
বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে দীর্ঘ তিন দশক পর আবারও একটি সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী ও সংহত বিরোধী দল পেতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী, ৩০০ আসনের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট প্রায় ৭৭টি আসন লাভ করেছে। এ ছাড়া মোট ভোটের হারও উল্লেখযোগ্য- বিএনপি পেয়েছে প্রায় ৫৪ শতাংশ, আর জামায়াত জোট পেয়েছে ৪০ শতাংশ। এটি ১৯৯৬ সালের জুন নির্বাচনের পর বাংলাদেশের সংসদে বৃহত্তম বিরোধী ব্লক হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। সংসদীয় ভারসাম্য রক্ষায় এটি এক নতুন মাইলফলক হতে পারে।
সংখ্যাতাত্ত্বিক গুরুত্ব
সংসদীয় রাজনীতিতে সংখ্যার গুরুত্ব অপরিসীম। ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে বিএনপি ১১৬টি আসন নিয়ে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও কার্যকর বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা রেখেছিল। এরপর ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ৫৮টি আসনে জয়ী হয়ে বিরোধী দলে বসে। তবে পরবর্তী দেড় দশকে সংসদের বিরোধী ব্লকের চিত্রটি নাটকীয়ভাবে ম্লান হতে থাকে।
২০০৯ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের আসনসংখ্যা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৩০-এ। ২০১৪ সালে প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মুখে জাতীয় পার্টি ৬৬টি আসন নিয়ে ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে সমালোচিত হয়। ২০১৮ সালে বিরোধী দলের অস্তিত্ব সংকুচিত হয়ে নেমে আসে মাত্র ৭টি আসনে। ২০২৪ সালের নির্বাচনেও কোনো শক্তিশালী বিরোধী দল ছিল না। সেই দীর্ঘ খরা কাটিয়ে ৭৭ আসনের এই নতুন জোট বাংলাদেশের দ্বিদলীয় রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে একটি শক্তিশালী ‘তৃতীয় পক্ষ’ হিসেবে সংসদীয় রাজনীতিতে এক নতুন গতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে বলে আশা করা যায়।
ছায়া সরকার: জবাবদিহির নতুন মডেল
সংসদীয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত যুক্তরাজ্যে ‘অফিশিয়াল অপজিশন’ বা ছায়া সরকার (ছায়া মন্ত্রিসভা) গঠনের যে ঐতিহ্য রয়েছে, তা বাংলাদেশেও প্রয়োগের দাবি উঠেছে। ৭৭টি আসন একটি সুসংগঠিত ছায়া সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট বড় সংখ্যা। এরই মধ্যে এনসিপি নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, তাঁরা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জোট যদি স্বরাষ্ট্র, অর্থ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পররাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর বিপরীতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ এমপিদের নিয়ে ‘ছায়া পোর্টফোলিও’ গঠন করে, তবে তা সংসদীয় বিতর্ককে স্রেফ স্লোগান ও প্রতিবাদের ঊর্ধ্বে নিয়ে যাবে। এর ফলে:
তাত্ত্বিক বিতর্ক: প্রতিটি সরকারি নীতির বিপরীতে বিরোধী দল একটি বিকল্প নীতি প্রস্তাব করতে পারবে।
জবাবদিহি: ছায়া অর্থমন্ত্রী যেমন বাজেটের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করবেন, তেমনি ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির গঠনমূলক সমালোচনা করবেন।
বিকল্প নেতৃত্ব: এটি ভোটারদের কাছে এই জোটকে স্রেফ একটি প্রতিবাদী পক্ষ নয়, বরং একটি ‘পরবর্তী সরকার গঠনের অপেক্ষায় থাকা দল’ (Government in waiting) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।
দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ও উচ্চকক্ষ সংস্কারের প্রস্তাব
বিপুল ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়যুক্ত হওয়ায় নতুন সরকার যদি তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট আইনসভার পরিকল্পনা কার্যকর করে, তবে বিরোধী দলের জন্য উচ্চকক্ষে দলনিরপেক্ষ ও বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেওয়ার একটি বড় সুযোগ তৈরি হবে। যুক্তরাজ্যের ‘হাউস অব লর্ডস’-এর মতো বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ, আইনবিদ ও সিভিল সোসাইটি লিডারদের উচ্চকক্ষে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে সংসদীয় পর্যালোচনাকে আরও সমৃদ্ধ করা সম্ভব।
এই স্বাধীন ক্রসবেঞ্চার বা দলনিরপেক্ষ সদস্যদের উপস্থিতি আইন প্রণয়নে দলীয় সংকীর্ণতা কমিয়ে আনবে। এটি কেবল আইনি ত্রুটি সংশোধন করবে না, বরং নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ওপর একটি নৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে।
প্রতিবাদ নয়, দায়িত্বশীলতা ও সংসদীয় সংস্কৃতি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরোধী দলের ভূমিকা অনেক সময় সংসদ বর্জন, ওয়াকআউট ও রাজপথের আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে। তবে ৭৭ জন সদস্য নিয়ে জামায়াত নেতৃত্বাধীন এই জোটের সামনে এখন নিজেকে প্রমাণের সুযোগ। যদিও তাঁরা সরকারি দলের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ঠেকাতে পারবে না, তবে তারা প্রতিটি বিল ও নীতিকে কঠোরভাবে যাচাই করতে পারবে।
জামায়াতের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে বলা হয়েছে, নির্বাচনে ভোট গণনা নিয়ে কিছু অভিযোগ থাকলেও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা ও শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবেন তাঁরা। সংসদে গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল অবস্থান নিয়ে সরকারকে জবাবদিহির মুখে রাখা এবং একই সঙ্গে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে ইতিবাচক অবদান রাখাই হবে তাঁদের আগামী দিনের প্রধান লক্ষ্য।
প্রকৃতপক্ষে, এই জোটের জন্য এটি স্রেফ সংসদীয় উপস্থিতি নয়, বরং সরকার পরিচালনার একটি ‘মহড়া’ (রিহার্সাল)। তাঁরা যদি রাজপথের উত্তাপের চেয়ে সংসদের বিতর্কে বেশি মনোযোগ দেন, তবে তা দেশের দীর্ঘদিনের ‘কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি’ বনাম ‘শূন্যতা’র যে চক্র, তা থেকে উত্তরণে সাহায্য করবে। সংসদকে স্রেফ রাবার স্ট্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি কার্যকর আলোচনার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ঐতিহাসিক দায়িত্ব এখন এই শক্তিশালী বিরোধী জোটের কাঁধে।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিশাল জয় পেয়েছে। এই নির্বাচন শুধু বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, এই অঞ্চলের অর্থাৎ ভারত, পাকিস্তান ও চীনকে ঘিরে যে আঞ্চলিক শক্তির বলয় রয়েছে, সেই বলয়ের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
১৬ ঘণ্টা আগে
লন্ডনের একটি উপশহরে ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে কিছু দিন আগে দেশে ফিরেছেন তারেক রহমান। নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিকে। রাজধানী ঢাকার একটি অভিজাত এলাকায় ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি ভোট দেন। ২০০৮ সালের পর এটিই ছিল বাংলাদেশের প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন।
১ দিন আগে
দিন শেষে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোনো বিপ্লব ছিল না। এটি ছিল এক ধরনের হিসাব-নিকাশের দিন। ভোট গণনা শেষে দেখা গেল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি স্পষ্ট ব্যবধানে জয় পেয়েছে। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের পর রাজনৈতিক নির্বাসন থেকে তারা আবার ক্ষমতায় ফিরেছে।
১ দিন আগে
তারেক রহমানের নেতৃত্বে মধ্য-ডানপন্থী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয় পেয়েছে। তারা জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে প্রতিদ্বন্দ্বী জোটকে বড় ব্যবধানে হারিয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটিই ছিল...
১ দিন আগে