
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেন, তখন থেকে বিশ্বজুড়ে এক চরম বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়েছে। পেন্টাগন থেকে হোয়াইট হাউস—কোথাও ট্রাম্পের এই যুদ্ধের প্রকৃত লক্ষ্য বা সময়সীমা নিয়ে স্পষ্ট কোনো উত্তর নেই। প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাম্প কি আদৌ কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন, নাকি এটি শুধুই খামখেয়ালিপনা?
তবে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপগুলোর পেছনে একটি সুসংগত স্ট্র্যাটেজিক ভিশন বা কৌশলগত লক্ষ্য কাজ করছে। যাঁরা তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন বা তাঁর জীবনী লিখেছেন, তাঁদের মতে ট্রাম্প এখন যা করছেন তা আসলে তাঁর সেই পুরনো ‘রিয়েল এস্টেট মানসিকতা’রই প্রতিফলন। একসময় তিনি নিউইয়র্কের আকাশচুম্বী দালানগুলোতে নিজের নাম খোদাই করে অমরত্ব চেয়েছিলেন, আর এখন তিনি পুরো পৃথিবীকে নিজের ব্র্যান্ডিংয়ের আওতায় নিয়ে আসতে চাইছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের কর্মজীবনের শুরু থেকে একটি বিশেষ প্রবণতা লক্ষ করা গেছে, যেকোনো কিছুকে নিজের ছাঁচে ঢেলে সাজানো। আশির দশকে নিউইয়র্কের ‘স্কাইলাইন’ পুনর্গঠন হোক, কিংবা ২০১৬ সালের পর রিপাবলিকান পার্টির অ্যাজেন্ডাকে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্ট্যাম্প দিয়ে বদলে দেওয়া— সবখানেই তিনি নিজের আধিপত্য নিশ্চিত করতে চেয়েছেন। এখন তিনি গড়ে তুলতে চাইছেন এক ‘ট্রাম্প ওয়ার্ল্ড’। তার লক্ষ্য এমন একটি বৈশ্বিক উত্তরাধিকার তৈরি করা, যা তার পূর্বসূরিদের সব অর্জনকে ছাপিয়ে যাবে এবং ইতিহাস তাঁকে ‘স্বর্ণযুগের নির্মাতা’ হিসেবে অমর করে রাখবে।
ট্রাম্পের জীবনীকার গোয়েন্দা ব্লেয়ারের মতে, ‘ট্রাম্পের জন্য সবকিছুই হলো ব্র্যান্ডিং। এখন তিনি পৃথিবী নামক গ্রহটাকে ব্র্যান্ডিং করছেন।’ এই ডকট্রিনের মূল কথা হলো—পুরোনো এবং তাঁর মতে ‘ব্যর্থ’ বিশ্বব্যবস্থাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়ে একটি নতুন ব্যবস্থা তৈরি করা, যার লেখক হবেন তিনি নিজে। এ কারণেই তিনি নাফটা, ইরান পরমাণু চুক্তি কিংবা প্যারিস জলবায়ু চুক্তির মতো আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন; কারণ এগুলোতে তাঁর নাম ছিল না। এমনকি তিনি জাতিসংঘকে সরিয়ে একটি ‘বোর্ড অব পিস’ তৈরির পরিকল্পনা করছেন, যার প্রধান হবেন তিনি নিজেই।
অনেকে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং বর্তমান যুদ্ধের মধ্যে বৈপরীত্য খুঁজে পাচ্ছেন। প্রচারণায় তিনি বলেছিলেন, তিনি কোনো বিদেশি যুদ্ধ শুরু করবেন না, কিন্তু এখন তিনি ইরান ও ভেনেজুয়েলায় পূর্ণমাত্রার অভিযান চালাচ্ছেন। ব্লেয়ারের মতে, ট্রাম্পের মনে এর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। ট্রাম্পের কাছে ‘শান্তি’ মানে হলো এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা যেখানে তাঁর একক নিয়ন্ত্রণ থাকবে। তিনি একে বলছেন ‘পরাক্রমের মাধ্যমে শান্তি’।
তবে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার পেছনে পারিবারিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থের গন্ধও পাচ্ছেন বিশ্লেষকেরা। ট্রাম্পের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য বিশাল সম্পদ ও প্রতিপত্তি নিশ্চিত করার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এখানে থাকতে পারে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো যারা ইরানের ঘোর বিরোধী, তাদের সাথে ট্রাম্প পরিবারের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক চুক্তি রয়েছে। ফলে এই যুদ্ধ শুধু ভূরাজনীতি নয়, বরং ট্রাম্পের ‘ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য’ বিস্তারের একটি কৌশলও হতে পারে।
ট্রাম্পের সমালোচকরা মনে করছেন তিনি বৈশ্বিক শৃঙ্খলা ধ্বংস করছেন। তবে জো বাইডেন প্রশাসনের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা রেবেকা লিসনার মনে করেন, এটি আসলে ট্রাম্পের ‘সৃজনশীল ধ্বংসযজ্ঞের’ অংশ। তিনি দেখাতে চাইছেন, আমেরিকা কতটা শক্তিশালী এবং তার জবরদস্তিমূলক ক্ষমতা কতটা অসীম। ট্রাম্প এমন সব রেজিম বা শাসনব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলতে চাইছেন যারা দশকের পর দশক ধরে আমেরিকার মাথাব্যথার কারণ হয়ে ছিল, সেটা ভেনেজুয়েলাই হোক বা ইরান। তিনি প্রমাণ করতে চান যে আমেরিকা যদি চায়, তবে শক্তি প্রয়োগ করে প্রচলিত সব নিয়ম ভেঙে নিজের ইচ্ছামতো নতুন কিছু গড়তে পারে।
মজার বিষয় হলো, ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থানের প্রশংসা শোনা যাচ্ছে অনেক ঘোর বিরোধী শিবিরেও। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিক মার্জ হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সাথে বৈঠক করে ইরানের ওপর হামলার যৌক্তিকতা সমর্থন করেছেন। ব্রিটেন ও ফ্রান্সও ইরানের পাল্টা আক্রমণের জবাবে নৌ ও বিমান শক্তি মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে। এমনকি কোনো কোনো ইউরোপীয় কূটনীতিক মনে করছেন, ট্রাম্প তার পূর্বসূরিদের তুলনায় অনেক বেশি বাস্তববাদী। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছেন যে রাশিয়ার পুতিন বা চীনের মতো শক্তিগুলোকে দমানোর জন্য পুরোনো আন্তর্জাতিক নিয়মগুলো এখন আর কাজ করছে না।
রুজবাড এফেক্ট
ট্রাম্পের এই মনস্তত্ত্ব বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯৬৪ সালে। ১৮ বছর বয়সী ডোনাল্ড ট্রাম্প তখন তাঁর বাবার সাথে নিউইয়র্কের ভেরাজানো-ন্যারোস ব্রিজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি দেখেছিলেন, সেই বিশাল সেতুর নকশাকার ৮৫ বছর বয়সী প্রকৌশলী ওথম্যার আম্মান বৃষ্টির মধ্যে একপাশে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু বক্তৃতায় কেউ তাঁর নাম পর্যন্ত নিল না।
১৯৮০ সালে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমি সেদিনই উপলব্ধি করেছিলাম, যদি আপনি মানুষকে সুযোগ দেন, তবে তারা আপনাকে বোকা বানাবে। আমি নিজেকে বোকা হিসেবে দেখতে চাই না।’ সেই দিন থেকেই ট্রাম্পের মাথায় গেঁথে যায়, তিনি যা করবেন তাতে অবশ্যই তাঁর নামের ছাপ থাকতে হবে। আজকের ‘ট্রাম্প ডকট্রিন’ আসলে সেই ১৮ বছরের তরুণের এক জেদের বিস্তৃতি, যা এখন বিশ্ব মানচিত্রকে বদলে দিতে চাইছে।
ইতিহাস সাক্ষী, ট্রাম্পের রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল বিশাল উচ্চাকাঙ্ক্ষার ওপর ভর করে, যা তাঁকে ছয়বার দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। বর্তমান ইরান যুদ্ধও ট্রাম্পের জন্য তেমনই এক ‘ওভার-রিচিং’ বা অতি-উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রজেক্ট হয়ে দাঁড়াতে পারে। ইরানের পাল্টা আক্রমণ এবং তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি সেই দেউলিয়া হওয়ার সংকেতই দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
ট্রাম্প চাইছেন ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে। তিনি ইরানিদের বলছেন, ‘নিজেদের সরকার দখল করে নিন, এটাই তোমাদের শেষ সুযোগ।’ এমনকি তিনি ভেনেজুয়েলার মতো ইরানের পরবর্তী নেতা কে হবেন, সেই নিয়োগপ্রক্রিয়ায় নিজে সরাসরি যুক্ত থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু ইরানের মতো একটি কট্টর ধর্মতাত্ত্বিক রাষ্ট্রে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন হস্তক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সেথ জি জোন্স সতর্ক করে বলেছেন, ‘ইরাক ও আফগানিস্তানেও শুরুতে সবকিছু ভালো মনে হয়েছিল। কিন্তু যখন আমরা সেখানকার প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে কারসাজি শুরু করলাম, তখন এক দীর্ঘস্থায়ী বিদ্রোহের মুখে পড়লাম।’ ট্রাম্পের এই ‘ব্র্যান্ডিং দ্য ওয়ার্ল্ড’ প্রজেক্ট শেষ পর্যন্ত তাঁকে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে, নাকি বিশ্বকে এক নতুন নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দেবে; তার উত্তর হয়তো লুকিয়ে আছে ট্রাম্পের সেই দেউলিয়া হওয়ার ইতিহাসের মধ্যেই।
ফরেন পলিসি থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ

দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পৃথিবীর বুকে টিকে থাকা ছোট্ট সমাজতান্ত্রিক দেশ কিউবার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের পর কিউবাকে ঘিরে ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক মন্তব্য দ্বীপরাষ্ট্রটির অস্তিত্বকে সংকটে ফেলেছে।
৩৩ মিনিট আগে
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বরাজনীতির মেরুকরণ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এক অঞ্চলের উত্তাপ অন্য অঞ্চলের নিরাপত্তাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে। গত মঙ্গলবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিউং নিশ্চিত করেছেন, পেন্টাগন দক্ষিণ কোরিয়া থেকে তাদের অত্যন্ত শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘থাড’ এবং
১ ঘণ্টা আগে
ডোনাল্ড ট্রাম্প ৯ মার্চ ঘোষণা করেছেন, দ্বিতীয় সপ্তাহে পা রাখা ‘তৃতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ’ প্রায় শেষের পথে। ইরানের সামরিক সক্ষমতা ‘গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে’ দাবি করে তিনি জানিয়েছেন, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শিগগির শেষ হবে। ট্রাম্পের আশ্বাস, প্রয়োজনে আমেরিকা নিজেই জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে হরমুজ প্রণালি পার করে দেবে
২ ঘণ্টা আগে
ভারতের বিভিন্ন শহরে বর্তমানে বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডারের তীব্র সংকট এবং পেট্রল-ডিজেলের ক্রমবর্ধমান মূল্য শুধু কোনো বিচ্ছিন্ন অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি ভারতের সাম্প্রতিক বৈদেশিক নীতির একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। গত কয়েক দশকে মধ্যপ্রাচ্যে ভারত যে ভারসাম্য বজায় রেখে আসছিল, সাম্প্রতিক
৩ ঘণ্টা আগে