
ইরানে হামলার প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ঝড়ের গতিতে ১ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী তাদের ইতিহাসে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত সবচেয়ে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগায়। এমন এক প্রযুক্তি, যেটি তৈরি করা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পরও পেন্টাগনের পক্ষে সহজে ছেড়ে দেওয়া কঠিন হতে পারে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
ডেটা মাইনিং কোম্পানি প্যালান্টির নির্মিত সামরিক ব্যবস্থাটি ‘ম্যাভেন স্মার্ট সিস্টেম’, স্যাটেলাইট, নজরদারি এবং অন্যান্য গোয়েন্দা উৎস থেকে আসা বিপুল পরিমাণ ক্লাসিফায়েড বা শ্রেণিবদ্ধ তথ্য বিশ্লেষণ করে তাৎক্ষণিক লক্ষ্য নির্ধারণ ও অগ্রাধিকার ঠিক করতে সহায়তা করছে। এমনটি জানিয়েছেন সিস্টেমটির সঙ্গে পরিচিত তিন ব্যক্তি।
এই ব্যবস্থায় সংযুক্ত রয়েছে এনথ্রপিকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা টুল ‘ক্লদ’। যুদ্ধক্ষেত্রে এর ব্যবহারের শর্ত নিয়ে তীব্র দর-কষাকষির পর গত সপ্তাহে পেন্টাগন এই প্রযুক্তি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেয়। গত এক বছরে সামরিক পরিকল্পনাকারীরা দেখেছেন, ‘ক্লদ’ যখন ম্যাভেনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা এমন এক পরিণত রূপ নেয়, যা এখন সেনাবাহিনীর অধিকাংশ শাখায় দৈনন্দিন ব্যবহারে পরিণত হয়েছে, এমনটি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট দুজন।
ইরানে সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা চলাকালে ‘ক্লদ’চালিত ম্যাভেন শত শত লক্ষ্যবস্তু বাছাই করে দেয়। দুটি সূত্র জানিয়েছে, নির্ভুল ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক এবং গুরুত্ব অনুযায়ী সেগুলোকে অগ্রাধিকারভিত্তিক তালিকায় সাজানোর কাজ করে এই সিস্টেম। তাঁদের একজন জানান, ম্যাভেন ও ক্লদের যুগলবন্দী অভিযানের গতি বাড়িয়েছে, ইরানের পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা কমিয়েছে এবং কয়েক সপ্তাহব্যাপী যুদ্ধ পরিকল্পনাকে রূপ দিয়েছে তাৎক্ষণিক অভিযানে। হামলা শুরু হওয়ার পরও এআই টুলগুলো আঘাতের ফলাফল মূল্যায়ন করে।
সন্ত্রাসী চক্রান্ত ঠেকানো এবং ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে দেশটি থেকে ধরে আনার অভিযানে ক্লদ ব্যবহৃত হয়েছে। তবে বড় আকারের যুদ্ধ অভিযানে এটি ব্যবহারের ঘটনা এই প্রথম। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে এই টুল ব্যবহৃত হলেও অ্যানথ্রপিকের সিইও দারিও আমোদেই এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। ইরানে বোমাবর্ষণ শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, সরকারি সংস্থাগুলো আর অ্যানথ্রপিকের টুল ব্যবহার করতে পারবে না; ছয় মাসের মধ্যে তা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। ব্যাপক দেশীয় নজরদারি ও সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কোম্পানি ও সামরিক বাহিনীর তিক্ত বিরোধের পর এই সিদ্ধান্ত আসে।
তবে বিকল্প ব্যবস্থা চালু না হওয়া পর্যন্ত সামরিক বাহিনী এই প্রযুক্তি ব্যবহার চালিয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন দুটি সূত্র। তাঁদের একজন জানান, সামরিক কমান্ডাররা এতটা এআই ব্যবস্থারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন যে যদি আমোদেই নিজে ব্যবহার বন্ধের নির্দেশ দেন, তবু প্রযুক্তিটি ধরে রাখতে ট্রাম্প প্রশাসন সরকারি ক্ষমতা প্রয়োগ করবে, যতক্ষণ না বিকল্প আসে। তিনি বলেন, ‘তাঁর নৈতিক অবস্থান ঠিক না ভুল যা-ই হোক না কেন, (আমোদেইয়ের) সিদ্ধান্তের কারণে একজন আমেরিকানের প্রাণও আমরা ঝুঁকিতে ফেলব না।’
পেন্টাগন তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি। অ্যানথ্রপিকের মুখপাত্র এদুয়ার্দো মাইয়া সিলভা মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। প্যালান্টিরের মুখপাত্র লিসা গর্ডনও মন্তব্য করেননি। ইরান হামলায় ক্লদের ব্যবহারের খবর প্রথম প্রকাশ করে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। ইরান অভিযানে উন্নত জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের বিষয়টি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন যুদ্ধক্ষেত্রে এ ধরনের প্রযুক্তির নৈতিকতা ও ব্যবহারের গতি নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে।
সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির নির্বাহী সহসভাপতি পর স্কারে বলেন, ‘এটি লক্ষণীয় যে আমরা ইতিমধ্যে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছি, যেখানে এআই কল্পনা থেকে বাস্তব অভিযানে সরাসরি সহায়তায় চলে এসেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মূল পরিবর্তনটি হলো, এআই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে মানবগতির বদলে যন্ত্রগতিতে লক্ষ্য নির্ধারণের প্যাকেজ তৈরি করতে দিচ্ছে।’ তবে ঝুঁকিও আছে। তাঁর ভাষায়, ‘এআই ভুল করে। জীবন-মৃত্যুর প্রশ্নে জেনারেটিভ এআইয়ের ফলাফল মানুষ দিয়ে যাচাই করতেই হবে।’
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ দিকে পেন্টাগন ম্যাভেনের সঙ্গে অ্যানথ্রপিকের ক্লদ চ্যাটবট সংযুক্ত করা শুরু করে। এই সিস্টেম প্রস্তাবিত লক্ষ্যবস্তু তৈরি, রসদ সরবরাহ ট্র্যাকিং এবং মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্যের সারসংক্ষেপ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন ম্যাভেনের ব্যবহার সামরিক বাহিনীর আরও বহু শাখায় ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করে; গত মে পর্যন্ত ২০ হাজারের বেশি সামরিক সদস্য এটি ব্যবহার করছিলেন।
বর্তমানে ইরান অভিযান তদারকি করা কমান্ডাররা ম্যাভেন ব্যবহারে অভ্যস্ত। ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার পর ইসরায়েলকে সহায়তায় এই সিস্টেমের আগের সংস্করণ তারা ব্যবহার করেছিলেন—২০২৪ সালে দেওয়া এক বক্তব্যে এমনটি জানান নৌবাহিনীর রিয়ার অ্যাডমিরাল লিয়াম হাউলিন। বর্তমানে তিনি সেন্ট্রাল কমান্ডে অপারেশনের উপপরিচালক। তিনি বলেন, সিস্টেমটি ১৭৯টি ডেটা উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করত। তিনি বলেন, ‘সেন্টকম এমএসএস ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে।’ এমএসএস ম্যাভেনের সংক্ষিপ্ত রূপ।
হামলার আগে ম্যাভেনের লক্ষ্য তালিকা ইসরায়েলের সঙ্গে শেয়ার করা হয়েছিল কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নয়। তবে দুই পক্ষ মাসের পর মাস কী আঘাত হানা হবে, তা নিয়ে সহযোগিতা করেছে। অভিযানের শুরুতেই ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানায়, ‘মার্কিন সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় হাজার হাজার ঘণ্টা কাজ করে যতটা সম্ভব মূল্যবান ও বিস্তৃত লক্ষ্যভান্ডার তৈরি করা হয়েছে।’
শ্রেণিবদ্ধ তথ্য নিয়ে কাজ করা প্রথম বড় এআই কোম্পানি ছিল অ্যানথ্রপিক। যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতি আধুনিকায়নে প্রযুক্তিটি কাজে লাগাতে পেন্টাগন সচেষ্ট। গত সপ্তাহে আমোদেই বলেন, প্রতিরক্ষা দপ্তর ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থায় ক্লদ ‘ব্যাপকভাবে মোতায়েন’ রয়েছে এবং গোয়েন্দা বিশ্লেষণ ও অভিযান পরিকল্পনায় এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। পেন্টাগনের সঙ্গে আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হলে এক ব্লগ পোস্টে তিনি লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য গণতন্ত্রকে রক্ষায় এবং স্বৈরশাসক প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে এআই ব্যবহারের অস্তিত্বগত গুরুত্বে আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি।’
প্রযুক্তিটি দ্রুত গ্রহণ করা হয়েছে। গত বছর প্যালান্টিরের সঙ্গে চুক্তি করা ন্যাটো সাম্প্রতিক এক ভিডিওতে তাদের সংস্করণের ম্যাভেনকে এমনভাবে উপস্থাপন করে, যেন কমান্ডাররা ভিডিও গেমের মতো করে যুদ্ধক্ষেত্র তদারকি করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে এই সিস্টেম এক আর্টিলারি ইউনিটকে মাত্র ২০ জনের দল দিয়ে ২ হাজার কর্মীর কাজ সম্পন্ন করতে দিয়েছে—জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে আসে, যেখানে আর্মির ১৮তম এয়ারবর্ন কোরে এর ব্যবহার বিশ্লেষণ করা হয়।
তবে এখন পেন্টাগনে অ্যানথ্রপিকের জায়গা নিতে প্রস্তুত অন্য এআই কোম্পানিগুলো। এক্সএআই গত সপ্তাহে শ্রেণিবদ্ধ সরকারি সিস্টেমে কাজের জন্য চুক্তি করেছে। একইভাবে অ্যানথ্রপিকের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ওপেনএআইও চুক্তি করেছে।
প্রতিরক্ষা সফটওয়্যার স্টার্টআপ লিজিয়ন ইন্টেলিজেন্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও বেন ভ্যান রু বলেন, গত আড়াই বছরে যুদ্ধ দপ্তরের সফটওয়্যার ব্যবস্থায় জেনারেটিভ এআই সংযুক্ত করার অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন, ‘প্রাথমিক ব্যবহার ক্ষেত্র হলো চ্যাট ও উন্নত অনুসন্ধান সুবিধা—মূলত তথ্যের সারসংক্ষেপ তৈরি।’ তিনি বলেন, এটি এখনো অস্ত্র বা মিশন-সংকটপূর্ণ ব্যবস্থায় গভীরভাবে একীভূত হয়নি। ইরানে এর ব্যবহারের বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানান, তবে জানতে চান, এটি কীভাবে আগে থেকেই লক্ষ্য অগ্রাধিকার নির্ধারণে সক্ষম সফটওয়্যারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। পল স্কারে বলেন, ইরানে এত দ্রুত মোতায়েন দেখে তিনি মুগ্ধ। তাঁর ভাষায়, ‘অভিযান চলাকালে এমন কিছু দেখা সত্যিই বিস্ময়কর।’

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে মার্কিন মিত্রদের আসল রূপ উন্মোচিত হচ্ছে। একদিকে ইসরায়েল, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা যখন ওয়াশিংটনের সামরিক পদক্ষেপের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানাচ্ছে, তখন ইউরোপের অবস্থান একেবারেই ম্রিয়মাণ। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ ইউরোপীয় নেতাদের...
১২ ঘণ্টা আগে
ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা কেবল তেহরানের ভাগ্যই নয়, বরং প্রতিবেশী আফগানিস্তানের তালেবান শাসনের পতনের এক নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। বর্তমানে ইরানে কেন্দ্রীয় শাসনের যে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাকে কাজে লাগিয়ে দেশটিতে নির্বাসিত হাজার হাজার সাবেক আফগান সেনাসদস্য একত্র হতে পারে।
১২ ঘণ্টা আগে
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি—মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে একজনকে ক্ষমতাচ্যুত ও অন্যজনকে নির্মূল করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত এই দুজনের পরিণতি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন তুললেও বেইজিংয়ের প্রতিক্রিয়া...
১৪ ঘণ্টা আগে
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে হামলা রাশিয়ার কট্টরপন্থী মহলে গভীর অস্বস্তি তৈরি করেছে। বিগত মাসগুলোতে ট্রাম্পকে ঘিরে মস্কোর একাংশে সতর্ক আশাবাদ দেখা দিয়েছিল। তাঁদের ধারণা ছিল, ট্রাম্পের অনিশ্চিত ও লেনদেনভিত্তিক কূটনীতি ইউক্রেন প্রশ্নে রাশিয়ার পক্ষে কাজে লাগতে পারে।
১৫ ঘণ্টা আগে