Ajker Patrika

সমাজে নারীর অবস্থান নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে: সারা হোসেন

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২২: ৫৩
সমাজে নারীর অবস্থান নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে: সারা হোসেন
‘উইমেন, পাওয়ার, অ্যান্ড পলিটিক্যাল অর্ডারস ইন মুসলিম সোসাইটি কনটেক্সটস’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অতিথিরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়বিচারের আন্দোলনে নারীরা প্রায়ই সামনের সারিতে থাকেন। তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সংবিধান প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ ও নতুন প্রতিষ্ঠান গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় তাঁদের অংশগ্রহণ অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত থাকে। রাজনৈতিক রূপান্তরে নেতৃত্ব দিলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায় থেকে নারীরা প্রায়ই বাদ পড়ে যান।

আজ মঙ্গলবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে ‘উইমেন, পাওয়ার, অ্যান্ড পলিটিক্যাল অর্ডারস ইন মুসলিম সোসাইটি কনটেক্সটস’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি), ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এবং উইমেন লিভিং আন্ডার মুসলিম লজ (ডব্লিউএলইউএমএল) যৌথভাবে এই সম্মেলন আয়োজন করে।

সম্মেলনে বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, পাকিস্তান, ফিলিস্তিন, ও সিরিয়ার শিক্ষাবিদ, অ্যাকটিভিস্ট, আইনপ্রণেতা, আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। তাঁরা রাজনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়া, রূপান্তরকালীন ন্যায়বিচার, এবং রূপান্তর-পরবর্তী প্রতিষ্ঠান গঠনে নারীরা কীভাবে ভূমিকা রাখেন এবং কীভাবে সেই প্রক্রিয়াগুলো থেকে তাঁদের প্রায়ই দূরে রাখা হয়, সে বিষয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) অনারারি নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন প্রশ্ন তুলে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নারীদের অধিকার নিয়ে যে প্রাণবন্ত আলোচনা শুরু হয়েছিল, তা থেকে বাস্তবে কতটা পরিবর্তন এসেছে। তিনি বলেন, ‘সমাজে নারীর অবস্থান নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে, নইলে একই পরিস্থিতি চলতেই থাকবে।’

তিনি নারী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন দলের সঙ্গে জোট ও সহযোগিতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন বলেন, রাজনৈতিক রূপান্তরের সময়ে নারীরা যেমন চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখেন, তেমনি নতুন শক্তির উত্থানের ফলে ক্ষতিগ্রস্তও হন। এই পরিসরকে আমরা যদি সুসংগঠিত করতে পারি, তাহলে নারীরা পরিবর্তনের শক্তিশালী কারিগর হয়ে উঠতে পারবেন।

এ বিষয়ে কনকর্ডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অবসরপ্রাপ্ত (Emerita) অধ্যাপক ও ডব্লিউএলইউএমএল-এর নির্বাহী পর্ষদের সদস্য ড. হোমা হুদফার বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ে অর্জিত নারীর অধিকার প্রায়ই খর্ব হয়। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতার তুলনা করে তিনি বলেন, নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার নিয়মকানুন প্রণয়নের সময় নারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। সংবিধানে সমতার স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি তা কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলতে হবে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক এবং ডব্লিউএলইউএমএল-এর নির্বাহী পর্ষদের সদস্য ড. মোনা তাজালি বলেন, একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে জেন্ডার সমতাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। এমন পরিবর্তনের সময়ে আমরা ক্ষমতায় কিছু নারীকে দেখতে পারি, কিন্তু তাঁদের এই অবস্থান সাময়িক এবং অত্যন্ত নাজুক।

দিনব্যাপী সম্মেলনে বক্তারা আলোচনা করেন, কীভাবে নারীরা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের পাশাপাশি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। পাশাপাশি, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ে নারীদের অভিজ্ঞতা ও অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ বলেন, রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণের জন্য আরও স্বচ্ছ ও দৃশ্যমান সুযোগ তৈরি করতে হবে, যেখানে জোরজবরদস্তির কোনো স্থান থাকবে না। আমরা চাই, নারী ও পুরুষ একসঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতা গড়ে তোলায় ভূমিকা রাখুন। শুধু জামায়াতে ইসলামী নয়, সব রাজনৈতিক দলেই আমরা এমন অংশগ্রহণ দেখতে চাই।

সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব জেনারেল এডুকেশনের ডিন ড. সামিয়া হক মুসলিম সমাজে নারীর অগ্রগতির জন্য আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়ে সংহতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, নারীদের ব্যক্তিসত্তার বৈচিত্র্যকে বিবেচনায় নিতে হবে এবং তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া রাজনৈতিক, সামাজিক, ও অর্থনৈতিক শক্তির প্রভাব কাটিয়ে ওঠার সুযোগ দিতে হবে। নারীদের নিজস্ব পছন্দ ও আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে কথা বলার সুযোগ দিলে মুসলিম সমাজে নারী ও পুরুষের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতাগুলোও যথাযথভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।

এই সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, বাংলাদেশ-এর প্রসিকিউটর (সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল) ব্যারিস্টার শাইখ মাহদি, নারীপক্ষের সদস্য সাফিয়া আজিম ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ফিরদৌস আজিম, বিআইজিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ শাহান, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিআইজিডির সিনিয়র ফেলো অব প্র্যাকটিস মাহীন সুলতান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য উমামা ফাতেমা প্রমুখ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত