
বিহারের বাঁকিপুর বিধানসভা উপনির্বাচনে পরাজয়ের পর উত্তর প্রদেশের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে নতুন করে চিন্তায় পড়েছে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি। দলটির অন্যতম পুরোনো সমর্থক উচ্চবর্ণের ভোটারদের মধ্যে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা উত্তর প্রদেশেও ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজেপির নেতারা।
নির্বাচন সামনে রেখে উত্তর প্রদেশে উচ্চবর্ণের বিভিন্ন অংশের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে মূলত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নতুন সমতা বিধিমালা ঘিরে। চলতি বছরের শুরুতে এসব বিধিমালা নিয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে গত ৩ আগস্ট রাজস্থানের জয়পুরে রাজপুত করণি সেনা ওই বিধিমালার বিরুদ্ধে সমাবেশ করে। বিজেপি কার্যালয়ের দিকে বিক্ষোভকারীদের মিছিল ঠেকাতে পুলিশ বলপ্রয়োগ করে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, হিন্দিভাষী ভারতের অন্যান্য অংশেও বিজেপির বিরুদ্ধে উচ্চবর্ণের অসন্তোষ ধীরে ধীরে বাড়ছে।
উল্লেখ্য, ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৈষম্য দূর করতে প্রমোশন অব ইক্যুইটি ইন হায়ার এডুকেশন ইনস্টিটিউশনস রেগুলেশনস, ২০২৬ বা সমতা বিধিমালা জারি করে। এই বিধিমালার লক্ষ্য অনগ্রসর শ্রেণি, তফশিলি জাতি (এসসি), তফশিলি উপজাতি (এসটি) এবং অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণির (ওবিসি) সুরক্ষা ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা। তবে আইনি বিতর্ক ও প্রতিবাদের মুখে সুপ্রিম কোর্ট এই বিধিমালার ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছে।
দিল্লির যন্তর মন্তরে ইউজিসির বিধিমালা বাতিলের দাবিতে যে আন্দোলন হয়েছিল, তাতেও বামপন্থী ও আম্বেদকরপন্থীদের সমর্থন ছিল। তবে বিজেপির এক নেতা মনে করেন, গত ১২ বছরে দেখা যায়নি এমন শক্তি নিয়ে এবারের আন্দোলন গড়ে ওঠার পেছনে বড় কারণ হলো বিষয়টি শহুরে উচ্চবর্ণের পরিবারগুলোর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কারণ এসব পরিবারের সন্তানদের বড় একটি অংশ উচ্চশিক্ষা ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত।
ওই বিজেপি নেতা বলেন, শুরুতে আন্দোলনে আম্বেদকরপন্থীরা ছিল। পরে বামপন্থীরাও যোগ দেয়। কিন্তু উচ্চবর্ণের মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণ ও সহানুভূতিই আন্দোলনটিকে সামাল দেওয়া কঠিন করে তোলে।
বাঁকিপুরে পরাজয়ের পর বিজেপির অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণে উচ্চবর্ণের অসন্তোষকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে উত্তর প্রদেশেও একই ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি নিয়ে সতর্ক দলটির নেতারা।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইউজিসির নতুন বিধিমালা কার্যকর করা হয়। উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতপাতের কারণে বৈষম্য ঠেকানোই ছিল এসব বিধিমালার অন্যতম উদ্দেশ্য। কিন্তু এর বিরোধিতায় মূলত উচ্চবর্ণের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আন্দোলনে নামে। তাঁদের দাবি, নতুন নিয়মগুলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে জাতপাতের বিভাজন আরও বাড়াতে পারে এবং সাধারণ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা হয়রানির শিকার হতে পারেন।
পরে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বিধিমালাগুলো স্থগিত করেন। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, এসব বিধিমালা পরীক্ষা না করে কার্যকর থাকলে এর ‘ব্যাপক পরিণতি’ হতে পারে এবং তা সমাজকে বিভক্ত করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
উত্তর প্রদেশের বিজেপির কয়েকজন ব্রাহ্মণ ও ঠাকুর নেতা জানিয়েছেন, তাঁদের সম্প্রদায়ের মধ্যে এখনো ইউজিসি বিধিমালা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। তাঁদের সেই ক্ষোভ প্রশমিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সুলতানপুরের এক ব্রাহ্মণ বিজেপি নেতা বলেন, উচ্চবর্ণের মানুষের প্রশ্ন—নতুন ইউজিসি বিধিমালার প্রয়োজন কী? তাঁদের বক্তব্য, বিজেপির কঠিন সময়ের সমর্থক ছিল উচ্চবর্ণের মানুষ। রাম জন্মভূমি আন্দোলনের সময়ও ওবিসি ও দলিতরা বিজেপির সঙ্গে একীভূত হওয়ার আগেই উচ্চবর্ণের মানুষ দলটির পাশে দাঁড়িয়েছিল এবং বুথে বুথে কাজ করেছিল। এখন সেই বিজেপিই তাঁদের ক্ষতি করছে—এমন প্রশ্ন তুলছেন তাঁরা।
প্রতাপগড়ের আরেক ব্রাহ্মণ নেতা বলেন, প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও তাঁর সম্প্রদায়ের মানুষ বিজেপিকেই ভোট দেবেন—এমনটা দল ধরে নিচ্ছে। তবে ব্রাহ্মণদের একটি অংশ বিজেপির বিরুদ্ধে গেলে বহুজন সমাজ পার্টিকে (বিএসপি) ভোট দেওয়ার কথা বলছে। সমাজবাদী পার্টির (এসপি) প্রতি তাঁদের অনীহা রয়েছে মূলত যাদব ভোটব্যাংকের কারণে।
অযোধ্যার এক উচ্চবর্ণের বিজেপি নেতা বলেন, ইউজিসি বিধিমালা ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো বিষয় নিয়ে দলীয় কর্মীদের মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বস্তিতে পড়তে হচ্ছে। তাঁর মতে, ইউজিসি ইস্যুতে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করলে উচ্চবর্ণের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা যেত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছাত্রদের প্রশ্নপত্র ফাঁসের আন্দোলনের চাপে তিনি পদত্যাগ করেন।
লখিমপুর খেরির এক নেতা বলেন, ক্ষোভ মূলত কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে, যোগী আদিত্য নাথের রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে নয়। কারণ ইউজিসি কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন। তবে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ঠাকুরদের বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া এবং বিহারের বাঁকিপুর উপনির্বাচনে ব্রাহ্মণদের ভোটের আচরণ দেখে ২০২৭ সালের উত্তর প্রদেশ নির্বাচন নিয়েও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বারাণসীর এক ঠাকুর নেতা বলেন, ইউজিসি বিধিমালা ও প্রশ্নপত্র ফাঁস এখন প্রায় প্রতিটি পরিবারেই আলোচিত হচ্ছে। কারণ প্রায় প্রতিটি পরিবারেই কোনো না কোনো শিক্ষার্থী রয়েছে এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অভিভাবকেরা উদ্বিগ্ন।
উচ্চবর্ণের ক্ষোভ বিজেপির জন্য নতুন নয়। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে ঠাকুর সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে অসন্তোষ বড় আকার ধারণ করেছিল। এর অন্যতম প্রভাব হিসেবে উত্তর প্রদেশে বিজেপির আসনসংখ্যা ২০১৯ সালের ৬২ থেকে কমে ৩৩-এ নেমে আসে।
মুজাফফরনগর, সাহারানপুর ও কৈরানার মতো আসনে ঠাকুরদের ক্ষোভ বিজেপির পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছিল বলে দলীয় সূত্রের দাবি। মিরাট ও মথুরাতেও বিজেপির জয়ের ব্যবধান কমে যায়। পূর্ব উত্তর প্রদেশেও এর কিছু প্রভাব পড়েছিল।
গত মাসে একাধিক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বিজেপির সভাপতি নীতিন নবীন দলীয় নেতাদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি তাঁদের নিজেদের জাতপাতের অবস্থান দিয়ে বিষয়টি না দেখার আহ্বান জানান। বৈঠকে তিনি আশ্বস্ত করেন, ইউজিসি বিধিমালা প্রণয়নের উদ্দেশ্য ভুল ছিল না এবং সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন করবে।
বিজেপির সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) বি এল সন্তোষও উত্তর প্রদেশের নেতাদের ইউজিসি ইস্যুটি সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলা করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, বিধিমালার বিজ্ঞপ্তিতে কিছু শব্দের ভুল ব্যবহার নেতিবাচক বার্তা তৈরি করেছে।
উত্তর প্রদেশের পাশাপাশি রাজস্থানেও উচ্চবর্ণের অসন্তোষ বিজেপির জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জয়পুরে ইউজিসি বিধিমালার বিরুদ্ধে রাজপুত করণি সেনার বিক্ষোভ তারই উদাহরণ।
করণি সেনার মুখপাত্র বিজেন্দ্র সিং জানিয়েছেন, সংগঠনটি এবার হরিয়ানাতেও প্রচার চালাবে। তাঁর অভিযোগ, উচ্চবর্ণ বিজেপির সবচেয়ে নিবেদিত ভোটব্যাংক হলেও দলটি অন্য শ্রেণির মধ্যে নিজেদের বিস্তার ঘটাতে গিয়ে উচ্চবর্ণকে অবহেলা করছে। কেন্দ্রীয় সরকার ওবিসি, তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতির দিকে নীতিগতভাবে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তবে রাজস্থানে এখনো এই অসন্তোষ করণি সেনার কিছু অংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলে মনে করা হচ্ছে। রাজপুত সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বড় অংশ এখনো এই আন্দোলনে যুক্ত হননি।
সব মিলিয়ে, বিজেপির জন্য উত্তর প্রদেশে উচ্চবর্ণের ভোট বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। ২০২৭ সালের নির্বাচনে বিজেপিকে রাজ্যের ক্ষমতা ধরে রাখার পাশাপাশি ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে কেন্দ্রের ক্ষমতা ধরে রাখার পথও তৈরি করতে হবে। তাই উচ্চবর্ণের অসন্তোষকে কতটা দ্রুত প্রশমিত করা যায়, সেটিই এখন দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনূদিত

ভারতে তরুণদের নেতৃত্বে বড় ধরনের ছাত্র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লেও দেশটির সবচেয়ে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকাদের বড় অংশই নীরব থেকেছেন। কয়েক দশক ধরে সামাজিক ন্যায়বিচার, নারীর অধিকার, ধর্মীয় উত্তেজনা কিংবা জাতীয় সংকটের মতো বিষয়ে সরব থাকা বলিউডের তারকাদের এই নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
৭ ঘণ্টা আগে
মজুরি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পরও কাঙ্ক্ষিত কর্মী পাচ্ছে না ভিয়েতনামের অন্যতম দুটি প্রধান রপ্তানি খাত—তৈরি পোশাক ও মৎস্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম উদীয়মান এই অর্থনৈতিক শক্তিতে এই বিপরীতমুখী চিত্র দেখা দিয়েছে এমন এক সময়ে, যখন দেশটির সরকার বৈদেশিক মুদ্রা ও রেমিট্যান্স
৭ ঘণ্টা আগে
আজকের ঝলমলে স্কাইস্ক্রেপার, বিলাসবহুল জীবনযাত্রা আর আধুনিকতার প্রতীক দুবাই কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ভারত বা পাকিস্তানের প্রশাসনিক অংশ হিসেবে কল্পনা করা সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। তবে ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, মাত্র আট দশক আগেও দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক রূপরেখা এমন ছিল না।
১০ ঘণ্টা আগে
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ন্যাটোর ঐক্য পরীক্ষা করার জন্য আগামী কয়েক বছরের মধ্যে জোটভুক্ত কোনো একটি দেশে সীমিত আকারে সামরিক হামলা চালাতে পারেন বলে সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে তৈরি সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য...
১ দিন আগে