে মৌলিকভাবে আলাদা করে তুলেছে একটি বিষয়: সাধারণ মানুষকে আর আতঙ্কগ্রস্ত বলে মনে হচ্ছে না। ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন, সর্বত্র নজরদারি ক্যামেরা, টিয়ার গ্যাস এবং বলপ্রয়োগের পরও বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ভীতির পরিবেশ ভেঙে দিয়েছে। মানুষ শুধু ঘর থেকে বেরিয়ে আসেনি; তারা ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতাকে রূপ দিয়েছে উচ্চকণ্ঠ, সম্মিলিত প্রতিবাদে।
বিভক্ত হওয়া, অপবাদ মেনে নেওয়া কিংবা নীরব হয়ে যাওয়া প্রত্যাখ্যান করে এই শিক্ষার্থী-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন মোদি সরকারের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কৌশলকে কার্যত অকার্যকর করে দিয়েছে। ফলে নরেন্দ্র মোদির ‘শক্তিমান নেতা’ ভাবমূর্তির ওপর নির্ভরশীল রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখন দৃশ্যত অস্বস্তিতে এবং এমন এক জবাবদিহির সংকটের মুখোমুখি, যা এড়িয়ে যাওয়া আর সম্ভব নয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যার থেকে অনূদিত

ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন থেকে এক ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন। দেশটির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে এক যুগান্তকারী অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত আধিপত্যকে নাড়িয়ে দেওয়ার শঙ্কা তৈরি করেছে। চীনা প্রতিষ্ঠান মুনশটের তৈরি ওপেন সোর্স এআই মডেল ‘কিমি কে৩’ বাজারে আসার পর থেকেই শেয়ারবাজারে
৪ ঘণ্টা আগে
স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইকে উদ্দেশ্য করে একটি বার্তা পাঠান। তিনি বলেন, ‘হাভিয়ের, আপনি একজন সত্যিকারের বন্ধু, অসাধারণ বন্ধু। আমরা আপনাকে এবং আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করি।...
২১ ঘণ্টা আগে
ভূরাজনৈতিক সংঘাতের সময় অপরিশোধিত তেলের তুলনায় সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়ে ডিজেল। কারণ, এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল পরিবহন, কৃষি, শিল্প, নির্মাণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো।
১ দিন আগে
ভারতের রাজনীতিতে ‘রামরাজ্য’ এখন বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ। আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতীক হিসেবে প্রায়ই এই ধারণার উল্লেখ করেন বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা। তবে বাল্মীকি রামায়ণে বর্ণিত রামরাজ্য আসলে কেমন ছিল? সেখানে ন্যায়বিচার, শাসকের দায়িত্ব এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব সম্পর্কে কী বলা...
২ দিন আগে