Ajker Patrika

মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা চলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে, কিম কি এখন দক্ষিণ কোরিয়া আক্রমণ করবেন

আবদুল বাছেদ, ঢাকা
মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা চলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে, কিম কি এখন দক্ষিণ কোরিয়া আক্রমণ করবেন
দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন মার্কিন থাড এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম। ছবি: ইয়ুনহাপ

ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বরাজনীতির মেরুকরণ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এক অঞ্চলের উত্তাপ অন্য অঞ্চলের নিরাপত্তাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে। গত মঙ্গলবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিউং নিশ্চিত করেছেন, পেন্টাগন দক্ষিণ কোরিয়া থেকে তাদের অত্যন্ত শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘থাড’ এবং প্যাট্রিয়ট ব্যাটারিগুলো সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ে যাচ্ছে। ওয়াশিংটনের এই সিদ্ধান্ত সিউল এবং টোকিওতে এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, আমেরিকার এই সামরিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে কিম জং উন কি এখন দক্ষিণ কোরিয়া আক্রমণ করবেন?

আমেরিকা বর্তমানে এক চরম সংকটে রয়েছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ১ টনের মিসাইল ও ড্রোন বৃষ্টির বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও আরব মিত্রদের রক্ষা করা, অন্যদিকে পূর্ব এশিয়ায় চীন ও উত্তর কোরিয়ার আগ্রাসন থেকে তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে বাঁচানো। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে থাড এবং প্যাট্রিয়ট সরিয়ে নেওয়া প্রমাণ করে যে আমেরিকার ‘গ্লোবাল লজিস্টিক’ বা বৈশ্বিক রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা এখন খাদের কিনারে।

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন গত ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ কোরিয়াকে তাদের ‘এক নম্বর এবং চিরস্থায়ী শত্রু’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি কোরীয় পুনর্মিলনের যাবতীয় সম্ভাবনা বাতিল করে দিয়ে সংবিধানে পরিবর্তনের ডাক দিয়েছেন। যখন সিউলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হচ্ছে এবং জাপানের ইয়োকোসুকা থেকে মার্কিন ডেস্ট্রয়ারগুলো আরব সাগরে পাড়ি দিচ্ছে, তখন কিমের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক সুযোগ হতে পারে।

কোরীয় উপদ্বীপের ইতিহাস বলে যে উত্তর কোরিয়া তখনই আক্রমণাত্মক হয়, যখন সে বুঝতে পারে দক্ষিণ কোরিয়া বা তার মিত্ররা মানসিকভাবে বা সামরিকভাবে অপ্রস্তুত। ১৯৫০ সালের ২৫ জুন যখন উত্তর কোরিয়া দক্ষিণে আক্রমণ করেছিল, তখন তার অন্যতম কারণ ছিল আমেরিকার অস্পষ্ট নিরাপত্তা নীতি।

বর্তমানের পরিস্থিতি ১৯৫০ সালের চেয়েও জটিল। ইতিহাসবিদদের মতে, উত্তর কোরিয়া সরাসরি কোনো বৃহৎ যুদ্ধে জড়ানোর আগে ছোটখাটো ‘প্ররোচনা’ দিয়ে থাকে। ২০১০ সালে ইয়ংপিওং দ্বীপপুঞ্জে গোলাবর্ষণ কিংবা চেওনান জাহাজডুবি ছিল তেমনি কিছু ঘটনা। সামরিক বিশ্লেষক চোই গি-ইল মনে করেন, উত্তর কোরিয়া আমেরিকার এই সামরিক স্থানান্তরকে ‘পরীক্ষা’ করার জন্য সীমান্তে ছোটখাটো সামরিক সংঘাত শুরু করতে পারে।

উত্তর কোরিয়া একা কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না। বর্তমানে রাশিয়ার সাথে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে গভীর। ইউক্রেন যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার গোলাবারুদ সরবরাহের বিনিময়ে পুতিন কিমকে আধুনিক মিসাইল এবং স্যাটেলাইট প্রযুক্তি দিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ‘রিয়েলিস্ট’ থিওরি অনুযায়ী, ইউক্রেন ও ইরানের পর যদি কোরিয়াতে তৃতীয় একটি রণক্ষেত্র তৈরি হয়, তবে তা রাশিয়ার জন্য চরম লাভজনক হবে। কারণ এতে আমেরিকা তিন দিকে বিভক্ত হয়ে পড়বে এবং ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাদের মনোযোগ সরে যাবে। চীন যদিও এই মুহূর্তে বড় কোনো যুদ্ধ চায় না, কিন্তু তাইওয়ান দখলের জন্য আমেরিকার এই সামরিক ব্যস্ততাকে তারা আশীর্বাদ হিসেবে দেখতে পারে। কিম জং উন যদি এখন আক্রমণ করেন, তবে তিনি বেইজিং ও মস্কোর পরোক্ষ সমর্থন পাবেন, এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তবে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিউং দাবি করেছেন, মার্কিন অস্ত্র সরে গেলেও দক্ষিণ কোরিয়া একা উত্তর কোরিয়াকে ঠেকাতে সক্ষম। এটি আংশিক সত্য। দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাবাহিনী বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ও শক্তিশালী বাহিনী। তাদের কনভেনশনাল বা প্রথাগত অস্ত্রশস্ত্র উত্তর কোরিয়ার চেয়ে অনেক উন্নত।

কিন্তু সমস্যা হলো ‘পারমাণবিক ব্ল্যাকমেইল’। উত্তর কোরিয়ার কাছে পারমাণবিক অস্ত্র এবং ট্যাকটিক্যাল নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড রয়েছে। আমেরিকার ‘নিউক্লিয়ার আমব্রেলা’ বা পারমাণবিক সুরক্ষাকবচ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক হুমকির মুখে অত্যন্ত দুর্বল। কিম জং উন যদি মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে ব্যস্ত থাকার কারণে আমেরিকা এখন পারমাণবিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারবে না, তবে তিনি দক্ষিণে আক্রমণের দুঃসাহস দেখাতে পারেন।

কিম জং উন সম্ভবত এখনই একটি পূর্ণাঙ্গ স্থল যুদ্ধ শুরু করবেন না। তবে তিনি সাইবার হামলা চালিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যাংকিং ও অবকাঠামো অচল করে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। এনএলএল বা সামুদ্রিক সীমান্ত এলাকায় উসকানি দিয়ে উত্তেজনা বাড়াতে পারেন।

তবে সবচেয়ে বড় যেই সম্ভাবনা এই মুহূর্তে সৃষ্টি হয়েছে, তা মিসাইল পরীক্ষা। সিউলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা পরীক্ষা করতে কিম স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালাতে পারেন। এ ছাড়া ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় কিমও এখন বিপুল ড্রোন তৈরির দিকে নজর দিয়েছেন।

তবে আক্রমণের প্রবল আশঙ্কা থাকলেও কিছু কারণ কিমকে পিছিয়ে রাখতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ায় এখনো ২৮ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরলেও মার্কিন সৈন্যদের ওপর আঘাত হানার অর্থ হলো আমেরিকার সাথে সরাসরি যুদ্ধ। দক্ষিণ কোরিয়া ধ্বংস হলে তার প্রভাব উত্তর কোরিয়ার ওপরও পড়বে। বিশেষ করে কিম বর্তমানে দেশের ভেতরে খাদ্যসংকট ও অর্থনৈতিক সমস্যা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। এ ছাড়া চীনও অনাগ্রহ দেখাতে পারে। চীন তার সীমান্তে কোনো পারমাণবিক যুদ্ধ চায় না, কারণ এতে শরণার্থী সংকট ও তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি রয়েছে।

কিম জং উন এখনই একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু করবেন কি না, তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির ওপর। যদি আমেরিকা ইরানের কাছে নাস্তানাবুদ হতে থাকে এবং এশিয়া থেকে আরও বেশি সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেয়, তবে কিম জং উন তার ‘সুযোগবাদী’ নীতির প্রয়োগ ঘটাতে পারেন।

লেখক: আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ভারতে প্রথম স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি দিলেন সুপ্রিম কোর্ট

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চাকরির সুযোগ

আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র—নিশ্চিত করলেন দ. কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট

সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে মুখোমুখি সরকারি ও বিরোধী দল

‘টাকা খাওয়ার’ কথা বলতেই পলাতক ফারুক চৌধুরী বললেন, ‘তুই সামনে পড়িস’

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত