Ajker Patrika

উত্তরণ

আবেগের বশে মামলা করার আগে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি যাচাই জরুরি

ব্যারিস্টার ইফফাত গিয়াস আরেফিন
আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯: ৩৪
আবেগের বশে মামলা করার আগে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি যাচাই জরুরি
ছবি: সংগৃহীত

আমার বিয়ে হয়েছে চার মাস আগে। সম্প্রতি জানতে পেরেছি, স্বামীর আগে একবার বিয়ে করেছিল। সেই বিয়ের কথা আমাকে আগে জানানো হয়নি। এমনকি শ্বশুরবাড়ির সবাই বিষয়টি জানলেও তারা আমার পরিবারকে কিছু জানায়নি আগের বিয়ে সম্পর্কে। ফলে আমি এটাও জানি না যে আগের বিয়ে তালাক হয়েছে কি না। আইনি ব্যবস্থা নিতে চাইলে আমাকে কী কী করতে হবে এবং কোন ধরনের বিষয়গুলো গুছিয়ে তারপর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, চুয়াডাঙ্গা

আবেগের ভিত্তিতে মামলা করার আগে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি যাচাই করা জরুরি।

আগের বিয়েটি সত্যিই হয়েছিল কি না এবং সেটি কীভাবে শেষ হয়েছে, তা নিশ্চিত করতে হবে। আগের কাবিননামা বা নিকাহনামার সার্টিফিকেট কপি, বিয়ের তারিখ, সংশ্লিষ্ট কাজি বা নিকাহ রেজিস্ট্রারের তথ্য, ডিভোর্স নোটিশ, তালাকনামা, রেজিস্ট্রেশন রেকর্ড এবং তালাক কার্যকর হওয়ার তারিখ সংগ্রহ করা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ‘তালাক হয়ে গেছে’—এমন মৌখিক বক্তব্যের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।

মুসলিম পারিবারিক আইন, ১৯৬১-এর ধারা ৭ অনুযায়ী তালাক ঘোষণার পর স্থানীয় চেয়ারম্যানকে লিখিত নোটিশ দেওয়ার বিধিবদ্ধ পদ্ধতি রয়েছে এবং স্ত্রীকে তার কপি দেওয়ার বিধান আছে। তাই আপনার বিয়ের তারিখে আগের স্ত্রী আইনগতভাবে স্ত্রী ছিলেন কি না—এটি প্রথমে নির্ধারণ করতে হবে।

যদি আগের বিয়ে আপনার বিয়ের আগেই বৈধভাবে শেষ হয়ে থাকে, তাহলে শুধু আগের বিয়ের তথ্য আপনাকে না জানানোর কারণে সরাসরি বাইগেমি বা দ্বিতীয় বিয়ের মামলা হবে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে আপনাকে বিয়েতে সম্মত করানো হয়েছিল কি না, তা আলাদাভাবে আইনগতভাবে মূল্যায়ন করা যেতে পারে।

অন্যদিকে, আপনার সঙ্গে বিয়ের সময় আগের বিয়ে বহাল থাকলে বিষয়টি গুরুতর। মুসলিম পারিবারিক আইন, ১৯৬১-এর ধারা ৬ অনুযায়ী বিদ্যমান বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় সালিসি পরিষদের আগের লিখিত অনুমতি ছাড়া আরেকটি বিয়ে করার ক্ষেত্রে আইনি বিধিনিষেধ রয়েছে। এমন ক্ষেত্রে শাস্তি এবং পূর্ববর্তী স্ত্রী বা স্ত্রীদের দেনমোহর অবিলম্বে পরিশোধ করার বিধানও রয়েছে।

এ ছাড়া পেনাল কোডের ধারা ৪৯৫ অনুযায়ী, পূর্বের বিয়ের বিষয় গোপন করে পরবর্তী বিয়ে করলে এবং ধারা ৪৯৪-এর প্রয়োজনীয় উপাদান প্রমাণিত হলে শাস্তির বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। তবে মুসলিম বিয়ের ক্ষেত্রে ধারা ৪৯৪/৪৯৫ কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা আগের বিয়ের অবস্থা, পরবর্তী বিয়ের বৈধতা ও অন্যান্য বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। তাই নথি যাচাই ছাড়া সরাসরি ক্রিমিনাল কেস করা ঠিক হবে না।

আপনি যদি বিচ্ছেদ চান, মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯-এর সেকশন ২(iia) গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। স্বামী মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের বিধান লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত স্ত্রী গ্রহণ করলে স্ত্রী বিবাহবিচ্ছেদের ডিক্রি চাইতে পারেন। পারিবারিক আদালতে বিচ্ছেদ, দেনমোহর ও ভরণপোষণের প্রতিকারও পাওয়া যেতে পারে।

তাই এখন আপনার নিজের কাবিননামা, বিয়ের সনদ, বিয়ের প্রমাণ, আগের বিয়ের নথি, তালাকের নথি এবং তথ্য গোপনের প্রমাণ—যেমন হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জার বা যেকোনো মাধ্যমে পাঠানো এসএমএস, ডিক্লারেশন ও সাক্ষীদের তথ্য সংরক্ষণ করুন। কে কী জানত, কখন জানত এবং আপনাকে কী বলা হয়েছিল—এসবের একটি ধারাবাহিক নথি তৈরি করুন।

যেসব বিষয় যাচাই করবেন

আগের বিয়ের তারিখ, তালাকের তারিখ ও বৈধতা, আপনার বিয়ের তারিখ, সালিস পরিষদের অনুমতি এবং তথ্য গোপনের প্রমাণ।

যা করবেন

একজন পারিবারিক আইন ও ফৌজদারি আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে ফৌজদারি অভিযোগ, পারিবারিক আদালতের মামলা, বিবাহবিচ্ছেদ, দেনমোহর বা খোরপোশের মধ্যে উপযুক্ত প্রতিকার নির্বাচন করুন। কোনো ডকুমেন্ট না দেখে এখনই আপনার বিয়েকে ‘অবৈধ’ বা আপনার স্বামীকে নিশ্চিতভাবে বাইগেমির জন্য দায়ী করা ঠিক হবে না।

পরামর্শ দিয়েছেন

ব্যারিস্টার ইফফাত গিয়াস আরেফিন

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত