Ajker Patrika

আহারে ইলিশ!

মাসুদ উর রহমান
আহারে ইলিশ!

গত ২৯ সেপ্টেম্বর ‘এখন’ টিভিতে একটি টকশোতে আলোচক হিসেবে ছিলেন ইলিশ বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আনিছুর রহমান এবং সাংবাদিক ও কলামিস্ট হাসান মামুন। মামুন ভাইয়ের যে জিনিসটি আমার ভালো লাগে সেটি হচ্ছে, তিনি একজন রাজনীতি বিশ্লেষক হয়েও কেবল রাজনৈতিক কলামেই সীমাবদ্ধ থাকেন না; প্রতিনিয়ত লেখেন নিত্যব্যবহার্য ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও প্রতিকারবিষয়ক অনেক নিবন্ধ। তাঁদের টকশো আলোচনা থেকে জানলাম যে ইলিশই একমাত্র মাছ, যেটি চাষ করার জন্য খৈল, ভুসি, কুঁড়া অর্থাৎ ফিশ ফিডের কোনো প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় না জলাধার লিজ নেওয়ারও।

অর্থাৎ, প্রাকৃতিকভাবেই এটি উৎপাদন হয় বলে নেই কোনো উৎপাদন খরচ। প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে প্রয়োজন হয় শুধু মৎস্য অধিদপ্তরের নজরদারি। খরচ যেটুকু তা গভীর সমুদ্রে গিয়ে ইলিশ আহরণ ও বিপণনে। অত্যন্ত আনন্দের বিষয় হচ্ছে, মোট আহরিত ইলিশের প্রায় ৯৭ শতাংশ আহরিত হয় বাংলাদেশের জলসীমায়।

২০০৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশে ইলিশের উৎপাদন ৯২ শতাংশ বেড়ে বর্তমানে তা ৬ লাখ টনের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। কেজিতে রূপান্তর করলে দাঁড়ায় প্রায় ৫৮ কোটি ৫০ লাখ কেজি। ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের সংখ্যা বাদ দিয়ে আমাদের মোট জনসংখ্যা যদি ১৭ কোটিও ধরি, তাহলেও মাথাপিছু ইলিশের পরিমাণ হয় প্রায় সাড়ে তিন কেজি! কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, সাড়ে তিন গ্রাম ইলিশও ৯০ শতাংশ মানুষের কপালে জোটে না।

এত উচ্চমূল্যের কারণে গত দুই বছর আমার মতো অনেকেরই ইলিশ কেনার সাহস হয়নি। ভেবেছিলাম ৫ আগস্ট-পরবর্তী বৈষম্যহীন সমাজে ইলিশ মাছ ক্রয়ক্ষমতায়  ফিরবে। সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা খুব বড় গলায় বলেছেন—দেশের ইলিশ দেশেই থাকবে, এবার ইলিশ রপ্তানি হবে না। এই বলা কি দাম কমানোর ইচ্ছে থেকে, নাকি আমরাও পারি এ ধরনের ইঙ্গিত থেকে কে জানে! তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি রপ্তানির পক্ষে। কেননা, ইলিশ রপ্তানিকে পূজা উপলক্ষে প্রতিবেশী দেশের প্রতি একধরনের সৌহার্দ্যও বলতে পারেন।

বাণিজ্য উপদেষ্টাও হয়তো তেমনটি অনুভব করেই ৩ হাজার টন ইলিশ রপ্তানির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রাজনৈতিক মতপার্থক্য যতই থাকুক, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে আমদানি-রপ্তানি তথা যেকোনো ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য প্রতিহিংসা দিয়ে নয়, বরং ভালোবাসা দিয়েই তা অর্জন করতে হবে। নতজানু নীতির কারণে আগের সরকার যেখানে ব্যর্থ হয়েছে, সেখান থেকেই আমাদের শুরু করতে হবে। তা ছাড়া প্রায় ৬ লাখ টনের মধ্যে মাত্র তিন হাজার টন রপ্তানিতে দামের ফারাক যে খুব বেশি হবে না, এটিও তো সহজ হিসাব।

আমার ধারণা, ইলিশ যদি এক কেজিও রপ্তানি না হয়, তাহলেও দাম এমন চড়াই থাকবে। কেন চড়া থাকবে? কারণটাও খুব সোজা। রাজনীতিবিদ, আমলা, ব্যবসায়ী এবং চাকরিতে উপরি-পাওনার সুযোগ আছে এমন পেশাজীবীরাই মূলত ইলিশ কেনার সামর্থ্য রাখেন। তারা এক-দুই কেজি নয়, কেনেন ২০ কেজি, ৩০ কেজি কিংবা মণ হিসেবে। কিছু নিজে খান, কিছু দিয়ে পার্টি দেন। ফলে লাখ লাখ টন ইলিশের শত শত টন ইলিশও বাজারে দৃশ্যমান হয় না। আর হয় না বলেই দাম এমন আকাশছোঁয়া। আহরিত ইলিশের ৫০ ভাগও যদি বাজারে আসত, তাহলে ইলিশে বাজার সয়লাব হয়ে যেত। দামও চলে আসত মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে।

তবে কি ইলিশ সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরেই থেকে যাবে? বছরে এক টুকরো ইলিশ সাধারণের পাতে পড়বে না? উপায় একটা আছে বটে! গরুর মাংসের উচ্চমূল্যের কারণে যে সাধারণ মানুষ কিংবা খুবই নিম্ন আয়ের মানুষ গরুর মাংস খেতে পারত না, তারাও কিন্তু  বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে তথা কোরবানির ঈদে এক-দুই বেলা গরুর মাংস খেতে পারে। ইলিশের ক্ষেত্রেও তেমন একটি উপায় বের করা যায় কি না! অবশ্য ধনিক শ্রেণির মুসলিমরা ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে পশু কোরবানির প্রতিযোগিতায় নামেন অধিক সওয়াবের আশায়। কিন্তু সাধারণদের ইলিশ খাওয়ালে সওয়াব হবে এমন বিধান কি ধর্মে আছে?

তাহলে কী করা? এ বিষয়ে ধর্ম বিশারদদের মতামত নেওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশের জলসীমানায় প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত প্রাণিজ প্রোটিন সমৃদ্ধ অতি সুস্বাদু জাতীয় মাছ ইলিশ সমাজের একটি বড় অংশ ক্রয়ক্ষমতার কারণে খেতে পারে না—এটি নিশ্চয়ই অমানবিক। ধর্ম ন্যায়ের কথা বলে, মানবিকতার কথা বলে। কাজেই সমাজের সকল স্তরের মানুষকে অন্তত এক বেলা ইলিশ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করাটা মানবিক বিবেচনায় হলেও তো সওয়াবের কাজ বলে বিবেচিত হতে পারে।

আরেকটি উপায় অবশ্য আছে। ইলিশের মৌসুম কিন্তু ট্যাক্স দেওয়ার মৌসুম। কর প্রদানে উৎসাহিত করতে সরকার সর্বোচ্চ কর প্রদানকারীকে কর-বাহাদুর উপাধি দিয়ে থাকে। তেমন কিছু কি একটা করা যায়? আমার ধারণা, ব্যতিক্রম বাদ দিলে যাঁরা কর দিয়ে থাকেন, তাঁদের অধিকাংশই কর ফাঁকি দেওয়ারও সুযোগ খোঁজেন। কাজেই সেই সুযোগ তাঁদের করে দেওয়া যেতে পারে অন্যভাবে।

যেমন—যাঁরা বিনা মূল্যে নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে যত টাকার ইলিশ বিতরণ করবেন, তাঁর এক-তৃতীয়াংশ (কোরবানির মতো) টাকার ‘কর রেয়াতের’ সুযোগ তাঁরা পাবেন—এমন ঘোষণা দিলে সরকারের কি খুব ক্ষতি হয়ে যাবে? এর বাইরে যিনি একটি এলাকায় সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষের কাছে ইলিশ পৌঁছে দিতে পারবেন, তাঁকে সেই এলাকার ইলিশবাহাদুর উপাধি দিয়েও নিশ্চয়ই আরও অধিক সামাজিক মর্যাদায় আসীন করা যেতে পারে।

লেখক: কলেজশিক্ষক ও সাংস্কৃতিক কর্মী

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পশ্চিমবঙ্গে গরুসহ সব ধরনের পশু জবাইয়ে নিষেধাজ্ঞা বিজেপি সরকারের

দুদক আইন: কমিশনশূন্যতায়ও দুদক ‘সচল’ রাখতে আইন সংশোধন হচ্ছে

ইরান সংকট সমাধানে সির সহায়তা চান ট্রাম্প, বিনিময়ে কী ছাড়তে হবে

ফরিদপুরে বাসে চাঁদাবাজি, অভিযুক্তদের থানা থেকে ছাড়িয়ে নিলেন বিএনপি নেতা

সাবেক মন্ত্রী মোশাররফের জানাজা ঘিরে নিরাপত্তা বলয়

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত