কেন ইথিওপিয়ায় যুদ্ধবিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পাঠাচ্ছে রাশিয়া

ইথিওপিয়ায় ১২টি সু-৩৫ যুদ্ধবিমান সরবরাহ করেছে রাশিয়া। পাশাপাশি দেশটিকে চারটি এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে মস্কোর। বিশ্লেষকদের মতে, এ চুক্তির মাধ্যমে হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব আরও বাড়াতে চায় রাশিয়া। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং প্রতিবেশী ইরিত্রিয়ার সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে সামরিক সক্ষমতা জোরদার করতে চাইছে ইথিওপিয়া।
দুই দিনের রাশিয়া-আফ্রিকা সম্মেলনে মস্কো সফরকালে এ চুক্তির কথা জানান ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে রাশিয়া ও ইথিওপিয়া একসঙ্গে কাজ করছে। দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রতিও গুরুত্ব দেন তিনি।
রাশিয়ার আগ্রহ কেন
ইথিওপিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার সামরিক সম্পর্ক কয়েক দশকের পুরোনো। স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ইথিওপিয়ার সাবেক কমিউনিস্ট সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল। সেই সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় দুই দেশ এখন সামরিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করছে।
অস্ত্র বিক্রি রাশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক স্বার্থও বটে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে অস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে আয় বাড়ানোর পাশাপাশি ক্রেতা দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে মস্কো। কারণ, অস্ত্র কেনার পর প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও খুচরা যন্ত্রাংশের জন্যও সরবরাহকারী দেশের ওপর নির্ভর করতে হয়।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বাইরেও পারমাণবিক জ্বালানি, স্বাস্থ্য, বাণিজ্য, কৃষি, শিল্প ও শিক্ষাক্ষেত্রে সম্পর্ক সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পুতিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ১৩০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।
পশ্চিমা দেশগুলো থেকে কি দূরে সরে যাচ্ছে ইথিওপিয়া
বিশ্লেষকদের মতে, ইথিওপিয়া পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন না করে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে। আফ্রিকার দ্বিতীয় সর্বাধিক জনবহুল দেশ হওয়ায় ইথিওপিয়া আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ বাজার।
চীনের বড় ধরনের উপস্থিতির পাশাপাশি দেশটিতে পশ্চিমা বিনিয়োগও রয়েছে। এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রাশিয়া আফ্রিকায় নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আফ্রিকার প্রধান অস্ত্র আমদানির ১৫ শতাংশ এসেছে রাশিয়া থেকে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ১৯ শতাংশ এবং চীনের ১৭ শতাংশ।
কোথায় ব্যবহার হতে পারে এই অস্ত্র
ইথিওপিয়ায় নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার মধ্যেই যুদ্ধবিমান সরবরাহের বিষয়টি সামনে এসেছে। টাইগ্রে অঞ্চলে সরকারি বাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে লড়াই, আমহারা অঞ্চলে আরেকটি বিদ্রোহ এবং ইরিত্রিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের আশঙ্কা দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
২০২২ সালের নভেম্বরে স্বাক্ষরিত প্রিটোরিয়া শান্তিচুক্তির মাধ্যমে দুই বছরব্যাপী ভয়াবহ যুদ্ধের অবসান ঘটেছিল। কিন্তু গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ায় সেই চুক্তি কার্যত ভেঙে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
আবি আহমেদ সরকার উৎখাত করে অন্তর্বর্তী প্রশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাতটি গোষ্ঠীর একটি জোট গঠনের পর উত্তেজনা আরও বেড়েছে। অক্টোবরে টাইগ্রের রাজধানী মেকেলে শহরে সরকারি ও মিত্র বাহিনী প্রবেশ করে। পরে সেখানে ছয় মাসের জন্য অন্তর্বর্তী প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করে আদ্দিস আবাবা। তবে বিদ্রোহী নেতারা লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইথিওপিয়া আগে থেকেই যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা চালিয়ে আসছিল। তাই সাম্প্রতিক সংঘাতই যে অস্ত্র কেনার একমাত্র কারণ, তা বলা যায় না। তবে নতুন যুদ্ধবিমান দেশটির সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রুশ যুদ্ধবিমানগুলো ইথিওপিয়ার বিদ্যমান বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বাড়াবে। অন্যদিকে, এস-৪০০ ব্যবস্থার মাধ্যমে শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমান ও অন্যান্য আকাশপথের হুমকি মোকাবিলা সহজ হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সিবিলিনের মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক বেনেডিক্ট মানজিন বলেন, প্রচলিত আকাশপথের হুমকি মোকাবিলায় এসব ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। ইরিত্রিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বাঁধলে দেশটির সীমিত বিমানবাহিনী ও ড্রোন মোকাবিলায় এগুলো ব্যবহার করা সম্ভব।
তবে ছোট ও কম খরচের ড্রোনের ব্যাপক আক্রমণে প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বিপাকে পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।









