
তেহরানের ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট দিয়ে যে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল, তা দ্রুতই ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। গত সপ্তাহের রোববার থেকে ৩০টির বেশি শহরের মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছেন। মূলত অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু হওয়া এই প্রতিবাদ এখন বৃহত্তর রাজনৈতিক অস্থিরতায় রূপ নিয়েছে। চলমান এই বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত সাতজন নিহত এবং আরও ডজনখানেক মানুষ আহত হয়েছেন।
ধর্মঘটের শুরুটা হয়েছিল তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে। ঐতিহাসিকভাবেই এই বাজার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং শাসকগোষ্ঠীর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এবার সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের এই দূরত্ব সাধারণ ইরানিদের রাস্তায় নেমে আসার সুযোগ করে দিয়েছে, যেখানে তারা সরকারের বিরুদ্ধে সরব হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
গত সপ্তাহের রোববার মধ্য তেহরানের আলাদিন মোবাইল ফোন মার্কেট এবং সবজেহ মেইদান (ইরানের খোলা মুদ্রা বাজারের কেন্দ্র) থেকে ছোট ছোট বিক্ষোভ শুরু হয়। সংহতি জানিয়ে দ্রুতই গ্র্যান্ড বাজারের দোকানদাররা (যাদের স্থানীয়ভাবে ‘বাজারি’ বলা হয়) তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দেন।
এই বিক্ষোভের প্রধান কারণ ছিল মুদ্রার বিনিময় হারের তীব্র অস্থিতিশীলতা। কয়েক মাস ধরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের মান ক্রমাগত কমছিল, ফলে মুদ্রাস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য আকাশচুম্বী হয়েছে। রোববার নাগাদ খোলাবাজারে এক ডলারের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৪ লাখ ৫০ হাজার রিয়ালে। অথচ ২০১৮ সালে যখন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপ করা হয়, তখন এর মান ছিল প্রায় ৫৫ হাজার রিয়াল।
দোকানপাট বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল বোর্ডগুলো, যেখানে মুদ্রার হার দেখানো হয়, সেগুলোও বন্ধ হয়ে যায়। তেহরানের ব্যবসায়ীরা সাফ জানিয়ে দেন, ‘আমরা লেনদেন করছি না।’
ইরানের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের প্রধান সূচক হলো এই ডলারের রেট। রিয়ালের এই পতন এখন সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের সমস্যা। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের তেল ও গ্যাস রপ্তানির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং ব্যাপক দুর্নীতিই এই সংকটের মূল কারণ। বিশেষ করে, ২০২৫ সালের জুন মাসে ইসরায়েলের আক্রমণ এবং ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার পর এই সংকট আরও তীব্র হয়। ১২ দিনের সেই যুদ্ধ শেষে এক ডলারের দাম খোলা বাজারে ৮ লাখ ৫০ হাজার রিয়ালে পৌঁছেছিল।
শুধু রিয়ালের পতনই নয়, এই ধর্মঘট ও বিক্ষোভের পেছনে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল—তেলের দাম বৃদ্ধি এবং আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব। ইরানে পৃথিবীর অন্যতম সস্তা পেট্রোল পাওয়া যায়। সরকার মাসে ৬০ লিটার পর্যন্ত প্রতি লিটার ১৫ হাজার রিয়ালে এবং ১০০ লিটার ৩০ হাজার রিয়ালে সরবরাহ করে। ২০১৯ সালের নভেম্বরে জ্বালানির দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে হওয়া বিক্ষোভে ৩২১ জন প্রাণ হারানোর পর থেকে এই দাম স্থির রাখা হয়েছিল।
তবে অর্থনৈতিক চাপে পড়ে গত ডিসেম্বরে সরকার এক নতুন নিয়ম চালু করে। এখন যারা মাসে ১৬০ লিটারের বেশি জ্বালানি ব্যবহার করবেন, তাদের প্রতি লিটারের জন্য ৫০ হাজার রিয়াল দিতে হবে। পাশাপাশি নতুন বাজেটে ব্যবসায়ী ও বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার কারণে তেল ও গ্যাস থেকে আয় কমার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের ভয়, এর ফলে সরকার বাণিজ্যের জন্য পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ করতে পারবে না। এসব চাপ মিলেই গত রবিবারের ধর্মঘট ত্বরান্বিত করেছে।
তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে ধর্মঘট নতুন কিছু নয়। এই ‘বাজারি’রা ইরানের অন্যতম প্রভাবশালী অর্থনৈতিক গোষ্ঠী। তারা দোকান বন্ধের মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে নিজেদের দাবি আদায় করতে অভ্যস্ত। তাদের এই প্রভাব কেবল খুচরা বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বাজারের পেছনের অফিসগুলোতে কোটি কোটি ডলারের চুক্তি হয়। এই ধর্মঘটের ঐতিহ্য বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকেই চলে আসছে। ১৯০৫-১১ সালের সাংবিধানিক বিপ্লবের সময় তেহরান ও তাবরিজের ধর্মঘট বিপ্লবীদের বড় শক্তি জুগিয়েছিল। ১৯৬৩ সালেও শাহের একনায়কত্বের বিরুদ্ধে তারা রুখে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের সময় ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে তাদের মৈত্রী আরও শক্তিশালী হয়, যার ফলে পরবর্তী সময়ে তারা ব্যাপক রাজনৈতিক প্রভাব অর্জন করেন।
বাজারের গুরুত্ব বুঝতে পেরে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। শীর্ষ ব্যবসায়ী ও নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে কর ছাড় ও ভর্তুকি মূল্যে বৈদেশিক মুদ্রা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। গত মঙ্গলবার ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোহাম্মদ রেজা ফারজিন পদত্যাগ করেন। ২০২২ সালে একই কারণে পূর্ববর্তী গভর্নর সরে যাওয়ার পর তিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তাঁর সময়ে ডলারের দাম ৪ লাখ ৩৫ হাজার রিয়াল থেকে বহুগুণ বেড়েছে। নতুন গভর্নর আব্দুল নাসের হেমমাতি বাজার স্থিতিশীল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
ধর্মঘট আটকাতে সরকার তীব্র শীতের অজুহাতে তেহরানের সরকারি অফিস ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো বন্ধ ঘোষণা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্লাস অনলাইনে নেওয়া হচ্ছে যাতে ক্যাম্পাসগুলো থেকে কোনো আন্দোলন দানা বাঁধতে না পারে। সরকারের কঠোর অবস্থান সত্ত্বেও বিক্ষোভ তেহরানের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। এই অস্থিরতা ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর শুরু হওয়া আন্দোলনের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে।
আগে তেহরানকেন্দ্রিক আন্দোলনে কঠোর দমন-পীড়ন চললেও, এবার ছোট ছোট শহরগুলোতে বিক্ষোভের তীব্রতা বেশি দেখা যাচ্ছে। কুর্দি, লুরি, আরব ও তুর্কি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে মঙ্গলবার থেকেই সংঘর্ষ শুরু হয়। বুধবার কুহদাশতে বিক্ষোভকারীরা গভর্নরের কার্যালয় আক্রমণ করলে অন্তত একজন নিহত হন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তাকে পাহারাদার বা ‘বাসিজ’ সদস্য দাবি করলেও তার বাবা সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানান, তাঁর ছেলে একজন বিক্ষোভকারী ছিল।
সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে আজনা শহরে, যেখানে অন্তত তিনজন নিহত ও ১৭ জন আহত হয়েছেন। শুক্রবার জোহরের নামাজের পর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাহেদান শহরেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে সুন্নি আলেম মোল্লা আব্দুল হামিদের সমর্থকেরা যোগ দেন।
পূর্বের অভিজ্ঞতা বলে, ইরান কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভ দমনে কঠোর বল প্রয়োগ করতে দ্বিধা করবে না। এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার সতর্ক করে বলেছেন, শান্তিকামী বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতা চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘ইরান যদি শান্তিকামী বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়, তবে আমেরিকা তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসবে। আমরা সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি।’
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর সরকারি কর্মকর্তারা অভিযোগ করছেন, বিক্ষোভকারীরা বিদেশি শক্তির দাবার ঘুঁটি হিসেবে কাজ করছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই অজুহাত ব্যবহার করে সরকার ভবিষ্যতে আরও কঠোর দমন-পীড়ন চালাতে পারে। বর্তমানে ইরানের শহরগুলোতে ভারী নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি থাকলেও সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও প্রতিরোধের জেদ এখনো কমেনি।

ইরানও বসে ছিল না। তারাও ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে নিজস্ব আগ্রাসী নিয়োগ ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযান চালাচ্ছে। দুই দেশের পাল্টাপাল্টি গুপ্তচর তৎপরতার পরিসর, বিস্তার ও সাফল্য এক নয়। তবু পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যে, যুদ্ধ শেষে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা দেশের জাতীয় জনকূটনীতি অধিদপ্তরের সঙ্গে
১ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার ইরানকে তাঁর সর্বশেষ আলটিমেটাম দিয়েছেন। গাজা পুনর্গঠন ও বৈশ্বিক শান্তি নির্মাণের উদ্দেশ্যে গঠিত বোর্ড অব পিসের প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন। মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফেরাতে ট্রাম্প নিজেই এই জোট গঠন করেছিলেন...
২ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতিকে নিজের পক্ষে কাজে লাগানোর সুযোগ দেখছে চীন। বেইজিং মনে করছে, বৈশ্বিক বাণিজ্যকে নতুনভাবে সাজিয়ে তারা এমন এক কাঠামো গড়ে তুলতে পারে, যা ভবিষ্যতে বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ থেকে তাদের ১৯ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখবে।
৪ ঘণ্টা আগে
চলতি বছরের শুরুতে মেজর জেনারেল হাসান রাশাদের নেতৃত্বে মিসরের জেনারেল ইন্টেলিজেন্স ডাইরেক্টরেট (জিআইডি) আফ্রিকা মহাদেশজুড়ে এক বিস্তৃত নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অভিযান শুরু করে। এতে সহযোগিতা করে চীনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়, যা কার্যত চীনের প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা। এই অভিযানের লক্ষ্য...
১ দিন আগে