Ajker Patrika

মধ্যপ্রাচ্যে সিআইএর আস্তানায় ইরানি হামলার নেপথ্যে কি রাশিয়া ছিল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৬, ১৬: ৪০
মধ্যপ্রাচ্যে সিআইএর আস্তানায় ইরানি হামলার নেপথ্যে কি রাশিয়া ছিল
ইরানে মার্কিন আগ্রাসনের শুরুর দিকেই সৌদি আরবে দেশটির বাসে হামলা চালায় ইরান। সেখানে সিআইএ–এর স্টেশনও ছিল। ছবি: এএফপি ছবি iran cia saudi নামে

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গতকাল বৃহস্পতিবার ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে বৈঠক করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠকের প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ।

তবে রুবিও-লাভরভ বৈঠকের চেয়েও বেশি আলোচিত ছিল সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রতিবেদনে। যেখানে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোতে ইরানের হামলায় মস্কো প্রকাশ্যে স্বীকার করার চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে।

মার্কিন সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি বা সিআইএ-এর স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ইরানের হামলার খবর প্রথম প্রকাশ পায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের শুরুর দিকেই। যুদ্ধ শুরুর তিন দিন পর, ৩ মার্চ ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসে অবস্থিত সিআইএ স্টেশনকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল। এরপর ৬ মার্চ সিএনএন মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে জানায়, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সেনা সদস্য ও সামরিক বিমানগুলোর অবস্থান শনাক্ত করতে তেহরানকে সহায়তা করছিল মস্কো।

আরও সাম্প্রতিক সময়ে, গত বুধবার রয়টার্স জানায়—বিশেষ করে সৌদি আরবে মার্কিন দূতাবাসে অবস্থিত সিআইএ স্থাপনায় ইরানি ড্রোন হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সম্ভাব্য রুশ সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলাগুলোর কার্যকারিতা ও নিখুঁত লক্ষ্যভেদের সক্ষমতা রাশিয়ার সহায়তার সম্ভাব্য প্রমাণের ইঙ্গিত দিতে পারে।

প্যারিসের সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অব ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চের সহকারী অধ্যাপক নিকোল গ্রায়েভস্কি বলেন, ইরানের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে রাশিয়ার সম্পৃক্ততার তত্ত্বটি ‘বাস্তবসম্মত।’ আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘এটাই অনেকের সন্দেহ ছিল, কারণ ইরান যেসব হামলা চালিয়েছে, সেগুলো তাদের আগের হামলাগুলোর তুলনায় অনেক বেশি উন্নত ছিল।’

তিনি বলেন, ‘রাশিয়ার মতো মহাকাশভিত্তিক সক্ষমতা ইরানের নেই। রাশিয়ার তুলনায় সামরিক মানের পর্যাপ্ত উপগ্রহও তাদের নেই, এমনকি মৌলিক কাজের জন্যও। তাই মনে হয়, এ বিষয়ে তারা রাশিয়ার সঙ্গে কোনো না কোনো ধরনের সমঝোতায় পৌঁছেছিল।’ তবে তিনি যোগ করেন, লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন করার ক্ষেত্রে ইরানের নিজস্ব মানব গোয়েন্দা (হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স) নেটওয়ার্কও রয়েছে, যেগুলোকে এ অঞ্চলের লক্ষ্য নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই অবমূল্যায়ন করা হয়।

ইরানের প্রতি রাশিয়ার সমর্থন

যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যে মস্কো ও তেহরান তাদের সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর করেছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, দুই দেশের সম্পর্ক প্রকৃত অর্থে জোট নয়; বরং পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে স্বার্থভিত্তিক একটি সুবিধাজনক অংশীদারিত্ব। তবে গ্রায়েভস্কি এ মূল্যায়নের সঙ্গে একমত নন।

তিনি বলেন, ‘দুই পক্ষই নিজেদেরকে এমন রাষ্ট্র হিসেবে দেখে, যারা বৈশ্বিক অঙ্গনে প্রায় একই ধরনের হুমকির মুখোমুখি। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তাদের সহযোগিতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে, আর সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও জোরদার হয়েছে। এখন তারা একে অপরের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।’

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর দুই দেশের সামরিক ঘনিষ্ঠতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। সে সময় তেহরান মস্কোকে যুদ্ধ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র সরবরাহ করে, যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল শাহেদ ড্রোন এবং ফাতেহ-১১০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। গত বছর দুই দেশ ২০ বছরের জন্য একটি সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি (Comprehensive Strategic Partnership Treaty) স্বাক্ষর করে, যেখানে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

তবে মস্কো টাইমস জানায়, সে সময় রুশ উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই রুদেঙ্কো রুশ পার্লামেন্ট স্টেট ডুমায় দেওয়া বক্তব্যে বলেন, এই চুক্তির অর্থ ‘ইরানের সঙ্গে সামরিক জোট গঠন বা পারস্পরিক সামরিক সহায়তার বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি’ নয়।

এ ছাড়া, অভিযোগ রয়েছে—রাশিয়া তাদের কোমেতা-এম (Kometa-M) অ্যান্টি-জ্যামিং নেভিগেশন সিস্টেম সরবরাহ করে ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোনগুলোর লক্ষ্যভেদের নির্ভুলতা বাড়াতে সহায়তা করেছে। মার্চে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, সাইপ্রাসে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (আরএএফ) ঘাঁটিতে ইরানের ব্যর্থ হামলার পর উদ্ধার হওয়া শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের ধ্বংসাবশেষে রাশিয়ার ওই কোমেতা-এম সিস্টেম পাওয়া যায়।

তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে ওই প্রতিবেদন—যেখানে ইরানি ড্রোনে কোমেতা-এম ব্যবহারের কথা বলা হয়েছিল—‘ভুয়া’ বলে উড়িয়ে দেয় রাশিয়া। গ্রায়েভস্কি বলেন, তারপরও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ কিছুটা হলেও মস্কোর জন্য লাভজনক। কারণ, এর ফলে আন্তর্জাতিক মনোযোগ ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে সরে যায় এবং একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব দুর্বল করার সম্ভাবনাও তৈরি করে।

তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, রাশিয়া এটিকে বৈশ্বিক ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে বৃহত্তর সংঘাতের অংশ হিসেবে দেখে। তাদের ধারণা, এই ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ক্ষয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই তারা চায় না ইরান পরাজিত হোক। তাই সব সময়ই একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানকে লড়াই চালিয়ে যেতে দেওয়া, অন্যদিকে নিশ্চিত করা যে ইরান টিকে থাকার এবং নিজেদের ইতিহাসের এই অত্যন্ত কঠিন সময় অতিক্রম করার মতো পর্যাপ্ত সমর্থন পায়।’

সাম্প্রতিক হামলা

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা আরও জোরদার করেছে। টানা ১২ তম রাতের মতো যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে ইরাক সীমান্তবর্তী শালামচেহ ক্রসিংয়ে এক হামলায় অন্তত দুইজন নিহত হয়। অন্যদিকে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান উপসাগরীয় একাধিক দেশ এবং জর্ডানে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

সবশেষে গ্রায়েভস্কির মতে, যুদ্ধের গতিপথে রাশিয়ার গোয়েন্দা সহায়তার চেয়ে ইরানের নিজস্ব সামরিক কৌশলই বেশি প্রভাব ফেলছে। তিনি বলেন, ‘রাশিয়ার সম্পৃক্ততাই ইরানের জন্য মূল মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়। ইরানের এসব সক্ষমতা আগেই ছিল। তারা ইতোমধ্যেই শক্তিশালী ড্রোন বাহিনী এবং বিস্তৃত ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা গড়ে তুলেছে।’ তার ভাষায়, ‘রাশিয়া যা করেছে, তা হলো ইরানকে সামান্য বাড়তি সুবিধা দিয়েছে এবং তাদের সক্ষমতাকে আরও উন্নত করেছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত