Ajker Patrika

সবচেয়ে দামি এআই কোম্পানির প্রধান ড্যানিয়েলার পড়াশোনা সাহিত্যে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
সবচেয়ে দামি এআই কোম্পানির প্রধান ড্যানিয়েলার পড়াশোনা সাহিত্যে
৩৯ বছর বয়সী ড্যানিয়েলা আমোদেই এআইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রপিক’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট। ছবি: সংগৃহীত

প্রযুক্তি দুনিয়ায় প্রচলিত শব্দ ‘টেক ব্রো’। সিলিকন ভ্যালির হর্তাকর্তা ‘পুরুষ’ প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের বেলায় এই ‘টেক ব্রো’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়, যাদের হাত ধরে এসেছে অ্যাপল, গুগল (অ্যালফাবেট), ফেসবুক (মেটা), ইন্টেল, এনভিডিয়া, এইচপি ও টেসলার মতো মার্কিন টেক জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। এই ধারণা ভেঙে দিলেন এবার ড্যানিয়েলা আমোদেই নামে এক নারী। শুনলে অবশ্য অবাকই লাগে, তবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রপিক’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট তিনি। আর এর চেয়েও আশ্চর্যের বিষয় হলো, ‘ক্লদ’ এআই মডেলের জন্য পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ এই কর্তার পড়াশোনার বিষয় ছিল সাহিত্য।

৩৯ বছর বয়সী আমোদেইর লক্ষ্য ছিল কেবল পৃথিবীকে আরও সুন্দর করে তোলা। আর সেই লক্ষ্যে এগুতে গিয়ে সাহিত্যের পথ থেকে হয়েছিলেন কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রচারকর্মী। তারপর একেবারে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্ট হয়ে গেলেন।

দ্য প্রিন্ট-এর এক প্রতিবেদনে জানা যায়, গত সপ্তাহে আইপিও-পূর্ব মূল্যায়নে অ্যানথ্রপিকের বাজারমূল্য ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ওপেনএআই-এর চেয়েও বেশি। স্যাম অল্টম্যানের ওপেনএআইয়ের বর্তমান বাজারমূল্য ৮৫২ বিলিয়ন ডলার।

স্ট্যানফোর্ড স্কুল অব বিজনেসে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রসিকতা করে আমোদেই বলেন, “আমার পূর্ব ইতিহাস দেখলে আপনি হয়তো ভাববেন, ‘এই নারী আসলে কোন কাজে দক্ষ?’ ”

তবে কৌতূহলী ও অনুসন্ধিৎসু এই নারী এখন এআই যুদ্ধের সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে। তিনি নিশ্চিত করতে চান, যে কোনো এআই উদ্যোগের ভিত্তি যেন হয় এর ‘নিরাপত্তা’।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান্তা ক্রুজ থেকে ইংরেজি সাহিত্য, রাজনীতি ও সংগীতে স্নাতক সম্পন্ন করেন ড্যানিয়েলা আমোদেই। সংগীতের প্রতি অনুরাগ তাঁকে ‘হাফ-স্কলারশিপ’ও এনে দেয়। ২০০৯ সালে ড্যানিয়েলা যখন সাহিত্য বিভাগ থেকে সদ্য স্নাতক, তখন বিশ্বজুড়ে চলছে চরম অর্থনৈতিক মন্দা। চাকরির বাজার তখন বিপর্যস্ত। সে সময় তাঁর মনে একটি প্রশ্নই ঘুরছিল, ‘কী করা যায়, যা বাস্তবিক উদ্দেশ্য পূরণ করবে এবং যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হবে?’

এরপর আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতে কাজ শুরু করেন ড্যানিয়েলা। উগান্ডাভিত্তিক এনজিও ‘কনজারভেশন থ্রু পাবলিক হেলথ’-এ বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান নিয়ে কাজ করেন তিনি। রাজনীতির মাঠেও অল্প সময় কাটিয়েছেন, কাজ করেছেন ক্যাপিটল হিলের নির্বাচনী প্রচারে।

২০১৩ সালে তিনি সিলিকন ভ্যালিতে যেয়ে আর্থিক লেনদেনের প্ল্যাটফর্ম ‘স্ট্রাইপ’-এ যোগ দেন। প্রতিষ্ঠানটি তখন প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। একজন নিয়োগকর্তা হিসেবে তিনি কর্মী সংখ্যা ৪০ থেকে তিনশর বেশিতে উন্নীত করতে সহায়তা করেন। এ ছাড়া তিনি স্ট্রাইপের ‘রিস্ক ম্যানেজার’ হিসেবে ইঞ্জিনিয়ার, মেশিন লার্নিং বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীদের সঙ্গে কাজ করে প্ল্যাটফর্মটিকে আরও নিরাপদ করে তোলেন।

এর পরই আসে এআই।

স্ট্রাইপে আমোদেইয়ের কাজের মূল জায়গা ছিল ঝুঁকি, জালিয়াতি এবং তা মোকাবিলার নীতিমালা নিয়ে। যখন তিনি ওপেনএআইতে যোগ দেন, তখন তিনি বুঝতে পারেন, এই শক্তিশালী প্রযুক্তি ঘিরে কত ধরনের ঝুঁকি থাকতে পারে। প্রযুক্তি বিশ্বে নিজের জায়গা করে নেওয়া আমোদেই বলেন, ‘শুরুতে পরিভাষাগুলো খুব কঠিন মনে হয়েছিল। তবে আমি যতক্ষণ পর্যন্ত না বিষয়টি বুঝতে পেরেছি, প্রশ্ন করে গেছি।’

নিজে ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল তৈরিতে দক্ষ না হলেও এআইকে নিরাপদ ও নীতিসম্মত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান রাখার সুযোগ ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। আমোদেই বলেন, ‘ভাষা মডেল প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা না থাকলেও অন্যভাবে অবদান রাখার সুযোগ ছিল। এআইকে আরও নিরাপদ ও নৈতিক করার কাজ ছিল সেই পথগুলোর একটি।’

ড্যানিয়েলা আমোদেই ও তাঁর ভাই ডারিও আমোদেই। ছবি: ব্লুমবার্গ
ড্যানিয়েলা আমোদেই ও তাঁর ভাই ডারিও আমোদেই। ছবি: ব্লুমবার্গ

অ্যানথ্রপিকের যাত্রা

২০২০ সালে ড্যানিয়েলা আমোদেই ও তাঁর ভাই ডারিও আমোদেইসহ ওপেনএআই-এর আরও পাঁচজন প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে দেন। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, এমন একটি এআই অবকাঠামো গড়বেন, যেখানে নিরাপত্তা হবে ভিত্তি, পরবর্তী চিন্তা নয়।

২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘অ্যানথ্রপিক’। গ্রিক শব্দ ‘অ্যানথ্রপস’ থেকে নামটি এসেছে, যার অর্থ মানুষ। এই পাবলিক বেনিফিট কর্পোরেশনটি কেবল একটি বুদ্ধিমান চ্যাটবট তৈরি করতে চায়নি, বরং এমন একটি সিস্টেম বানাতে চেয়েছিল, যা নৈতিকতা নিয়ে ভাবতে শিখবে। এরপর ২০২৩ সালে অ্যানথ্রপিক তাদের প্রথম চ্যাটবট ‘ক্লদ’ বাজারে আনে। এরপর থেকে ক্লদ ক্রমাগত আধুনিক হয়েছে এবং গুগল ও আমাজনের মতো প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগে অ্যানথ্রপিক ব্যাপকভাবে বড় হয়েছে।

আমোদেই ‘ক্লদ’-কে স্রেফ উত্তরদাতার বদলে একজন ‘ধৈর্যশীল শিক্ষক’, ‘ব্যক্তিগত অধ্যাপক’ এবং কাজের সহায়ক হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে অন্য চ্যাটবটের সঙ্গে এর মূল পার্থক্য হলো এর প্রশিক্ষণের পদ্ধতিতে।

সাধারণ লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলো (এলএলএম) ‘রিওয়ার্ড’ বা পুরস্কার ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ পায়। অর্থাৎ, সঠিক উত্তরের জন্য পুরস্কার এবং ভুল উত্তরের জন্য তা বাতিল। কিন্তু অ্যানথ্রপিক ক্লদকে এমনভাবে তৈরি করেছে যাতে সে নৈতিকতা নিয়ে ভাবতে পারে। এর প্রশিক্ষণে জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদ এবং অ্যাপলের সার্ভিস টার্মসের মতো নথিগুলো ব্যবহার করা হয়েছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অ্যানথ্রপিক ক্লদের ৮০ পৃষ্ঠার ‘সংবিধান’ প্রকাশ করে, যার উপশিরোনাম ছিল ‘ক্লদের চরিত্র সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি’। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি সিক্সথ স্ট্রিটকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আমোদেই বলেন, ‘আমরা সত্যিই চাই, মডেলগুলো যেন বৃহত্তর নৈতিক কাঠামো বুঝতে পারে। সময়ের সঙ্গে এটি শুধু উত্তরকে আরও নৈতিকই করেনি, বরং এর সামগ্রিক বুদ্ধিমত্তা ও সক্ষমতাও বাড়িয়েছে।’

শীর্ষে ওঠার লড়াই

পৃথিবী ‘রেস টু দ্য বটম’ বা নিম্নমুখী প্রতিযোগিতার কথা জানে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে অনেক সময় মান কমিয়ে ফেলা হয় কিংবা নিয়ম শিথিল করা হয়। কিন্তু আমোদেই এক নতুন ধরনের লড়াই শুরু করতে চান, সেটি হলো ‘রেস টু দ্য টপ’ বা শীর্ষে ওঠার প্রতিযোগিতা। তিনি অ্যানথ্রপিকের নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীলতার গবেষণা সবার সঙ্গে ভাগ করে নিয়ে এমন এক মানদণ্ড তৈরি করতে চান, যা অন্যরাও অনুসরণ করতে পারে। তাঁর মতে, ‘নিরাপত্তা মানে হলো আমরা যে প্রযুক্তি তৈরি করছি, তার জন্য আমূল দায়বদ্ধতা গ্রহণ করা।’

তবে এআইকে নিরাপদ ও নীতিসম্মত করার পথে আমোদেই ভাই-বোনদের কঠোর সিদ্ধান্তও নিতে হয়েছে। যখন মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর অ্যানথ্রপিককে তাদের প্রযুক্তি অবাধে ব্যবহারের নির্দেশ দেয়, তখন তাঁরা তা প্রত্যাখ্যান করেন।

এর ফলে ২০০ কোটি ডলারের একটি চুক্তি বাতিল হয়ে যায়। অ্যানথ্রপিককে ‘সাপ্লাই চেইন রিস্ক’ বা সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যে তকমা চীনের টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে বা রাশিয়ার সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্যাসপারস্কির মতো বিদেশি কোম্পানির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। শুরু হয় আইনি লড়াই।

নিরাপত্তা, এআই ও অ্যানথ্রপিক নিয়ে বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি। সাইবার যুদ্ধের আশঙ্কায় কোম্পানিটি আপাতত তাদের নতুন মডেল ‘মিথোস’ (Mythos) অবমুক্ত করেনি। আমোদেই বলেন, এসব মুহূর্তেই তাঁরা তাঁদের মূল লক্ষ্যের কাছে ফিরে যান।

তিনি বলেন, ‘আমরা যত দ্রুত সম্ভব, এই প্রযুক্তি আপনাদের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। কিন্তু প্রয়োজনীয় সব সুরক্ষা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এটি প্রকাশ করা আমাদের জন্য দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কাজ হবে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোকে প্রায়ই তাদের নেতিবাচক প্রভাবের জন্য সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। তবে আমোদেইর মতে, তখন তারা শুধু দ্রুত বিস্তার নিয়ে ভাবছিল, এর পরিণতি নিয়ে নয়। এআই কোম্পানিগুলোর সামনে এখন উদাহরণ আছে যে প্রযুক্তির যথেচ্ছ প্রসারে কী হতে পারে, তাই তারা এখন আরও ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা সতর্ক থাকব। আমরা এমন এক পৃথিবীর কথা ভাবব যেখানে সবকিছু ঠিকঠাক চলছে, আবার সেই পৃথিবীর কথাও ভাবব যেখানে সবকিছু ভুল হতে পারে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত