গাজায় প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। ধ্বংসস্তূপে সন্তানকে বুকে জড়িয়ে কান্না করছেন মা। লাখো মানুষ অবরোধের মধ্যে খাদ্য এবং ওষুধের জন্য লড়াই করছে। এদিকে আরেকটি যুদ্ধ চলছে ডিজিটাল দুনিয়ায়। সেটি অস্ত্রের নয়, এই যুদ্ধের কেন্দ্রে রয়েছে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন—পশ্চিমা নারীবাদ কি সব নারীর জন্য সমানভাবে কথা বলে, নাকি কিছু নারীর জীবন অন্যদের চেয়ে বেশি মূল্যবান?
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যখন হামাস ইসরায়েলে হামলা চালাল, তখন পশ্চিমা বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী নারীবাদী, অধিকারকর্মী ও লেখক নিন্দা জানিয়েছিলেন। কিন্তু এখন গাজায় ফিলিস্তিনি নারী ও শিশুদের ওপর চলমান সহিংসতার বিষয়ে তাঁদের অধিকাংশই চুপ; বরং অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে ‘আত্মরক্ষা’ হিসেবে বৈধতা দিয়েছেন।
একসময় জনমত গড়ে উঠত সংবাদপত্র, টেলিভিশন কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্কে। এখন সেই জায়গার বড় অংশ দখল করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। আর পশ্চিমা বিশ্বের কিছু প্রভাবশালী নারীবাদী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের এমন এক অবস্থানে নিয়ে গেছেন, যেখানে তাঁরা নির্ধারণ করেন—কে ‘প্রকৃত নারীবাদী’ এবং কোন বক্তব্য নারীবাদের গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যে পড়ে।
এখন প্রশ্ন হলো, কেন ফিলিস্তিনি নারীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সহিংসতা একই নৈতিক সংবেদনশীলতা তৈরি করতে পারছে না।
কেউ যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘদিনের দখল, নিপীড়ন বা মানবিক সংকটের কথা উল্লেখ করেন, তাহলে প্রায় একই ধরনের দুটি প্রশ্ন তাঁর দিকে ছুড়ে দেওয়া হয়—
‘আপনি কি হামাসকে সমর্থন করেন?’
‘ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার নিন্দা করেন কি?’
এই প্রশ্নগুলো অনেক সময় প্রকৃত আলোচনার বদলে একধরনের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। কেউ উত্তর না দিলে তাঁকে সন্দেহ করা হয়, আর উত্তর দিলেও নতুন আক্রমণের মুখে পড়তে হয়। এরপর শুরু হয় আরেক ধাপ—ইহুদিবিদ্বেষী, ধর্ষণের সমর্থক, সন্ত্রাসবাদের সহযোগী কিংবা প্রকৃত নারীবাদী নন—এমন নানা অভিধায় চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।
নারীবাদের মৌলিক দর্শন হলো—নারীর অধিকার সর্বজনীন। কিন্তু গাজা যুদ্ধ সেই ধারণার সামনে একটি কঠিন নৈতিক প্রশ্ন এনে দিয়েছে।
যদি একজন ইসরায়েলি নারীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া ন্যায্য হয়, তাহলে একজন ফিলিস্তিনি মায়ের সন্তান হারানোর বেদনা কি কম গুরুত্বপূর্ণ?
গাজায় নারী ও শিশুরা শুধু বোমা হামলার শিকার নয়। তারা একই সঙ্গে অনাহার, চিকিৎসা-সংকট এবং দীর্ঘ অবরোধেরও শিকার। অথচ এই বাস্তবতা অনেক প্রভাবশালী নারীবাদীর আলোচনায় অনুপস্থিত।
সমস্যাটা মূলত এখানেই। পশ্চিমা নারীবাদীরা যুদ্ধকালীন সহিংসতা এবং নারীর ওপর যেকোনো রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও এই গোষ্ঠীগুলোর বড় একটি অংশ ফিলিস্তিনি নারীদের দুর্দশার বিষয়ে রহস্যজনক নীরবতা পালন করছে। এটি মূলত একধরনের জাতিগত পক্ষপাত ও ক্ষমতার রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ। এই নারীবাদীরা কেবল শ্বেতাঙ্গ, পশ্চিমা বা পশ্চিমা-ঘনিষ্ঠ নারীদেরই সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চায় এবং তারা গাজার অনাহার, বাস্তুচ্যুতি এবং বোমা হামলায় জর্জরিত অসহায় নারীদের অধিকারকে অস্বীকার করে।
১৯৪৮ সাল থেকে শুরু হওয়া ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং বর্তমানে গাজার শত শত নারী ও শিশুর প্রাণহানির ঘটনার মুখে মূলধারার পশ্চিমা নারীবাদের এই ভূমিকা প্রমাণ করে, সর্বজনীন মানবিকতার চেয়ে ভূ-রাজনৈতিক সুবিধাই সেখানে প্রাধান্য পাচ্ছে।
পশ্চিমা আধিপত্যবাদী কাঠামোর বাইরে মধ্যপ্রাচ্যে নারীদের লড়াইয়ের ইতিহাস বেশ পুরোনো এবং সমৃদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যের নারীবাদ কোনো হঠাৎ তৈরি হওয়া ঘটনা নয়। আঠারো শতকের শেষ ভাগ থেকে শুরু করে উনিশ শতকের সূচনা পর্যন্ত এটি একটি সম্পূর্ণ নিজস্ব রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছে। অঞ্চলটির নারীবাদ বোঝার জন্য ঔপনিবেশিক শাসন, স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন আন্দোলন ও স্থানীয় সমাজসংস্কারের ইতিহাস জানা প্রয়োজন।
মধ্যপ্রাচ্যের নারীবাদী আন্দোলন মূলত তিনটি প্রধান ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বিকশিত হয়েছে—
» উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদ: মধ্যপ্রাচ্যের প্রারম্ভিক নারীবাদী সংগ্রাম শুধু নারীদের ভোটাধিকার বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল অ্যান্টি-কলোনিয়াল বা ঔপনিবেশিকতাবিরোধী আন্দোলনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। মিসরের হুদা শারাবির মতো অগ্রগামী নারী নেতৃবৃন্দ নারীদের অধিকারকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছিলেন। অর্থাৎ, জাতীয় মুক্তির লড়াই এবং নারীর রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা সেখানে পাশাপাশি চলেছে।
» আইনি ও সামাজিক সংস্কারের আন্দোলন: অটোমান শাসনব্যবস্থার শেষভাগ, ইউরোপীয় ম্যান্ডেট এবং পরবর্তীকালে গঠিত বিভিন্ন রাজতন্ত্রের অধীনে মধ্যপ্রাচ্যের নারী অ্যাকটিভিস্টদের মূল মনোযোগ ছিল শিক্ষার প্রসার ও সামাজিক আইনের পরিবর্তন। বিশেষ করে পার্সোনাল স্ট্যাটাস ল বা পারিবারিক আইন—যেখানে বিয়ে, তালাক, সন্তান লালন-পালন ও উত্তরাধিকারের নিয়ম নির্ধারিত থাকে—সেগুলো সংশোধনের জন্য তাঁরা রাজপথে আন্দোলন ও আইনি লড়াই চালিয়ে গেছেন।
» ইসলামি নারীবাদ: মধ্যপ্রাচ্যের নারী আন্দোলনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো ইসলামি নারীবাদের বিকাশ। সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ বা পশ্চিমা ফ্রেমওয়ার্কের বদলে অঞ্চলটির বহু নারী অধিকারকর্মী ধর্মীয় পাঠ্যের ওপর ভিত্তি করে লৈঙ্গিক সমতা ও ন্যায়ের সপক্ষে তাত্ত্বিক অবস্থান তৈরি করেছেন। তাঁরা ধর্মীয় ও স্থানীয় মূল্যবোধের মধ্য থেকে নারীর অধিকার আদায়ের যুক্তি তুলে ধরেছেন। ফলে এই অঞ্চলের নারী আন্দোলনকে কেবল ‘ঐতিহ্য বনাম আধুনিকতা’র সরল মেরুকরণে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব।
একুশ শতকে এসে মধ্যপ্রাচ্যের নারীবাদী ধারা আরও বিস্তৃত ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন স্বৈরাচারী ও নিপীড়নমূলক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে নারীরাই এখন সামাজিক প্রতিরোধের অগ্রভাগে অবস্থান করছেন। উদাহরণ হিসেবে ২০২২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ইরানের নীতি পুলিশের হেফাজতে ২২ বছর বয়সী মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর তীব্র গণবিক্ষোভের কথা বলা যায়। এই আন্দোলনে নারীদের শারীরবৃত্তীয় স্বাধীনতা, আইনি অধিকার এবং রাজনৈতিক প্রতিবাদ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক বিশাল সামাজিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিল।
পশ্চিমা মূলধারার নারীবাদ প্রধানত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ এবং পশ্চিমা রাজনৈতিক দর্শনের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়, যা অনেক সময় বিশ্বরাজনীতি ও জাতিগত প্রেক্ষাপটকে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের নারীবাদ সমতা আদায়ের পাশাপাশি ঔপনিবেশিক ইতিহাস, স্বৈরাচারবিরোধী লড়াই এবং সামাজিক ও পরিবারকেন্দ্রিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে বিকশিত হয়েছে।
চলমান গাজাসংকট বিশ্বজুড়ে নারীর অধিকার ও মানবিকতার লড়াইয়ে এক বড় আয়না তুলে ধরেছে। এটি একদিকে যেমন পশ্চিমা মূলধারার নারীবাদের নৈতিক সীমাবদ্ধতা ও ভৌগোলিক পক্ষপাতকে উন্মোচন করেছে, তেমনি অন্যদিকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে নারী অধিকারের আন্দোলন শুধু একক পশ্চিমা ছাঁচে আবদ্ধ নয়। গাজার নিপীড়িত নারী থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের রাজপথের নারী—সত্যিকারের নারীবাদীকে সব ধরনের সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবাদ এবং সামরিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে সমভাবে সোচ্চার হতে হবে।
আল জাজিরায় প্রকাশিত লন্ডনের রয়্যাল হলওয়ে ইউনিভার্সিটির শিক্ষক মরিয়ম আল-দোসারির মতামত থেকে অনূদিত।

গ্রিক বংশোদ্ভূত আনাস্তাসিয়া ১৫ বছর বয়সে দাসী হিসেবে ইস্তাম্বুলের তোপকাপি প্রাসাদে আসেন। রূপ ও বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ হয়ে সুলতান প্রথম আহমেদ তাঁকে গ্রহণ করেন এবং নতুন নাম দেন কোসেম। রাজপ্রাসাদে নিজের অবস্থান শক্ত করে ১৬০৫ থেকে ১৬১৭ সাল পর্যন্ত তিনি হাসেকি সুলতান বা সুলতানের প্রিয় স্ত্রী হিসেবে....
২ ঘণ্টা আগে
নারী অধিকারের অন্যতম মৌলিক সনদ বলা হয় সিইডিএডব্লিউ বা সিডওকে। বর্তমানে বিশ্বের ১৮৯টি দেশ জাতিসংঘ ঘোষিত এই সনদে স্বাক্ষর বা সম্মতি দিয়েছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ হাতে গোনা কয়েকটি দেশ এখন পর্যন্ত এই সনদের পূর্ণাঙ্গ অনুমোদন দেয়নি।
২ ঘণ্টা আগে
কায়রোর অদূরে নীল নদের বদ্বীপ এলাকার এক ছোট্ট ঘর। সেখানে এখন নতুন শিক্ষাবর্ষের আবাহন। বাতাসে ভাসছে নতুন বইয়ের গন্ধ। কিন্তু সাত বছরের মেয়ের মা আমাল আবদেল হামিদ, এক অদ্ভুত দোলাচলে দিন গুনছিলেন। দীর্ঘ আট বছর ধরে চলা এক ঘোর অন্ধকার রাত্রির শেষে প্রথমবারের মতো তাঁর চোখে ফুটে ওঠে ভোরের আলো।
৪ ঘণ্টা আগে
কিশোরীদের মাসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেওয়া, সংকোচ ও ভুল ধারণা দূর করা এবং আত্মবিশ্বাসী হয়ে বেড়ে উঠতে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে উত্তরা গার্লস হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘মনের কথা’ শীর্ষক বিশেষ সচেতনতামূলক আয়োজন।
২ দিন আগে