Ajker Patrika

১৯ বছর আগের এক নিঃসঙ্গ পেঙ্গুইনে নিজেকে খুঁজে পাচ্ছে নেটিজেনরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
১৯ বছর আগের এক নিঃসঙ্গ পেঙ্গুইনে নিজেকে খুঁজে পাচ্ছে নেটিজেনরা
২০০৭ সালের একটি পেঙ্গুইনের ভিডিও শোরগোল তুলেছে নেটদুনিয়ায়। ছবি: এনডিটিভি

বরফে ঢাকা অ্যান্টার্কটিকা। চারপাশে তুষার আর পাহাড়, আশেপাশে নেই কোনো সঙ্গী, শুধু নিস্তব্ধতা। এরই মাঝে ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে দলছুট এক পেঙ্গুইন। তাঁর গন্তব্য সাগরে নয়, বরং উল্টো দিকে, বরফে ঢাকা পাহাড়ের দিকে।

মাত্র কয়েক সেকেন্ডের এই দৃশ্যই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় তুলেছে। কোটি কোটি ভিউ, অসংখ্য শেয়ার আর হাজারো ব্যাখ্যা। একা পথ বেছে নেওয়া পেঙ্গুইনটির নামও দেয় নেটদুনিয়া, ‘নিহিলিস্ট পেঙ্গুইন’।

এই পেঙ্গুইনের সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেক নেটিজেন। তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে নিজেদের ভাবনা প্রকাশ করছেন ছবি ও ভিডিও বা পোস্টের মাধ্যমেও।

অনেকে মজা করে বলেন, এই পেঙ্গুইন ‘৯টা–৫টা’ চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। কেউ কেউ আবার এটিকে দেখছেন ক্লান্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ আর এক ধরনের নীরব প্রত্যাখ্যানের প্রতীক হিসেবে।

এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পেঙ্গুইন নিয়ে একটি এআই দিয়ে তৈরি ছবি শেয়ার করেন, যা তাঁর গ্রিনল্যান্ড দখলের বিতর্ক উসকে দেয়।

তবে ভাইরাল এই মুহূর্তের গল্প শুরু আজ থেকে প্রায় দুই দশক আগে।

ভাইরাল হওয়া এই ক্লিপটি ২০০৭ সালের জার্মান নির্মাতা ভার্নার হার্জগ পরিচালিত তথ্যচিত্র ‘Encounters at the End of the World’ থেকে নেওয়া। ক্লিপটিতে একটি অ্যাডেলি প্রজাতির পেঙ্গুইনকে দেখা যায় তার উপনিবেশ ছেড়ে একা স্থলভাগের দিকে হাঁটতে।

পেঙ্গুইনদের স্বাভাবিক আচরণ অনুযায়ী, খাবার আর বেঁচে থাকার তাগিদে তাদের যাওয়ার কথা সাগরের দিকে। কিন্তু এই পেঙ্গুইনটি ঠিক উল্টো পথ বেছে নেয়, বরফে ঢাকা, জনমানবহীন পাহাড়ের দিকে।

তথ্যচিত্রে থাকা গবেষক ড. ডেভিড আইনলি জানান, পেঙ্গুইনটিকে যদি জোর করে উপনিবেশে ফিরিয়েও আনা হতো, সে আবার ফিরে গিয়ে একই পথে হাঁটা শুরু করত। ভার্নার হার্জগ এই যাত্রাকে বলেছিলেন ‘ডেথ মার্চ’, কারণ এই পথে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ছিল প্রায় নেই।

কয়েক দিনের মধ্যে সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়। ধারণা করা হয়, পেঙ্গুইনটি প্রায় ৭০ কিলোমিটার পথ একা হাঁটার পর অ্যান্টার্কটিকার দুর্গম এলাকায় মারা যায়।

বৈজ্ঞানিকভাবে এটি বিরল ও অস্বাভাবিক আচরণ হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই দৃশ্য আর কেবল প্রাণীর আচরণের ব্যাখ্যায় আটকে ছিল না। মানুষ এতে নিজের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেতে শুরু করেছে।

কেউ বলেন, পেঙ্গুইনটি পথ হারায়নি, বরং সঙ্গীর মৃত্যুর পর গভীর বিষণ্নতায় ভুগছিল। আবার কেউ বলেন, এটি ছিল এক ধরনের বিদ্রোহ। দল, নিয়ম আর প্রত্যাশার বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ।

চলতি বছরের শুরুর মাসটিতেই এই একা পেঙ্গুইন যেন হয়ে ওঠে ‘কর্মক্ষেত্রের চাপ, মানসিক ক্লান্তি আর আবদ্ধ থাকার’ অনুভূতির মূর্ত প্রতীক। এই একা পেঙ্গুইন হয়ে ওঠে মিমের কেন্দ্রবিন্দু, প্রতিবাদের ভাষা কিংবা নিশব্দের আত্মপ্রকাশ।

একটি ভাইরাল পোস্টে লেখা হয়, ‘আমি একটি পাখি, তবু উড়তে পারি না; তাই আকাশ ছোঁয়ার আশায় পাহাড়ের দিকে এগিয়ে গেছি।’

আরেকটিতে দুই ছবি পাশাপাশি। একটিতে পেঙ্গুইনের উপনিবেশ, অন্যটিতে সে একা। ক্যাপশনে লেখা, ‘ওরা বেঁচে ছিল, সে টিকে ছিল।’

নেটিজেনদের এই ঝড়ে যোগ দেয় চ্যাটজিপিটিও। ‘চ্যাটজিপিটি ট্রিকস’-এর অফিসিয়াল হ্যান্ডলে পোস্ট করা হয় একটি ব্যাখ্যা। সেটি ছড়িয়ে পড়ে নেটদুনিয়ায়। ব্যাখ্যাটি অনেকের পছন্দও হয়।

সেখানে বলা হয়, ‘এই ক্লিপটি অদ্ভুত বলে মানুষ শেয়ার করছে তা নয়; বরং এতে এমন কিছু প্রকাশ্যে এসেছে, যা বহু মানুষ মনে মনে ভাবছিল, কিন্তু প্রকাশ করতে পারছিল না।’

চ্যাটজিপিটির ভাষায়, ‘প্রত্যেকেই সেই মুহূর্তটি চেনে, যখন ব্যাখ্যা দেওয়াই নীরবতার চেয়ে বেশি ভারী লাগে, যখন হিসেব–নিকেশ করে এগোনোর চেয়ে এগিয়ে যেতে পারাটাই বেশি জরুরি মনে হয়।’

আরও বলা হয়, ‘পেঙ্গুইনটি হাঁটে, কারণ থেকে যেতে হলে অভিনয় করতে হতো। আর সে অভিনয় করা ছেড়ে দিয়েছে।’

বরফে ঢাকা অ্যান্টার্কটিকায় হাঁটতে থাকা সেই ছোট পাখিটি জানত না, তার তথাকথিত ‘মৃত্যুযাত্রা’ একদিন কোলাহল থেকে সরে দাঁড়ানোর প্রতীক হয়ে উঠবে। জানত না, বিষাক্ত পরিবেশ ছেড়ে বেরিয়ে আসা কিংবা কম চলা পথ বেছে নেওয়ার সাহসের রূপক হয়ে উঠবে সে।

তাই তো এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে এআই দিয়ে তৈরি একা পেঙ্গুইনের ছবি-ভিডিও, যার সঙ্গে একটাই বার্তা—‘Be the penguin. ’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত