Ajker Patrika

যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড় দিতে বাধ্য করতে যেভাবে চাপ বাড়াচ্ছে ইরান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২৬, ১৬: ০৬
যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড় দিতে বাধ্য করতে যেভাবে চাপ বাড়াচ্ছে ইরান
প্রতীকী ছবি

ইরান বাজি ধরেছে যে, চলমান যুদ্ধে তারা ওয়াশিংটনের চেয়ে বেশি দিন টিকতে পারবে। আর এর জন্য তারা মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যিক পথ, নৌযোগাযোগ এবং জ্বালানি অবকাঠামোকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, যাতে প্রতিপক্ষের জন্য সংঘাতের খরচ ক্রমেই বাড়তে থাকে। এমনটাই জানিয়েছেন উপসাগরীয় কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা।

একটি সিদ্ধান্তমূলক সামরিক বিজয় অর্জনের চেষ্টার বদলে তেহরান মেপে মেপে উত্তেজনা বাড়ানোর নীতি নিয়ে এগোচ্ছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে না জড়িয়েই সংঘাতের পরিধি বাড়িয়ে দেওয়া।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের এটা বোঝানো যে—সংকট নিয়ন্ত্রণে রাখাটা হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের দাবি মেনে নেওয়ার চেয়েও বেশি ব্যয়বহুল। তেহরানের বার্তাটি স্পষ্ট—ওয়াশিংটন যদি হরমুজ প্রণালিতে ইরানকে আরও বড় ভূমিকা দিয়ে নতুন বাস্তবতা মেনে না নেয়, তবে এই সংঘাত উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইরান বিশ্বাস করে, বিভিন্ন সামুদ্রিক পথ এবং জ্বালানি সম্পদকে ঝুঁকির মুখে ফেলে তারা ভবিষ্যতের যেকোনো আলোচনায় নিজেদের হাত আরও শক্তিশালী করতে পারবে।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের মাইকেল নাইট্স বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘ইরান শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি উত্তেজনা তৈরি করতে চেয়েছে। তারা তাদের কৌশলের পরিধি এমনভাবে বিস্তৃত করেছে যাতে প্রতি সপ্তাহে নতুন কিছু সামনে আনা যায়—একটি নতুন এলাকা, নতুন ধরনের অস্ত্র কিংবা নতুন ধরনের লক্ষ্যবস্তু।’

নাইট্স যোগ করেন, ‘তাদের (ইরানের) সবচেয়ে বড় সুবিধা এটা নয় যে—তারা আমেরিকা বা ইসরায়েলকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাদের আসল সুবিধা হলো তারা আঞ্চলিক দেশসমূহ এবং বিশ্বের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।’

যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ব্যবহারের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেত, সেখানে চলাচল ব্যাহত করার ক্ষমতা দেখানোর পর তেহরান ইঙ্গিত দিয়েছে যে কোনো সামুদ্রিক পথই তাদের সীমার বাইরে নয়। লোহিত সাগর ও সৌদি জ্বালানি অবকাঠামোর প্রতি হুমকি এটাই ইঙ্গিত করে যে, বিশ্ব বাণিজ্য রক্ষার খরচ বাড়িয়ে দেওয়ার এবং একইসঙ্গে এ ধরনের অস্থিরতা ওয়াশিংটন কতটা সহ্য করতে পারে—তা পরখ করে দেখার এক ব্যাপক প্রচেষ্টা চলছে।

উপসাগরীয় একটি সূত্রের মতে, ইরানের এই দৃষ্টিভঙ্গি দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রধানদের একটি বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটায়। আর তা হলো—তারা ‘আরও বেশি কিছু অর্জন করতে পারবে।’ তারা মনে করছে, আসছে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি সংঘাতে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়তে অনিচ্ছুক। আর এটিকেই তারা একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে।

উপসাগরীয় সূত্রটি জানিয়েছে, ‘ইরানিরা মনে করে—যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে দিয়ে এবং চাপ বাড়িয়ে তারা অবশেষে তাকে নতি স্বীকার করাতে পারবে। ট্রাম্প ভাবছেন তিনি ইরানিদের ওপর কঠোর আঘাত হেনে তাদের আলোচনার টেবিলে আনতে পারবেন, কিন্তু তারা মাথা নোয়াবে না।’

এই হিসাব-নিকাশই তেহরানের কূটনৈতিক কৌশলের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। ট্রাম্প বলেছিলেন, গতকাল সোমবারে ইরানের সঙ্গে আলোচনা হবে। কারণ, তিনি হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার চুক্তি অর্জনের আশায় এক আসন্ন হামলা স্থগিত করেছিলেন। তবে তেহরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা চলছে না।

ইরানের এক জ্যেষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, তেহরানের নেতৃত্ব এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে অতীতে নমনীয়তা দেখিয়ে কেবল ওয়াশিংটনের কাছ থেকে আরও বেশি চাপই পেতে হয়েছে। এটি তাদের এই ধারণাকে আরও মজবুত করেছে যে—অর্থপূর্ণ আলোচনা শুরুর আগেই নিজেদের দরকষাকষির সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। সূত্রটি আরও জানায়, তেহরানের মূল্যায়নে—ট্রাম্প যেকোনো ছাড়কে দুর্বলতা হিসেবে দেখেন এবং কেবল চাপের মুখেই প্রতিক্রিয়া জানান।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো মাইকেল সিং বলেছেন, তেহরান মনে করে—তাদের হাতে এখনও উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এর একটি কারণ হলো, সামরিকভাবে তারা কতদূর যাবে সে বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে দ্বিধাগ্রস্ত বলে মনে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘ইরানিরা এই সুবিধাকে কাজে লাগাতে চাইছে। তারা এই প্রণালির ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে এবং এই জলপথে নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে আগ্রহী।’

সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যালান এয়ার বলেন, তেহরান এমন এক প্রতিরোধ কৌশল প্রয়োগ করছে যার লক্ষ্য ওয়াশিংটনকে তাদের অবরোধ তুলে নিতে এবং সামরিক হামলা বন্ধ করতে বাধ্য করা। তিনি বলেন, ‘তারা (ইরান) চায় না যে পরিস্থিতির গতিপথ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারণ করুক।’

এই বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ পরিচালনা ব্যবস্থার বিষয়টি। আঞ্চলিক সূত্রের মতে, ওমান ইরানের কাছে উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থিত একটি প্রস্তাব দিয়েছে—যার মধ্যে স্বেচ্ছাসেবী ব্যবহারকারী ফি বা চার্জ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে তেহরান চায় এই প্রণালির প্রশাসনিক কর্তৃত্ব এবং জাহাজের ওপর পরিষেবা চার্জ বা ফি আদায়ের পূর্ণ ক্ষমতা। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন যেকোনো ধরনের ফি প্রদানের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং হরমুজকে কোনো প্রকার ইরানি নিয়ন্ত্রণমুক্ত এক আন্তর্জাতিক পানিপথ হিসেবে রাখার বিষয়ে অনড় রয়েছে।

ইরানের এই চাল এমন এক পরিণতি তৈরি করেছে যা তাদের কৌশলের যুক্তিকেই ফুটিয়ে তোলে। যেহেতু হুমকি হরমুজ প্রণালি ছাড়িয়ে আরও ছড়িয়ে পড়েছে, আঞ্চলিক ও পশ্চিমা শক্তিগুলো ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর চেয়ে বাণিজ্য পথ এবং জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।

উঠতি সৌদি-নেতৃত্বাধীন সামুদ্রিক জোটটি সেই পরিবর্তনেরই এক বড় উদাহরণ। উপসাগরীয় সূত্রগুলো এটাকে সরাসরি ইরানের মুখোমুখি হওয়ার বদলে বাণিজ্যিক জাহাজকে এস্কর্ট করা, গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি করা এবং সমুদ্রপথ সুরক্ষিত রাখার একটি প্রতিরক্ষামূলক কাঠামো হিসেবে বর্ণনা করেছে। নাইট্স এই প্রচেষ্টাকে লোহিত সাগরে ইউরোপের ‘অ্যাসপাইডস’ (Aspides) মিশনের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা সামরিক ভারসাম্য পরিবর্তনের বদলে কেবল বণিক জাহাজগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

তেহরানের জন্য এই গতিশীলতা এক ধরনের সফলতার প্রতীক। মার্কিন সামরিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি টেক্কা দিতে না পেরেও ইরান সরকার ও নৌবাহিনীগুলোকে কেবল আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে বাধ্য করেই তাদের ওপর বাড়তি খরচের বোঝা চাপিয়ে দিতে পারছে। হরমুজ, বাব এল-মান্দেব (যা লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে) বা অন্য যেকোনো জায়গার প্রতিটি নতুন হুমকি বিশ্ব বাণিজ্য চালু রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।

মূলত, এই লড়াইটি হলো ধৈর্যের এবং সহনশীলতার। ইরানি নেতারা মনে করছেন, বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে বারবার বিঘ্ন ঘটা একটি মার্কিন-নেতৃত্বাধীন জোট যত দিন সহ্য করতে পারবে, অর্থনৈতিক চাপ তারা তার চেয়ে বেশি দিন সহ্য করে টিকে থাকতে পারবে। এই কৌশলের পেছনে একটি কূটনৈতিক উদ্দেশ্যও রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সংকটকে আরও বড় করার সক্ষমতা দেখিয়ে তেহরান যেকোনো সম্ভাব্য আলোচনার শর্তগুলো নিজের মতো করে নির্ধারণ করতে চায়।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ফেলো এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক ইরান বিষয়ক উপদেষ্টা রে তাকেই বলেন, ‘যদি কোনো আলোচনা হয়, তবে শর্তগুলো তারাই নির্ধারণ করবে। উভয় পক্ষই এখন উত্তেজনার জবাবে উত্তেজনা বাড়িয়ে চলেছে।’

তবুও কোনো পক্ষই পিছিয়ে আসতে রাজি বলে মনে হচ্ছে না। ওয়াশিংটন ও তেহরান যেভাবে একে অপরের ধৈর্য ও সংকল্প পরীক্ষা করে চলেছে, তাতে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের জন্য সাজানো এই কৌশল শেষ পর্যন্ত এমন এক সংঘাতের রূপ নিতে পারে যা কারোরই নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।

রয়টার্স থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত