মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪

সেকশন

 

এমন ঐক্য যদি সব ক্ষেত্রে হতো!

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২৩, ১২:২০

আওয়ামী লীগের নেতারা আবদুস সাত্তার ভূঁইয়ার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ছবি: সংগৃহীত আমাদের জাতীয় ও রাজনৈতিক নানান ইস্যুতে দেশের প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ঐকমত্য দেশবাসীর পরম কাঙ্ক্ষিত হলেও আজ অবধি তা অধরাই রয়ে গেছে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অবস্থা পপগুরু আজম খানের গাওয়া ‘আলাল-দুলাল’ গানের ‘আলাল যদি ডাইনে যায়, দুলাল যায় বাঁয়ে’র মতো। এই ডাইনে-বাঁয়ের কারণে আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু অমীমাংসিত থেকে গেছে। কখনো কখনো বেড়েছে জটিলতা। অবশ্য তিনবার এ দুটি দল ঐকমত্যে পৌঁছেছিল। প্রথমবার ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদ পতন আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে। তা-ও আবার ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ঐক্য এবং তাদের চাপের কারণে বাধ্য হয়ে।

দ্বিতীয়বার ১৯৯১ সালের নির্বাচনে গঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি থেকে সংসদীয় সরকার পদ্ধতিতে প্রত্যাবর্তনের সময়।

আর তৃতীয়বার এ দুটি দল ঐকমত্যে এসেছিল ২০০৭-০৮ সালে ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া কোনো রাজনৈতিক ইস্যুতে আওয়ামী লীগ-বিএনপি একমত হয়েছে, এক সুরে কথা বলেছে, ক্রিয়া করেছে—এমন নজির বিরল। বিএনপি যদি বলে এটা ভালো, তাহলে আওয়ামী লীগ বলবে ওটার মতো খারাপ আর কিছু এই ধরণিতে নেই। আবার আওয়ামী লীগ যেটাকে ভালো বলবে, বিএনপি সেটাকে আখ্যায়িত করবে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট জিনিস হিসেবে। প্রায় ৪৫ বছর ধরে দেশের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা এই দুই দলের পরস্পরবিরোধী অবস্থান আমাদের জাতীয় জীবনের এক বড় ট্র্যাজেডি।

কথায় আছে, ‘যারে দেখতে না’রি তার চলন বাঁকা’। আমাদের এই দুই রাজনৈতিক দলের অবস্থা তার চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। একটি সরকার ক্ষমতায় থাকলে কিছু না কিছু উন্নয়ন ও জনকল্যাণমুখী কাজ করে। কিন্তু সেই উন্নয়নকাজের জন্য বিরোধী দল থেকে সরকারকে সাধুবাদ জানানো হয়েছে—এমন নজির নেই। বরং সরকারের কাজে খুঁত খুঁজে বের করাই যেন বিরোধী দলগুলোর প্রধান দায়িত্ব।

সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা বা সে ধরনের কাজে সহযোগীর ভূমিকা পালন আমাদের বিরোধী দলগুলোর অভিধানে নেই। যখন যারা বিরোধী দলে থাকে, তারাই তখন অবতীর্ণ হয় একই ভূমিকায়। আর সে জন্যই বিএনপি সরকার যেদিন যমুনা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল, দেশব্যাপী হরতাল ডেকেছিল আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে বর্তমান সরকার পদ্মা সেতুর মতো ঐতিহাসিক একটি উন্নয়নকাজ সম্পন্ন করলেও বিএনপি অভিনন্দন জানাতে ব্যর্থ হয়েছে। দল দুটির এই সংকীর্ণতা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক—সন্দেহ নেই। কেননা, ঘুরেফিরে তারাই আমাদের অভিভাবকের সিংহাসনে আরোহণ করে। রাজনৈতিক বৈরিতা তাদের এমন অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়েছে যে, তারা এখন আর পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নেই, পরিণত হয়েছে একে অপরের জানি দুশমনে। তাই কে কাকে কীভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেবে, সেই ভাবনাতেই যেন কাটে তাদের দিনমান। যার ফলে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দুই দল পাটা-পুতার মতো ঘষাঘষি করে আর দফারফা হয় মরিচরূপী জনগণের। অথচ এর বিপরীতও হতে পারত। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মনোভাব হতে পারত খেলোয়াড়সুলভ। কিন্তু তা হয়নি। আর এই না হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ দলীয় সংকীর্ণতা।

 তবে আওয়ামী লীগ-বিএনপির এই চিরবৈরিতার আপাতত অবসান ঘটিয়ে নতুন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। আর তা ঘটেছে একটি উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে; যা আগামী ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের ওই উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপি থেকে সদ্য পদত্যাগী এমপি উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়া। বিএনপির টিকিটে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত উকিল সাত্তার ভূঁইয়ার দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে উপনির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘটনা রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। তিনি কেন পদত্যাগ করলেন, আবার কেনই-বা দল থেকে ইস্তফা দিয়ে উপনির্বাচনে অবতীর্ণ হলেন, সেই সমীকরণ মেলাতে গলদঘর্ম হচ্ছেন অনেকেই। কমবেশি এক বছরের জন্য পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়াকে কেন জরুরি বিবেচনা করলেন উকিল আবদুস সাত্তার, তা অনেকের কাছেই স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে এ ঘটনায় সরকারের ‘রাজনৈতিক খেলা’ রয়েছে বলেও মনে করছেন অনেকে। কেউ কেউ আবার উকিল আবদুস সাত্তারের উপনির্বাচনে অংশগ্রহণকে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগাম মহড়া বলেও মনে করছেন। তাদের মতে, বিএনপি যদি নির্বাচন বয়কট করে, তাহলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বহুসংখ্যক উকিল আবদুস সাত্তারের আবির্ভাব ঘটতে পারে।

তবে সবকিছু ছাপিয়ে যে বিষয়টির প্রতি দেশবাসীর দৃষ্টি আকৃষ্ট ও নিবদ্ধ হয়েছে তা হলো, সব রকম বিভেদ-বিদ্বেষ, বিবাদ-বিসংবাদ এবং বৈরিতা-শত্রুতা ভুলে গিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ সংসদীয় এলাকার বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা একজোট হয়ে উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়ার পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েই ওই আসনে প্রার্থী দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। এটা যে এই উপনির্বাচনী ম্যাচে আবদুস সাত্তার ভূঁইয়াকে ওয়াকওভার দেওয়া, সে কথা ব্যাখ্যা করে বলার দরকার পড়ে না। আওয়ামী লীগের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বলার কিছু নেই। কেননা, প্রতিটি রাজনৈতিক দলই নিজেদের লাভ-লোকসানের হিসাব মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। সে হিসাবে আওয়ামী লীগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উপনির্বাচন বর্জন বিস্ময়কর কিছু নয়। বিস্ময়কর হলো দলটির নেতা-কর্মীদের সাবেক বিএনপি নেতার পক্ষে কাজ করা।  ২২ জানুয়ারি একাধিক দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কোনো প্রার্থী না থাকা সত্ত্বেও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উপনির্বাচন জমে উঠেছে। উপনির্বাচনে অংশ নেওয়া আবদুস সাত্তারকে জেতাতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীরা মাঠে নেমেছেন। তাঁরা এ বিষয়ে একত্রে বৈঠকও করছেন। ২১ জানুয়ারি তেমনি একটি বৈঠক হয়েছে সরাইল উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রফিকউদ্দিন ঠাকুর। তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘সাত্তার ভাই ভালো মানুষ, সৎ মানুষ। তাঁকে বিজয়ী করতে হবে’। তবে তিনি এটাও বলেছেন, এ ব্যাপারে কেন্দ্র থেকে কোনো নির্দেশনা আসেনি। তাঁরা স্থানীয়ভাবেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

রাজনৈতিক কোনো বিষয়ে, বিশেষ করে নির্বাচনের প্রশ্নে বিএনপি-আওয়ামী লীগ এক হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে, তা বর্তমান সময়ে এক অভাবনীয় ব্যাপার বটে। যেখানে নির্বাচন এলে এই দুই দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে যুদ্ধংদেহী মনোভাব পরিলক্ষিত হয়, কোথাও কোথাও বেধে যায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, সেখানে তাঁরা একজোট হয়ে একই প্রার্থীর জন্য কাজ করছেন, তা বিস্ময়করই বটে! আওয়ামী লীগের নেতারা এখন আবদুস সাত্তার ভূঁইয়ার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তাঁকে সৎ এবং ভালো মানুষের সনদও দিচ্ছেন তাঁরা। এক দিক দিয়ে সাত্তার ভূঁইয়া মহাভাগ্যবান, যিনি বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দুই দলের প্রকাশ্য সমর্থন পাচ্ছেন। অথচ গত নির্বাচনের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য, সমঝোতা ও সদ্ভাব দেশবাসীর কাছে চিরকাঙ্ক্ষিত। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, আজও তা সোনার হরিণ হয়েই আছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে যে কৃত্রিম ঐক্য সৃষ্টি হয়েছে, তা খুব বেশি দিন স্থায়ী হবে—এমনটি আশা না করাই ভালো। টার্গেট পূর্ণ হয়ে গেলে তারাই যে আবার তির-ধনুক নিয়ে পরস্পর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাবে, তাতে সন্দেহ নেই। তার পরও ক্ষণিকের জন্য হলেও যে তারা বিভেদ ভুলে কাছাকাছি এসেছে, সেটাই বা কম কিসে! যদিও আশা করা সমীচীন নয়, তার পরও কেউ কেউ বলছেন, আহা, এমন ঐক্য যদি সব ক্ষেত্রে হতো! 

মন্তব্য

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।
Show
 
    সব মন্তব্য

    ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

    পঠিতসর্বশেষ

    এলাকার খবর

     

    কৃষিতে সফল নুরুন্নাহার

    উপজেলা পরিষদ নির্বাচন: বিএনপি-জামায়াত নেতারাও নামলেন ভোটের মাঠে

    ‘স্বেচ্ছামৃত্য়ু’কে উৎসাহিত করে বিশ্ব কোন পথে

    পুতিনের পঞ্চম তারপর...

    আব্রাহাম লিংকন

    স্বস্তির যাত্রা

    ৫ বৈশাখ বর্ষবরণ করবে জবি, বন্ধ থাকবে ক্লাস-পরীক্ষা

    সদরঘাটে লঞ্চের রশি ছিঁড়ে নিহত ৫: আসামিদের জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি

    দর্শকের মন কেড়েছে ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’ 

    সদরঘাটে লঞ্চের রশি ছিঁড়ে নিহত ৫: আসামিদের জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি

    হত্যা মামলায় ট্রান্সকম গ্রুপের দুই কর্মকর্তার জামিন