
দিন শেষে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোনো বিপ্লব ছিল না। এটি ছিল এক ধরনের হিসাব-নিকাশের দিন। ভোট গণনা শেষে দেখা গেল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি স্পষ্ট ব্যবধানে জয় পেয়েছে। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের পর রাজনৈতিক নির্বাসন থেকে তারা আবার ক্ষমতায় ফিরেছে।
অধিকাংশ শিরোনাম বিএনপির এই জয়কে নাটকীয় প্রত্যাবর্তন বলেছে। তা ভুলও নয়। তবে ভেতরের গল্পটি ভিন্ন। এই নির্বাচন জনতার ঢেউ নয়, ছিল অসন্তোষের স্রোত আর ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট (এফপিটিপি) পদ্ধতির অঙ্কের ফল।
বিএনপির জয়ের কারণ বুঝতে হলে আগে একটি সহজ ব্যাখ্যা বাদ দিতে হবে যে—এই নির্বাচন জামায়াতের মুহূর্ত ছিল, কিন্তু তারা তা নষ্ট করেছে। ফল ঘোষণার পর দেখা যায়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন পেয়েছে। জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে মোট ৭৭টি আসন। ১৯৯১ সালে জামায়াতের সর্বোচ্চ ছিল ১৮টি আসন। সেই তুলনায় এটি বড় সাফল্য। অনেক বিশ্লেষক আগেই বলেছিলেন, নির্বাচনের আগে জামায়াতের সমর্থন বেড়েছে। ফলাফল সেই দাবিকে প্রমাণ করেছে। কিন্তু এফপিটিপি পদ্ধতিতে ভোটের হার বাড়লেই ৩০০ নির্বাচিত আসনের মধ্যে ১৫১টি পাওয়া যায় না।
এই নির্বাচন কোনো মহাবিপ্লবের ফল ছিল না। তবে এর পেছনে ছিল ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার স্বৈরশাসন পতনের গণ-অভ্যুত্থান। কিন্তু এতে ভোটারদের মধ্যে গভীর মতাদর্শিক ভাঙন হয়নি। ভোটার আনুগত্যের স্থায়ী পুনর্বিন্যাসও ঘটেনি। দেশের নির্বাচনী মানসিকতা ভেঙে যায়নি। এটি জাতীয় ঢেউয়ের নির্বাচনও ছিল না। এমন নির্বাচন যেখানে শ্রেণি, লিঙ্গ ও অঞ্চল পেরিয়ে এক ধরনের মানসিকতা একটি দলের দিকে ঝুঁকে পড়ে। যা ঘটেছে, তা ছিল এক ধরনের মিশ্র বাস্তবতা। মোটের ওপর স্বাভাবিক নির্বাচন। কিছু ব্যতিক্রম ছিল। কিন্তু ফল ছিল অনুমানযোগ্য।
দলীয় কর্মী-সমর্থকদের অনেকেই ভোটকেন্দ্রে যাননি। দোদুল্যমান (সুইং) ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। দেশের কিছু এলাকায় বিএনপির স্থানীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়। সেখানে সাময়িকভাবে ভোট সরে যায়। অনেক ক্ষেত্রে তা যায় জামায়াত বা এনসিপির দিকে। ক্ষোভ ছিল বাস্তব। ৫ আগস্টের পর বিএনপির তৃণমূল সংগঠন খুব খারাপ পারফরম্যান্স করে। জেলায় জেলায় ছোট ছোট নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। গ্রামীণ বাজার ও শহরতলিতে ক্ষোভ জমতে থাকে।
ভোটাররা শুধু হতাশ ছিলেন না। চায়ের দোকান আর ইউনিয়ন পরিষদের আড্ডায় যে ভাষা শোনা গেছে, তা ছিল আরও কঠোর। এই রাগই জামায়াতের উত্থান ব্যাখ্যা করে। বিএনপির কিছু সমর্থক ও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দোদুল্যমান ভোটার “সৎ বিকল্প”-এর আশায় জামায়াতের দিকে ঝুঁকেছিলেন। কিন্তু সাময়িক সরে যাওয়া মানেই স্থায়ী ভাগ্য নির্ধারণ নয়।
বিএনপির সংগঠন ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতের চেয়ে বড় ও গভীর। কিছু ভোট সরে গেলেও তাদের ভিত্তি ভেঙে পড়েনি। সংখ্যায় তারা বড়ই ছিল। প্রার্থী মনোনয়নে বিএনপি অপ্রত্যাশিতভাবে কৌশলী ছিল। জামায়াত যেখানে তুলনামূলক অচেনা কিন্তু মতাদর্শে বিশ্বস্ত প্রার্থী দিয়েছে, সেখানে বিএনপি ভরসা করেছে পুরোনো মুখের ওপর। এমন প্রার্থী, যাদের পরিচিতি আছে, যাদের অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক শক্ত।
বিশেষ করে গ্রামে এটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শহরের শিক্ষিত ভোটাররা নৈতিক শাসনের কথায় অনুপ্রাণিত হতে পারেন। তাদের কাছে সৎ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রার্থী মানে এক ধরনের নৈতিক পুনরারম্ভ। কিন্তু গ্রামের ভোটাররা বাস্তববাদী। তারা পৃষ্ঠপোষকতার জালে চলেন। একজন সংসদ সদস্য তাদের কাছে বিমূর্ত ধারণা নয়। তিনি নিরাপত্তা, চাকরি, স্থিতি ও বিরোধ মীমাংসার মধ্যস্থতাকারী। শুধু সততা থাকলেই চলবে না। পরিচিতিও দরকার।
এভাবেই ভোটারের দ্বিধা তৈরি হয়। বিএনপির বাড়াবাড়িতে ক্ষুব্ধ অনেকেই পরিবর্তন ভেবেছিলেন। যেখানে জামায়াত পরিচিত নেতা দিয়েছে, সেখানে কিছু ভোট গেছে। কিন্তু অন্য জায়গায় ভোটাররা এমন প্রার্থী পেয়েছেন, যাদের তারা চিনতেন না। যাদের সততা যাচাই করা যায়নি। দলও নৈতিক স্লোগান ছাড়া বেশি কিছু দেয়নি।
অনিশ্চয়তায় তারা পরিচিতকেই বেছে নিয়েছেন। জামায়াত নিজের সীমাবদ্ধতা আরও বাড়িয়েছে কিছু কৌশলগত ভুলে। নারীর অধিকার নিয়ে তাদের অবস্থান ছিল দ্ব্যর্থক। কখনো আশ্বাস, কখনো ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা। এতে বড় অংশের নারী ভোটার আশ্বস্ত হননি। অথচ দীর্ঘ সময় ধরে নারীরা সমাজে বড় ভূমিকা তৈরি করেছেন।
বাংলাদেশের সামাজিক পরিবর্তন কেবল বাহ্যিক নয়। শ্রমবাজার, শিক্ষা ও ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থায় নারীরা কেন্দ্রে আছেন। যে দল লিঙ্গসমতার বিশ্বাসযোগ্য রূপরেখা দিতে পারে না, সে জাতীয় ঢেউ তুলতে পারে না। আরও ক্ষতিকর ছিল ১৯৭১ নিয়ে জামায়াতের পুনর্ব্যাখ্যার চেষ্টা। মুক্তিযুদ্ধ দেশের নৈতিক ভিত্তি। জামায়াতের ঐতিহাসিক ভূমিকা নরম করার বা নতুনভাবে দেখানোর প্রচেষ্টা শুধু সেক্যুলার-উদারপন্থীদের নয়, আরও বিস্তৃত অংশকে দূরে ঠেলে দিয়েছে।
রক্ষণশীল পরিবারগুলোর কাছেও ১৯৭১ এক লাল দাগ। জনমনে একটি স্পষ্ট ধারণা ছিল—ক্ষমা করা যেতে পারে, কিন্তু ভুলে যাওয়া যায় না। তবু জামায়াতের ফল ঐতিহাসিক। জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। এটি তাদের সংগঠিত কর্মীবাহিনীর প্রমাণ। একই সঙ্গে বিএনপির ভুলেরও ফল। চাঁদাবাজি ও স্থানীয় ঔদ্ধত্য ভোটারদের জামায়াতের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার এফপিটিপি ব্যবস্থায় কয়েক শতাংশ ভোট এদিক-ওদিক হলেই ডজনখানেক আসন বদলে যায়। রাজশাহী, খুলনা ও রংপুর বিভাগে জামায়াত সেই ক্ষোভ কাজে লাগিয়েছে। এসব এলাকায় তাদের সংগঠন শক্তিশালী। কিন্তু নির্ভুলতা আর ব্যাপকতা এক নয়। জামায়াতের উত্থান অঞ্চলভিত্তিক ছিল। শ্রেণি, লিঙ্গ, শিক্ষা ও বয়সভেদে সমর্থনে বড় পার্থক্য ছিল। এটি ঢেউয়ের নির্বাচন নয়। সমগ্র দেশে একরকম গতি না থাকলে এফপিটিপিতে জয় সহজ নয়।
এবার ছিল আরেকটি ছায়া—আওয়ামী লীগ। অনেক মন্তব্যে তাদের অবশিষ্ট ভোট কম করে দেখা হয়েছিল। জরিপ বলেছিল, ৫ থেকে ৭ শতাংশ কট্টর সমর্থক কখনো সরে যাবে না। কিন্তু এর বাইরে ২০ থেকে ২৫ শতাংশের একটি বড় অংশ ছিল, যারা অনিশ্চিত বা পছন্দ প্রকাশে অনাগ্রহী। এই অংশটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
নির্বাচনের আগে মাঠ গবেষণা ও একাধিক জরিপে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের কট্টর নয়, এমন ভোটারদের অনেকেই বিএনপির দিকে যাচ্ছেন। মতাদর্শের মিল থেকে নয়। বাস্তব সুবিধার হিসাব থেকে। তারা ধরে নিয়েছিলেন, বিএনপি সরকার গঠন করবে। তাই জয়ী দলের সংসদ সদস্যের মাধ্যমে সেবা পেতে চান। যেখানে বিএনপির পুরোনো নেতারা আওয়ামী সমর্থকদের হয়রানি করেছেন, সেখানে কেউ কেউ ভোট দেননি বা জামায়াতের দিকে তাকিয়েছেন। কিন্তু জাতীয়ভাবে ভারসাম্য গেছে বিএনপির দিকে। ভোটাররা বিজয়ীর পাশে থাকতে চেয়েছেন। ধারণাই বাস্তবতা তৈরি করেছে।
ভোটের আগে চারটি সম্ভাব্য চিত্র স্পষ্ট ছিল। আওয়ামী লীগের বড় উপস্থিতি না থাকলে বিএনপি অল্প ব্যবধানে এগোবে। মাঝারি সমর্থন পেলে আরামদায়ক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। প্রবল সমর্থন পেলে দুই-তৃতীয়াংশও সম্ভব ছিল। কেবল সর্বস্তরের জামায়াত-ঢেউ এ সমীকরণ বদলাতে পারত।
সে ঢেউ আসেনি। বিএনপির জয় তাই কাঠামোগত সুবিধা, কৌশলী প্রার্থী নির্বাচন ও ভোটারদের বাস্তব হিসাবের ফল। নারীর অধিকার ও ১৯৭১ নিয়ে জামায়াতের ভুল এতে সহায়ক হয়েছে। আবার বিএনপির স্থানীয় দুর্নীতিও পরোক্ষভাবে জামায়াতের ভোট বাড়িয়েছে। তবে এফপিটিপির অঙ্ক তা পেরোতে দেয়নি।
এই নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি বা এনসিপির উত্থান। তারা পেয়েছে ৫টি আসন। একটি নতুন দল হিসেবে, তীব্র মেরুকৃত রাজনৈতিক পরিবেশে এটি ছোট সাফল্য নয়। এটি দেখায়, বিএনপি ও জামায়াতের নতুন দ্বিমেরুর বাইরে বিকল্পের চাহিদা আছে। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে এমন দল বাড়তে পারত। কিন্তু এফপিটিপিতে ৫টি আসন একই সঙ্গে সাফল্য ও সীমা।
শেষ পর্যন্ত ১৩তম সংসদ নির্বাচন ছিল সীমার গল্প। রাগের সীমা। নৈতিক ব্র্যান্ডিংয়ের সীমা। ইতিহাস পুনর্ব্যাখ্যার সীমা। আর বিজয়ী সবকিছু পেয়ে যায়—এমন ব্যবস্থায় সংগঠনের গভীর শক্তির গল্প। তাই বিএনপি জিতেছে দেশকে অনুপ্রাণিত করে নয়। দেশকে বুঝে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে মধ্য-ডানপন্থী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয় পেয়েছে। তারা জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে প্রতিদ্বন্দ্বী জোটকে বড় ব্যবধানে হারিয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটিই ছিল...
৩ ঘণ্টা আগে
রাজপথে অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া এই দলের প্রার্থীরা ৩০০ আসনের মধ্যে মাত্র ছয়টিতে জয়ী হতে পেরেছেন। অন্যদিকে, ২১২টি আসনে জয়লাভ করে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি।
১৯ ঘণ্টা আগে
১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর গত বছরের বড়দিনে স্বদেশে ফিরেছেন তারেক রহমান। আর মাত্র সাত সপ্তাহের মধ্যেই তিনি বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। তাঁর এই উত্থান বাংলাদেশ, দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্বরাজনীতিতে কীরূপ প্রভাব ফেলবে?
২১ ঘণ্টা আগে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক গণভোটের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। এই দ্বিমুখী রায়ে একদিকে যেমন সংসদের ক্ষমতার বিন্যাস নির্ধারিত হয়েছে, অন্যদিকে দেশের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র ও সাংবিধানিক সংস্কারের প্রশ্নে জনমত স্পষ্ট হয়েছে।
১ দিন আগে