Ajker Patrika

অর্থনৈতিক সংকট যেভাবে গাজার তরুণদের উদ্ভাবক বানাচ্ছে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
অর্থনৈতিক সংকট যেভাবে গাজার তরুণদের উদ্ভাবক বানাচ্ছে
বিপ্লবের প্রতীকী গাই ফকস (Guy Fawkes) মাস্ক পরে পূর্ব গাজার এক তরুণ ফিলিস্তিনি। ছবি: ফ্ল্যাশ ৯০

গাজার ২৪ বছর বয়সী তরুণী হালা মুহাম্মদ আল-মাগরাবি। পড়াশোনা করেছেন নার্সিংয়ে। ২০২৩ সালে স্নাতক শেষ করার পর স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে ইসরায়েলি হামলার মুখে থাকা গাজায় করেছেন নিরলস পরিশ্রম। দুই বছরের নার্সিং পেশায় ধীর-স্থির হওয়ার সময় আসে সর্বশেষ গাজা যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নার্স হিসেবে হালার পথচলা যেন আরও কঠিন হয়ে গেছে। অবশেষে নার্স হালা বেছে জীবিকা নির্বাহে বেছে নেন ভিন্ন এক পথ। শুরু করেন সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং ও ই-কমার্সের কাজ।

ভঙ্গুর ও সমঝোতার এক যুদ্ধবিরতিতে গাজায় ইসরায়েলি আক্রমণের মাত্রা কমলেও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া উপত্যকাটির অধিকাংশ তরুণ বাসিন্দাদের গল্প অনেকটা এরকমই। যুদ্ধ থামলেও তাঁদের সংগ্রাম যেন দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। অবরুদ্ধ এক ধ্বংসস্তূপে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন বুকে নিয়ে তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের লড়াই হয়ে উঠছে ক্রমশই কঠিন। ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখি হয়ে ওঠার কথা যে তরুণদের, তাঁদের শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে অজানা ভবিষ্যতের পথে। কেন না ইসরায়েলের রেখে যাওয়া ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে গাজার অর্থনীতিও।

হালা মুহাম্মদ আল-মাগরাবি আশা করেছিলেন, দুই বছর স্বাস্থ্যখাতে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে বৈতনিক চাকরি পেতে সাহায্য করবে। কিন্তু সেই সুযোগ আর আসেনি। তিনি বলতে থাকেন, ‘স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে করে খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছে না। দাম বেড়েই চলেছে। কোনো নির্দিষ্ট আয় নেই। যা পাই তা দিয়ে মৌলিক চাহিদাগুলোও মেটে না।’

বাধ্য হয়ে গাজার এই সীমিত ওষুধ-সরঞ্জামের স্বাস্থ্যসেবার অতিরিক্ত চাপ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন হালা। যে বিষয়ে পড়াশোনা, যে পথে হাঁটছিলেন সব পেছনে ফেলে এসেছেন তিনি। বেছে নিয়েছেন নতুন এক কর্মসংস্থানের পথ। বর্তমানে তিনি সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং ও ই-কমার্সের মাধ্যমে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সীমিত আয়ের পথ খুঁজে নিয়েছেন হালা।

হালা জানালেন, নার্স হিসেবে স্নাতক শেষ করে হাসপাতালে প্রশিক্ষণ শুরু করার সময় বেশ কিছু ডিজাইনিং কোর্সও করেছিলেন তিনি। নার্সিং ছেড়ে আসার পর সেই খাতে কাজ খুঁজতে শুরু করেন কিন্তু ক্লায়েন্ট পাওয়া বা আয়ের পথ হিসেবে বেছে নেওয়ার সুযোগ হয়নি। এরপর তিনি অন্যের অপেক্ষায় না থেকে নিজের কাজ নিজেই প্রচার করার জন্য মার্কেটিং কোর্স করার সিদ্ধান্ত নেন। মার্কেটিংয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের পর তিনি ই-কমার্স ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে কাজ শুরু করেন।

গাজার এই তরুণী বলতে থাকেন, ‘আমি এই কাজের জন্য পড়াশোনা করিনি বা এটার পরিকল্পনা ছিল না আমার। কিন্তু আয় সীমিত হলেও এটি আমার দৈনন্দিন খরচ মেটাতে সাহায্য করে এবং এই পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে সাহায্য করছে।’

হালার এই অভিজ্ঞতা গাজার একটি বৃহত্তর চিত্রের প্রতিফলন। হালার মতো তরুণ পেশাজীবীদের অর্জিত শিক্ষা এখন আর কর্মসংস্থানের পথ দেখাতে পারছে না। বছরের পর বছর ধরে চলা পুঞ্জীভূত সংকট গাজায় বেকারত্বকে নজিরবিহীন পর্যায়ে নিয়ে গেছে। ফিলিস্তিনি কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় মোট বেকারত্বের হার ৬৯ শতাংশ, যা ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ।

৭০ শতাংশ গাজাবাসীর বয়সই ৩০ বছরের কম। অর্থাৎ উপত্যকাটিতে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর বড় একটা অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী হওয়া সত্ত্বেও উপযুক্ত কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না, যা তাঁদের তীব্র অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।

অন্যদিকে ইসরায়েলের হামলায় অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংসের কারণে গাজার জিডিপি ৮২ শতাংশেরও বেশি সংকুচিত হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এবং আয়ের উৎস হারানোর কারণে প্রায় ৮০ শতাংশ জনসংখ্যা এখন আন্তর্জাতিক ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল।

অর্থনীতির এই ধস কেবল কর্মচারীদের নয়, বরং ব্যবসায়ীদেরও করেছে ক্ষতিগ্রস্ত। খাদ্যপণ্য ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আল-হাজ্জ জানান, গাজা যুদ্ধের কারণে তাঁর ব্যবসা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার গোডাউন, সেখানে থাকা মালামাল সব নষ্ট হয়ে গেছে। আমদানির খরচ বা প্রয়োজনীয় লাইসেন্স জোগাড় করার সামর্থ্যও আমার নেই। বছরের পর বছর ধরে আমি যা গড়ে তুলেছিলাম, তা হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেল।’

তিলে তিলে গড়ে তোলা ব্যবসা চোখের সামনে শেষ হয়ে যাওয়ার পর জীবিকা নির্বাহে বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে শুরু করেন আল-হাজ্জ। তাঁর এলাকা খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়ায় এবং সেখানে মাঝে মাঝে ইন্টারনেট সংযোগ থাকায়, তিনি জায়গার একটি অংশে ওয়ার্কস্পেস তৈরি করেছেন যেখানে ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করা যায়।

আল-হাজ্জ বলেন, ‘সব পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আমি এই জায়গাটি তৈরি করেছি। ছাত্র এবং ইঞ্জিনিয়ারদের পরীক্ষা দেওয়া বা অনলাইনে কাজ করার জন্য এমন একটা জায়গা দরকার ছিল। এটি তাদের জন্য এবং আমার জন্য একটি সমাধান হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

গাজার প্রচলিত কর্মসংস্থান কাঠামো ভেঙে পড়ায় এখন বিকল্প হিসেবে নতুন কিছু উদ্ভাবন করা যেন অনিবার্য হয়ে উঠেছে। গাজাবাসীদের জন্য এসব ব্যক্তিগত সংকটের অপ্রচলিত সমাধান কেবল ধ্বংসস্তূপে টিকে থাকার পথ খুলে দেয়নি, বরং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনর্গঠনের নতুন পথ খুলে দিয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম থমকে গিয়েছিল সে স্মৃতিচারণ করে আবু জায়েদ জেনারেল ট্রেডিং-এর সিইও আহমেদ ফারেস আবু জায়েদ বলতে থাকেন, ‘আমরা যুদ্ধের আগে খুব ছোট একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবসা হিসেবে কোম্পানিটি শুরু করেছিলাম। সীমিত সম্পদ ছিল আমাদের। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট শক্তির চাহিদা মেটানোর জন্য কাজ করছিলাম আমরা। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হলে, জেনারেটরের জ্বালানি সংকটের কারণে আমাদের কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হয়ে যায়।’

সে সময় কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ না করে বিকল্প খুঁজতে শুরু করেছিলেন আবু জায়েদ। যার ফলাফল হিসেবে তিনি খুঁজে পান জ্বালানি উৎপাদনের এক নতুন পদ্ধতি, যা সহজলভ্য উপকরণের ওপর নির্ভরশীল। জায়েদ বলতে থাকেন, ‘আমরা ভাবছিলাম, চারপাশের বর্জ্যকে কীভাবে জ্বালানিতে রূপান্তর করা যায়। এভাবেই আমরা প্লাস্টিকের টুকরোগুলোকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা তৈরি করতে শুরু করি। এটি বেশ কঠিন ছিল, কিন্তু এর পেছনে ছিল সৃজনশীলতা এবং প্রয়োজন।’

আবু জায়েদের এই গল্প বলে দেয়, গাজাবাসী কীভাবে সংকট থেকে উত্তরণে বেছে নিয়ে উদ্ভাবনের পথ। যা তাঁদের খুলে দিয়েছে সীমিত সম্পদে তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে নতুন আয়ের পথ।

প্রজেক্ট ম্যানেজার এবং বিজনেস ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞ মারাম আল-ক্বাররা ব্যাখ্যা করে বলেন, গাজার শ্রমবাজারে এই ধরনের প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি বলেন, ‘গাজার সমস্যা প্রতিভার অভাব নয়, বরং এমন একটি অর্থনৈতিক পরিবেশের অভাব যা এই প্রতিভাগুলো কাজে লাগাতে পারে। এমনকি ছোট প্রকল্পগুলোও সরাসরি কর্মসংস্থান এবং পরোক্ষ সেবা ও উৎপাদন চেইন তৈরির মাধ্যমে বাজারকে গতিশীল করতে পারে।’

মারাম আল-ক্বাররা জোর দিয়ে বলেন, ‘উদ্ভাবন এখন অপরিহার্য। যখন চিরাচরিত চাকরির পথগুলো সামনে থাকে না, তখন উদ্ভাবনই হয়ে ওঠে সুযোগ তৈরি করার একটি মাধ্যম।’

শ্রম বাজারের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে আল-ক্বাররা বলেন, ‘অবরোধ এবং যুদ্ধ স্বাভাবিক কাজের কাঠামো ধ্বংস করে দিয়েছে। যার ফলে তরুণদের বিকল্প পথ খুঁজে নিতে হচ্ছে।’

পুরো গাজার একই চিত্র। অনেক শিক্ষিত তরুণ, এমনকি চিকিৎসক, প্রকৌশলী, নার্সেরাও এখন রাস্তায় নেমে এসেছে উপার্জনের লক্ষ্যে। কেউ বিক্রি করছেন বোতলজাত পানি, কেউ বা আবার সবজি নিয়ে বসে আছেন। কেউ বিক্রি করছেন সেকেন্ড-হ্যান্ড পোশাক। আর এই উপার্জনের পথ উদ্যোক্তা হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে নয়, বরং বেঁচে থাকার প্রয়োজন মেটাতে যেখানে পরিচিত সব পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

গাজার এক তরুণ বলতে থাকেন, ‘আমাদের কোনো কিছু নিজের মতো বেছে নেওয়ার বিলাসিতা নেই। আমাদের চেষ্টা এখন শুরু বেঁচে থাকার।’

তবে এই উদ্ভাবনের গল্প কিন্তু পুরোটাই ইতিবাচক নয়। যেখানে উদ্ভাবন কিছু মানুষের জন্য নতুন পথ খুলেছে, সেখানে জন্ম নিয়েছে চরম হতাশা ও শোষণের সুযোগও। গাজার বাসিন্দা মাহমুদ বলতে থাকেন সেই গল্প। তিনি জানান কীভাবে চাকরি ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাব মানুষকে ঠেলে দিয়েছে অন্ধকার জগতে বা বিপজ্জনক কোনো আয়ের পথে।

মাহমুদ বলতে থাকেন, ‘কোনো সরকারি সহায়তা নেই। এমনকি কোনো নিরাপত্তাও নেই। কোনো নির্দিষ্ট আয়ের সুযোগও নেই। এ অবস্থায় কিছু মানুষ বেঁচে থাকার জন্য অবৈধ পথ বেছে নিচ্ছে। এমন কাজ করছে যা বিপজ্জনক তাঁর এবং অন্যদের জন্যও। এমনকি শোষণের পথও বেছে নিচ্ছে অনেকে।’

গাজায় এখন চড়া সুদে অর্থ ধার দেওয়া এবং মুদ্রা কেনাবেচা বেড়েই চলেছে। মাহমুদ বলেন, ‘কখনো কখনো ৫০ শতাংশেরও বেশি ছাড়ে রেমিট্যান্স নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। এই জরুরি অবস্থার সময় এমন কিছু শোষণই বটে। আর অবস্থার অপব্যবহার বলা চলে একে।’

এমন নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেও আয়ের বিকল্প পথের খোঁজ গাজাবাসীর জন্য আশার আলো বলা চলে। বিদ্যুৎ কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা আবু জায়েদ বলেন, তাঁর বিদ্যুৎ প্রকল্প কেবল নিজের সমস্যার সমাধানই করেনি, বরং কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি করেছে। তরুণদের এমন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিয়েছে যা প্রচলিত চাকরির বাজারে সম্ভব নয়।

আবু জায়েদ আরও বলেন, ‘আমার মনে হয়, সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও, একটি ছোট ধারণা টেকসই প্রকল্পে পরিণত হতে পারে, যা সমাজকে সমর্থন দেয় এবং উৎপাদনশীলতার অনুভূতি ফিরিয়ে আনে।’

আল-জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহ-সম্পাদক ফারহানা জিয়াসমিন

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

‘ভারতীয় ও সাপের সঙ্গে দেখা হলে আগে ভারতীয়কে মারো’, এপস্টেইন নথিতে কূটনীতিকের মন্তব্য

নির্বাচনে ১৬ সংস্থা থেকে ৩৪,৪৪২ জন পর্যবেক্ষক, বিএনপির উদ্বেগ

‘বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে ফেরালে ভারতের বিপক্ষে খেলবে পাকিস্তান’

শবে বরাতের রোজার নিয়ম ও ফজিলত

রুজভেল্ট হোটেল: নিউইয়র্কের কেন্দ্রে ১০০ কোটি ডলারের সম্পদ পাকিস্তানের হাতে এল কীভাবে

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত