Ajker Patrika

ইরান সংকটে কতটা কার্যকর চীন-রাশিয়ার এসসিও

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইরান সংকটে কতটা কার্যকর চীন-রাশিয়ার এসসিও
কিরগিজস্তানে শুরু হওয়া এসসিও সম্মেলনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে দেখা হবে সি, পুতিন ও মোদির। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ জোরদার করায় নতুন করে পরীক্ষার মুখে পড়েছে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও)। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের পাল্টা শক্তি হিসেবে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বছরের পর বছর ধরে যে জোটকে বিস্তৃত করেছেন, ইরান সংকট সেই জোটের বাস্তব সক্ষমতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ন্যাশনাল’ জানিয়েছে, সোমবার (৩১ আগস্ট) কিরগিজস্তানে শুরু হওয়া এসসিও সম্মেলনে প্রথমবারের মতো ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে একই আয়োজনে মিলিত হবেন সি ও পুতিন। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর এটাই হবে তাঁদের প্রথম এমন বৈঠক। সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ছাড়াও মধ্য এশিয়ার দেশগুলো, পাকিস্তান ও বেলারুশের নেতারা অংশ নেবেন।

বেইজিংয়ের সেন্টার ফর চায়না অ্যান্ড গ্লোবালাইজেশনের প্রতিষ্ঠাতা হেনরি ওয়াং হুইয়াও বলেন, প্রতিবছরই একটি নতুন নিরাপত্তা জোটের উত্থানের বার্তা আরও স্পষ্ট ও জোরালো হচ্ছে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক একমেরু বিশ্বব্যবস্থা এখন আর আগের অবস্থায় নেই।

তবে ইরানকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে এসসিও কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরান ও তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ ধরনের কঠোর পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সংঘাত এসসিও-র অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতাগুলোও সামনে আনতে পারে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, সম্মেলনে ইরানের প্রতি মূলত প্রতীকী সংহতি প্রকাশ করা হবে। চীন বা রাশিয়া কেউই ইরানকে সামরিকভাবে সহায়তা করার প্রস্তুতি দেখায়নি। অর্থনৈতিক সহায়তাও সীমিত। ফলে নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা এসসিও-র জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চীন ও রাশিয়া ২০০১ সালে কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান ও কিরগিজস্তানকে সঙ্গে নিয়ে এসসিও প্রতিষ্ঠা করে। পরে ভারত, পাকিস্তান, ইরান ও বেলারুশ এতে যোগ দেয়। আফগানিস্তান ও মঙ্গোলিয়া পর্যবেক্ষক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসরসহ আরও ১৫টি দেশ ‘সংলাপ অংশীদার’ হিসেবে যুক্ত রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সদস্যদেশগুলো বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশের বেশি এবং বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।

সম্মেলনের ফাঁকে সি ও পুতিনের বৈঠকও হওয়ার কথা। ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে প্রায় সাড়ে চার বছরে দুই নেতা প্রায় ১০ বার বৈঠক করেছেন। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার অর্থনৈতিক নির্ভরতা চীনের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ভারতীয় কূটনীতিক সিবি জর্জ জানিয়েছেন, দুই নেতা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করবেন। মধ্য এশিয়ার নেতাদের সঙ্গে বাণিজ্য ও শুল্ক নিয়েও আলোচনা করবেন মোদি।

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ভারত মধ্য এশিয়ায় পৌঁছাতে ওমান উপসাগরের চাবাহার বন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রে নতুন সমস্যায় পড়েছে। একই সময়ে রাশিয়া ভারতের প্রধান অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে।

চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ২০২০ সালের প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘর্ষের পর গত সপ্তাহে দুই দেশ সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়ে নতুন করে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে। ফলে সম্মেলনের ফাঁকে মোদি ও সির অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের সম্ভাবনাও রয়েছে।

তবে সামরিক জোট হিসেবে এসসিও-কে ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হলেও বাস্তবে সংস্থাটি এখনো শক্তিশালী সমন্বিত কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি। সদস্যরা যৌথ সামরিক মহড়া বাড়ালেও উন্নয়ন ব্যাংক, অভিন্ন অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা এবং মৌলিক অর্থনৈতিক একীকরণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অগ্রগতি সীমিত।

কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের গবেষক তেমুর উমারভের মতে, এসসিও নেতারা সম্মেলনটিকে বড় ঘটনা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করবেন, যাতে ট্রাম্প বুঝতে পারেন—বিশ্বব্যবস্থার অন্য প্রান্তেও শক্তিশালী একটি পক্ষ রয়েছে।

মস্কোর হায়ার স্কুল অব ইকোনমিকসের চীনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ভ্যাসিলি কাশিন অবশ্য মনে করেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা এতটাই বেড়েছে যে নতুন কোনো শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লড়াই করাই কঠিন। তাঁর মতে, এসসিও ও ব্রিকসকে টিকিয়ে রাখার বিষয়ে সবারই স্বার্থ রয়েছে; কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই জোটগুলোকে কোন পথে এগোতে হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত