Ajker Patrika

তেলের দামের লাগাম হারাচ্ছেন ট্রাম্প, বিপদে পড়বে এশিয়ার দেশগুলো

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
তেলের দামের লাগাম হারাচ্ছেন ট্রাম্প, বিপদে পড়বে এশিয়ার দেশগুলো
ছবি: সংগৃহীত

ডোনাল্ড ট্রাম্প ৯ মার্চ ঘোষণা করেছেন, দ্বিতীয় সপ্তাহে পা রাখা ‘তৃতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ’ প্রায় শেষের পথে। ইরানের সামরিক সক্ষমতা ‘গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে’ দাবি করে তিনি জানিয়েছেন, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শিগগির শেষ হবে। ট্রাম্পের আশ্বাস, প্রয়োজনে আমেরিকা নিজেই জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে হরমুজ প্রণালি পার করে দেবে এবং বিমাকারীদের রাজনৈতিক ঝুঁকির গ্যারান্টি দেবে। তবে বাজারের বাস্তব চিত্র ট্রাম্পের এই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মিলছে না। ব্রেন্ট ক্রুড বর্তমানে ব্যারেলপ্রতি ৯১ ডলারে নেমে এলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকট নিরসনে ট্রাম্পের হাতে থাকা বিকল্পগুলো অত্যন্ত সীমিত ও ঝুঁকিপূর্ণ।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়, যা বিশ্বের মোট উৎপাদনের ১৪ শতাংশ। বর্তমানে যুদ্ধাবস্থার কারণে জাহাজ বিমার প্রিমিয়াম ১-২ শতাংশ বেড়েছে (যা যুদ্ধপূর্ব সময়ের চেয়ে ৩-৬ গুণ বেশি)। ট্রাম্প প্রশাসন ২০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল (ডিএফসি) ঘোষণা করেছে বিমা সহায়তা দেওয়ার জন্য।

জেপি মরগ্যানের মতে, উপসাগরে আটকে পড়া সব জাহাজ কভার করতে প্রায় ৩৫২ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন, যা আমেরিকার ঘোষিত তহবিলের চেয়ে অনেক বেশি। এ ছাড়া, বিমার চেয়ে বড় সমস্যা হলো নিরাপত্তা। জাহাজমালিকরা বিমার অভাবে নয়, বরং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আঘাতের ভয়ে জাহাজ চালাতে ভয় পাচ্ছেন।

১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় আমেরিকা কুয়েতি জাহাজগুলোকে সামরিক পাহারায় পার করে দিয়েছিল। ট্রাম্পও এখন সেই পথ অনুসরণ করতে চাইছেন। তবে বর্তমানে উপসাগরে প্রায় ৩২০টি জাহাজ আটকে আছে। ১৯৮০-এর দশকের গতিতে সপ্তাহে একটি কনভয় পরিচালনা করলে সব জাহাজ বের করতে প্রায় আড়াই বছর সময় লাগবে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ৫০টিরও বেশি জাহাজ এই পথে চলাচল করে। তা ছাড়া, মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো এখন সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত। প্রতিটি তেলের জাহাজকে পাহারা দেওয়া সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। একটি তেলের জাহাজে ইরানের একটি ড্রোন সফলভাবে আছড়ে পড়লেই পুরো প্রণালি মাসের পর মাস অচল হয়ে যেতে পারে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সদস্য দেশগুলোর কাছে প্রায় ১২০ কোটি ব্যারেল তেলের জরুরি মজুত রয়েছে। এ ছাড়া শিল্পের নিজস্ব মজুত রয়েছে আরও ৬০ কোটি ব্যারেল। তবে তেলের মজুদ চাইলেই রাতারাতি বাজারে ছাড়া যায় না। আমেরিকার ভূগর্ভস্থ গুদামগুলোর স্থায়িত্ব রক্ষার জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল সব সময় রেখে দিতে হয়। এ ছাড়া পাইপলাইনের সীমাবদ্ধতার কারণে এই মজুত থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ মাত্র ৩০ লাখ ব্যারেল তেল বিশ্ববাজারে সরবরাহ করা সম্ভব, যা হরমুজ প্রণালির ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল ঘাটতির তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। তেলের মজুদ ছাড়ার ঘোষণা অনেক সময় উল্টো ফল দেয়; ব্যবসায়ীরা মনে করেন পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে, ফলে দাম আরও বেড়ে যায়।

তেল সরবরাহ বাড়ানোর দ্রুততম উপায় হলো রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া। ইতিমধ্যে আমেরিকা ভারতকে সমুদ্রপথে থাকা ১৪ কোটি ব্যারেল রুশ তেল কেনার অনুমতি দিয়েছে। ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা পর্যন্ত এই ছাড় কার্যকর থাকবে। তবে বিপদে পড়ে পুতিনকে সমর্থন দেওয়ার প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা আছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার তেলশিল্পের যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশের অভাব রয়েছে, ফলে তারা চাইলেও হুট করে উৎপাদন বাড়াতে পারবে না। এতে বিশ্ববাজারে রুশ তেলের জন্য হাহাকার তৈরি হবে এবং দাম কমার বদলে বাড়তে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে ‘শেইল’ তেল উৎপাদনকারী আমেরিকান কোম্পানিগুলো দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম। কিন্তু বর্তমান সময়ে কোম্পানিগুলো নতুন খনি খননের চেয়ে শেয়ারহোল্ডারদের মুনাফা দিতে বেশি আগ্রহী। তারা উৎপাদন বাড়াতে অন্তত ৬ থেকে ১২ মাস সময় নেবে, যা বর্তমান সংকট নিরসনে খুব একটা কাজে আসবে না।

বাস্তবতা হলো, তেলের রিজার্ভ ছাড়া, রুশ তেল এবং মার্কিন শেইল অয়েলের উৎপাদন—সব মিলিয়ে প্রতিদিন মাত্র ৪০ লাখ ব্যারেল অতিরিক্ত তেল সরবরাহ করা সম্ভব। এটি হরমুজ প্রণালির ঘাটতির মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। ইতিমধ্যে ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরব তাদের তেল উৎপাদন কমাতে শুরু করেছে; কারণ তাদের তেল জমা রাখার মতো আর জায়গা নেই। যদি এই অচলাবস্থা আরও তিন সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তবে বিশ্ববাজার থেকে প্রায় ১ কোটি ব্যারেল তেল হাওয়া হয়ে যাবে, যা বিশ্ব উৎপাদনের ১০ শতাংশ।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জি সতর্ক করে বলেছে, যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। ইতিমধ্যে চীন তাদের শোধনাগারগুলোকে ডিজেল ও পেট্রল রপ্তানি বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। ভারত ও আমেরিকার মতো দেশগুলোও একই পথ অনুসরণ করলে (প্রোটেকশনিজম) এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে চরম বিপর্যয় নেমে আসবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে তেলের দাম কমানোর কোনো ‘জাদুকরি’ উপায় নেই। সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে তিনি হয়তো ইরানকে দুর্বল করতে পারেন, কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা তাঁর জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। হরমুজ প্রণালি দ্রুত সচল না হলে বিশ্ব এক ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি ও জ্বালানি সংকটের মুখে পড়বে।

দ্য ইকোনমিস্ট থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ভারতে প্রথম স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি দিলেন সুপ্রিম কোর্ট

আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র—নিশ্চিত করলেন দ. কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চাকরির সুযোগ

সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে মুখোমুখি সরকারি ও বিরোধী দল

হরমুজ প্রণালিতে মাইন বিছানো শুরু ইরানের, নজিরবিহীন পরিণতির হুমকি ট্রাম্পের

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত