
রাশিয়া-ইরান সম্পর্কের ইতিহাস দুই শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। এই সম্পর্ক বহু সংঘাত, যুদ্ধ ও অবিশ্বাসে ভরা। ১৮২৯ সালে তৎকালীন রুশ রাষ্ট্রদূত আলেক্সান্ডার গ্রিবোয়েদভ তেহরানে ক্ষুব্ধ জনতার হাতে নিহত হন। রাশিয়া-পার্সিয়া যুদ্ধের পর চুক্তি বাস্তবায়ন ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ওই ঘটনার পর ইরান রাশিয়াকে শান্ত করতে মূল্যবান ‘পার্সিয়ান ডায়মন্ড’ উপহার দেয়, যা এখনো মস্কোয় সংরক্ষিত আছে।
ঊনবিংশ শতকে রুশ সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে পারস্যের বিভিন্ন অঞ্চল দখল করে এবং দেশটিকে নিজেদের প্রভাব বলয়ে আনে। পরে সোভিয়েত যুগেও সম্পর্ক ওঠানামার মধ্য দিয়ে যায়। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানের নতুন শাসকগোষ্ঠী সোভিয়েত ইউনিয়নকে প্রায়ই ‘ছোট শয়তান’ বলে অভিহিত করত।
তবে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন মোড় নেয়। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা ও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান দুই দেশকে কাছাকাছি নিয়ে আসে। রাশিয়া জাতিসংঘে ইরানের পক্ষে অবস্থান নেয়, আর ইরান রুশ অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তির বড় ক্রেতায় পরিণত হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সম্পর্ক আরও গভীর হয়। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ সম্পন্ন করেছে এবং আরও চারটি কেন্দ্র নির্মাণে ২৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে। পাশাপাশি রুশ কোম্পানিগুলো ইরানের জ্বালানি খাতেও বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।
তবে ১৮২৯ সালে তেহরানে রুশ রাষ্ট্রদূত আলেক্সান্ডার গ্রিবোয়েদভকে হত্যা এবং ১৯৫০-এর দশকে ইরানের পাহলভি রাজবংশের মস্কো-বিদ্বেষী অবস্থান থেকে শুরু করে আজকের দিন পর্যন্ত রাশিয়া-ইরান সম্পর্কে কখনোই কোনো আদর্শিক বা আত্মিক বন্ধুত্ব ছিল না। মূলত রাশিয়া-ইরান জোট ছিল এমন একটি ‘কৌশলগত বিয়ে’, যেখানে একে-অপরের প্রয়োজনে তারা পাশে থাকতে বাধ্য হয়েছে।
কিন্তু সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে এই জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানামুখী আলোচনা চলছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই দুই শক্তির জোট কি ভেঙে যাচ্ছে?
বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জোটটি পুরোপুরি ভেঙে না পড়লেও এটি বর্তমানে পারস্পরিক স্বার্থের টানাপোড়েন এবং অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
রাশিয়া ও ইরানের মধ্যকার এই জোটে ফাটল ধরার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ক্রেমলিনের কাছে ইরানের চেয়ে ইউক্রেন ইস্যুটি অনেক বেশি নিজস্ব ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক চাপ কমাতে পুতিন প্রশাসন ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো বড় চুক্তিতে যেতে রাজি হতে পারে।
সাবেক রুশ কূটনীতিক বরিস বন্দরেভ বলেন, ‘মস্কো সুযোগ পেলে ইউক্রেন ইস্যুতে ছাড়ের বিনিময়ে ইরানকে ব্যবহার করতে চাইবে।’ তিনি মনে করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চলসহ অন্যান্য দখলকৃত অঞ্চলের ওপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়ার মতো বড় কোনো ছাড় দেয়, তবে মস্কো সানন্দে ইরানের হাত ছেড়ে দিতে পারে। অর্থাৎ ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেন ইস্যুতে ক্রেমলিনকে বড় কোনো সুবিধা দিলেই, পুতিন ইরানকে সামরিক প্রযুক্তি দেওয়া বন্ধ করে দেবে।
আর রাশিয়া যে ইরানের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, এটি বোঝা যায় তেহরানের সংকটের সময় পুতিনের ‘নিষ্ক্রিয়তা’ দেখে। কারণ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুর পরও মস্কো তেহরানের পাশে দাঁড়াতে কোনো সেনা পাঠায়নি।
নিউ ইউরেশিয়ান স্ট্র্যাটেজিক সেন্টারের অ্যাসোসিয়েট ফেলো রুসলান সুলেইমানভ মনে করেন, এই ঘটনাটি পুতিনের ভাবমূর্তিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে এবং প্রমাণ করেছে, সংকটের সময়ে রাশিয়া তার মিত্রদের সামরিকভাবে রক্ষা করতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক।
আরেকটি বিষয় হলো, মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়া কেবল ইরানেরই বন্ধু নয়। তেহরানের প্রধান দুই আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গেও পুতিনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া ইসরায়েলের ভেতরে থাকা বিপুলসংখ্যক রুশভাষী জনগোষ্ঠীর কারণে তেল আবিবের সঙ্গেও মস্কো সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করতে চায় না। এই ‘বহুমুখী নীতি’র কারণে ইরান কখনোই রাশিয়াকে শতভাগ বিশ্বাস করতে পারে না।
আবার চীন যখন রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের প্রধান বাজারে পরিণত হয়েছে, তখন ইরানও তাদের সস্তা অপরিশোধিত জ্বালানি তেল চীনের কাছেই বিক্রি করার জন্য রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক স্বার্থের জায়গায় তারা এখন একে অপরের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী।
রাশিয়া-ইউক্রেন সম্পর্ক বিশ্লেষক ও লেখিকা নিকিতা স্মাগিন বলেন, ‘রাশিয়া ও ইরান একে অপরকে সত্যিকার অর্থে পছন্দ করে না। তাদের সম্পর্ক মূলত বাস্তববাদী স্বার্থের ওপর দাঁড়িয়ে। ইরানিদের স্মৃতিতে রাশিয়া সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা খুবই কম।’
তবে এত কিছুর পরও রাশিয়া ও ইরানের এই জোট এখনই সম্পূর্ণ ভেঙে যাচ্ছে না। কারণ এর পেছনে রয়েছে কিছু বাধ্যবাধকতা। এর প্রথমটিই হলো—যৌথ ভূরাজনৈতিক শত্রুতা। যতক্ষণ পর্যন্ত ওয়াশিংটন ও পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়া-ইরানকে একঘরে করে রাখার নীতি বজায় রাখবে, ততক্ষণ ‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’ তত্ত্বে এই দুই দেশ একে অপরকে আঁকড়ে ধরে রাখবে।
এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে এখনো সামরিক ও প্রযুক্তিগত আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে ইরান যেভাবে রাশিয়াকে শাহেদ ড্রোন ও সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে সাহায্য করেছে, রাশিয়াও তার বিনিময়ে ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহকে জ্যামিং-প্রতিরোধী স্যাটেলাইট নেভিগেশন মডিউল এবং মার্কিন ঘাঁটির অবস্থান সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সাহায্য করে আসছে। ফলে এখনই এই জোট ভাঙার সম্ভাবনা খুব কম।
কিন্তু এই জোট যে দুর্বল হয়ে গেছে, তার আরেকটি প্রমাণ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান মধ্যস্থতায় রাশিয়ার অনুপস্থিতি। বর্তমানে চলমান যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে রাশিয়ার কোনো ভূমিকা নেই। পর্দার আড়ালে এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি পালন করছে পাকিস্তান।
আজারবাইজানের রাজধানী বাকু-ভিত্তিক ‘মিনভাল পলিটিকা’ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ও বিশ্লেষক এমিল মুস্তাফায়েভের মতে, মধ্যস্থতার জন্য যে আন্তর্জাতিক ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ প্রয়োজন তাই রাশিয়ার নেই। ১৯৯৪ সালের বুদাপেস্ট স্মারক লঙ্ঘন করে ইউক্রেনে হামলা চালিয়ে রাশিয়া সেই নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। ফলে এই অঞ্চলের সংকট সমাধানে রাশিয়ার অনুপস্থিতি প্রমাণ করে, বৈশ্বিক কূটনীতিতে মস্কো ও ইরানের এই জোটের কার্যকারিতা আগের চেয়ে অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়েছে।
তবুও আপাতত রাশিয়া ও ইরান উভয়ের জন্যই এই সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা চাপ মোকাবিলায় তারা একে অপরকে প্রয়োজন মনে করছে। কিন্তু রাশিয়া-ইরানের সম্পর্ক যেহেতু আদর্শিক বন্ধুত্বের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং অনেকটাই পরিস্থিতিনির্ভর কৌশলগত সমঝোতা, তাই ভবিষ্যতে বড় কোনো ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনে এটি সহজেই ভেঙে যেতে পারে।
আল জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা

২০২৪ সালের জানুয়ারি। হাড়কাঁপানো এক শীতের দিনে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) সামনে জড়ো হয়েছেন হাজার হাজার বিক্ষোভকারী। তাঁদের লক্ষ্য হলো, গাজায় ইসরায়েলের চালানো ১০০ দিনের বেশি ‘গণহত্যামূলক’ যুদ্ধের নিন্দা জানানো।
১ দিন আগে
ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই চার দিনের সফরে আজ শনিবার সকালে ভারতে এসে পৌঁছেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। আজ সকালে তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজধানী কলকাতায় এসে পৌঁছান।
২ দিন আগে
অনেক সামরিক পর্যবেক্ষক অবশ্য মনে করছেন, এই বিধ্বংসী মহড়া এবং হুমকি-ধমকি আসলে পশ্চিমাদের ভয় দেখানোর একটি ফাঁকা আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই নয়। একই সঙ্গে এটি কিয়েভ ও মিনস্কের মধ্যে সরাসরি কূটনৈতিক আলোচনার পথ উন্মুক্ত করার একটি ভিন্ন কৌশলও হতে পারে।
২ দিন আগে
ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে লাখ লাখ তরুণ-তরুণী নিজেদের ‘তেলাপোকা’ বলে পরিচয় দিতে শুরু করেছেন। শুনতে প্রথমে অদ্ভুত লাগলেও এর পেছনে রয়েছে দেশটিতে বিরাজমান গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষোভ। একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন আন্দোলন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) এখন ভারতের তরুণদের হতাশা, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক উপেক্ষার প্রতীক
২ দিন আগে