Ajker Patrika

ট্রাম্পের আমেরিকা কি ইরাকের শিক্ষা ভুলে গেছে

শোল্টো-বাইয়ার্নস
ট্রাম্পের আমেরিকা কি ইরাকের শিক্ষা ভুলে গেছে
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাকে সমর্থন করে প্যারিসে একটি মিছিল। ছবি: এএফপি

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে শুরু হওয়া যুদ্ধ গোটা অঞ্চলকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে যা এই অঞ্চলের অধিকাংশ দেশই চায়নি। তবে ব্যতিক্রম শুধু ইসরায়েল।

যুদ্ধের প্রভাব ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। সাইপ্রাসে নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে, ফ্রান্স অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীকে উচ্চ সতর্কতায় রেখেছে, আর যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা সচিব জন হিলি বলেছেন—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী অভিযানের সঙ্গে যুক্ত দেশগুলোতে সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকি নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

এই যুদ্ধের শেষ লক্ষ্য কী—এই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে উঠেছে। প্রকাশ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের জনগণকে ‘ভয়ের শাসনব্যবস্থা’ উৎখাত করার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে কিছু বিশ্লেষকের মতে, ইসরায়েল হয়তো ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোকেই ভেঙে দিতে চাইছে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আসলে কী চান। তিনি কখনো বলেন, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপই আদর্শ উদাহরণ, যেখানে প্রশাসনের বেশির ভাগ কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখেই ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে। আবার অন্যদিকে তিনি ইরানের জনগণকে নিজেদের সরকার দখল করার আহ্বানও জানিয়েছেন—যা সরাসরি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ডাক।

বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার উদাহরণ ইরানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সেখানে যদি নতুন কোনো সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিতও হন, তবুও ব্যাপক বোমা হামলা, বহু শীর্ষ কর্মকর্তার মৃত্যু এবং অসংখ্য বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির পর ইরানের রাজনৈতিক বাস্তবতা আর আগের মতো থাকবে না। এমন পরিস্থিতিতে যে কোনো নেতা যদি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পরাজয় স্বীকার করেন, তবে তাঁকে দেশের ভেতরেই বৈধতা সংকটে পড়তে হতে পারে।

এ ছাড়া ইরানের শক্তিশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দেশের অর্থনীতির প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে বলে ধারণা করা হয়। এই প্রতিষ্ঠান অক্ষত থাকলে শাসনব্যবস্থা বদলানো বাস্তবে কতটা সম্ভব—সেটিও বড় প্রশ্ন।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি বলেছেন, তিনি আশা করেন ইরানের জনগণ নিজেরাই সরকার উৎখাত করবে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে এমন কোনো সংগঠিত ও শক্তিশালী বিরোধী শক্তি নেই যারা এই কাজ করতে সক্ষম।

অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাজনীতিক ইরানের যেকোনো বিরোধী গোষ্ঠীকেই ‘ভালো পক্ষ’ হিসেবে দেখেছেন। যেমন সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন দীর্ঘদিন ধরে মুজাহিদিন-ই-খালক গোষ্ঠীকে সমর্থন করেছেন। অথচ ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ইরাকের পক্ষে থাকার কারণে এই সংগঠনটি ইরানের ভেতরে খুবই অজনপ্রিয়।

এখন কেউ কেউ শেষ শাহর পুত্র রেজা পাহলভির দিকে তাকিয়ে আছেন। তবে ইরানের জনগণের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা কতটা—তা স্পষ্ট নয়। উপরন্তু তিনি ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ হিসেবেও পরিচিত, যা ইরানে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দিতে পারে।

ইতিহাস বলছে, বিদেশি শক্তির সহায়তায় শাসনব্যবস্থা বদলানোর চেষ্টা প্রায়ই বিপর্যয় ডেকে আনে। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর ‘ডি-বাথিফিকেশন’ বা বাথ পার্টির প্রভাব ও সদস্যদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে দেওয়ার নীতি দেশটিতে গভীর রাজনৈতিক শূন্যতা ও দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করেছিল।

২০২০ সালে ওয়াশিংটনের ক্যাটো ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় বলা হয়, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রচেষ্টা প্রায়ই গৃহযুদ্ধ সৃষ্টি করে, গণতন্ত্র দুর্বল করে এবং দীর্ঘমেয়াদি দমন-পীড়ন বাড়িয়ে দেয়। এমনকি শেষ পর্যন্ত বিদেশি শক্তিকেই দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দায়িত্ব নিতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নিজের ইতিহাসেও ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের নজির রয়েছে। ১৯৫৩ সালে সিআইএ ও ব্রিটিশ এমআই৬-এর যৌথ পরিকল্পনায় প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল। তবে সেই পদক্ষেপই পরে শাহর স্বৈরশাসনকে শক্তিশালী করে এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পথ তৈরি করে।

বিশ্লেষকদের মতে, আজকের পরিস্থিতিতেও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—যদি ইরানের বর্তমান সরকার সত্যিই ভেঙে পড়ে, তবে এরপর কী হবে? সমালোচকদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র এখনো সেই ‘পরবর্তী পরিকল্পনা’ স্পষ্ট করেনি। অথচ বাস্তবে যা-ই ঘটুক, বিশ্ব জানবে যে এর দায় এড়ানো যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সহজ হবে না।

শোল্টো বাইয়ার্নস পূর্ব এশীয় বিষয়ে ‘দ্য ন্যাশনাল’-এ নিয়মিত কলাম লেখক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

প্রথম রিটার্নেই ২ কোটি টাকার ঘোষণা এপিএসের গাড়িচালক ভাইয়ের

মার্কিন হামলায় ইরানি জাহাজডুবিতে চাপে পড়বেন মোদি

কো-অর্ডিনেটর নিয়োগ দেবে এসিআই, নেই বয়সসীমা

খালেদা জিয়া, মাহেরীন চৌধুরীসহ এবার স্বাধীনতা পুরস্কার পাচ্ছে ১৫ ব্যক্তি ও ৫ প্রতিষ্ঠান

নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের রাজসাক্ষী সাবেক উপদেষ্টা রিজওয়ানা—দাবি জামায়াতের

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত