
অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনার সময় নুসরাত জাহান নুহার শরীরে আক্রমণ করে মরণব্যাধি ক্যানসার। যে বয়সে একজন কিশোরীর জীবন এগিয়ে যাওয়ার কথা, সেই সময়ে তাঁর জীবন থেমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। কিন্তু নিজের অদম্য মনোবল আর পরিবারের পাশে থাকার শক্তি তাঁকে ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধে নেমে পড়ার শক্তি জোগায়। ফলে হার মানে ক্যানসার।
সেসব কাটিয়ে নুহা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বি এবং সি; দুটি ইউনিটেই ১০০তম স্থান অর্জন করেছেন। পাশাপাশি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগে ৩২তম এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৭তম স্থান অর্জন করেছেন।
ক্যানসারের নাম অস্টিওসারকোমা
বাবা, মা, তিন বোন ও দুই ভাই নিয়ে নুহার পরিবার। বেড়ে ওঠা পঞ্চগড় সদরের মিঠাপুকুর এলাকায়। বাবা আরমান আলী খান বেসরকারি চাকরি করতেন। নুহা তখন দুরন্ত কিশোরী। হেসে-খেলে মাতিয়ে রাখতেন পাড়া-প্রতিবেশী। একপর্যায়ে অস্টিওসারকোমা নামে ঝুঁকিপূর্ণ হাড়ের ক্যানসার ধরা পড়ে। স্বাভাবিক, চঞ্চল নুহার জীবনে নেমে আসে ঘোর অমানিশা। চিকিৎসকেরা বললেন, ওর পা কেটে ফেলা নিরাপদ। ১৫ বছরের কিশোরীর পা কেটে ফেলতে হবে! অবশ্য পরে চিকিৎসকেরা আলোচনা করে ডান পায়ের টিবিয়া কেটে ফেলে সেখানে প্রায় ১০০ বছর স্থায়িত্বসম্পন্ন একটি প্রস্থেটিক ডিভাইস বসিয়ে দেন। ফলে ওই পা আর কোনো দিন বড় হবে না এবং ভুলভাবে পড়ে গেলে আজীবন হুইলচেয়ার নির্ভর হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকবে নুহার। এখন ক্রাচে ভর দিয়ে চলতে হয়। তা-ও একনাগাড়ে বেশিক্ষণ হাঁটতে বা দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না।
বিভীষিকাময় দিনগুলো
ক্যানসারের চিকিৎসা নুহার জীবনে ছিল এক চরম বিভীষিকা। কেমোথেরাপির ফলে শরীরে এমন কোনো শিরা পাওয়া যাচ্ছিল না, যার মাধ্যমে ক্যানোলা দেওয়া যেতে পারে। মাথার লম্বা ও রেশমি চুল ঝরে যায়। শরীর হয়ে পড়ে দুর্বল, ওজন কমতে থাকে, ঘুম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। প্রায় এক বছর নিয়মিত স্কুলে যেতে পারেননি নুহা; বাড়িতে বসেই চালিয়ে যেতে হয় পড়াশোনা। তবু তাঁর মনোবল ভাঙেনি। ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে পঞ্চগড় সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পান তিনি। এরপর হলিক্রস কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ আসে। কিন্তু ‘সিঁড়ি ভাঙতে না পারার’ বাস্তবতায় হাতছাড়া হয় সেই সুযোগ। হলিক্রসে পড়তে না পারার বেদনা কিছুদিন তাঁকে ভারাক্রান্ত করলেও হতাশাকে বাড়তে দেননি বেশি। পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়ে বোর্ডে ১৭তম স্থান অর্জন করেন নুহা।
মনোবলে ধরেনি চির
পুরো ক্যানসার চিকিৎসার সময় নুহা পড়াশোনা করেন স্কুল ও কলেজে। অন্য শিক্ষার্থীদের মতো নিয়মিত পড়াশোনা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। শরীরে সব সময় কোনো না কোনো সমস্যা লেগে থাকত। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ঘুম পেত খুব।
নুহা বলেন, ‘শরীর অসুস্থ থাকলেও বইয়ের খোঁজ কখনো ছাড়িনি। তবে মাঝেমধ্যে মন খারাপ হতো—আমি পড়তে পারছি না। সেই কষ্ট ছিল নীরব ও গভীর। কিন্তু কখনোই মনোবল হারাইনি।’
বাসায় সব বিষয়ে প্রাইভেট পড়ানোর সামর্থ্য ছিল না নুহার পরিবারের। চিকিৎসার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে; ধারদেনায় পরিবার ছিল জর্জরিত। বাবা আড়ালে চোখের জল ফেললেও পরিবারের কাউকে সেই কষ্ট পেতে দেননি। পরিস্থিতি বুঝে নুহা নিজেই নিজের পড়াশোনার দায়িত্ব নেন। সহজ বিষয়গুলো নিজে পড়তেন, অন্য বিষয়গুলোতে বড় বোনের সাহায্য নিতেন।
স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যেখানে অনেক তরুণ-তরুণীর আজন্ম স্বপ্ন, সেখানে নুহা দুটি ইউনিটে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করেছেন। এ ছাড়া সঙ্গে আছে জাহাঙ্গীরনগর এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ। এই সাফল্যের পেছনে ছিল তাঁর একাগ্রতা, নিষ্ঠা আর অধ্যবসায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সি ইউনিটের পরীক্ষার আগের রাতেও নুহা হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। প্রচণ্ড জ্বর নিয়েও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। অফলাইনে কোচিং করা সম্ভব না হওয়ায় অনলাইনে কোচিং করেই প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি। নিজের এই সাফল্যের জন্য পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন নুহা। বিশেষ করে বড় বোন মণি, বান্ধবী রাদিয়ার অবদান ‘ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়’ বলে জানান তিনি।
পরিবারে ক্যানসারের ছায়া
ক্যানসারের ছায়া শুধু নুহার জীবনেই নয়, ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর পুরো পরিবারে। নিকটাত্মীয়দের অনেকে মরণব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। প্রায় দেড় বছর আগে নুহার মায়ের শরীরেও ক্যানসার ধরা পড়ে; চিকিৎসার অংশ হিসেবে তাঁর ওভারি অপসারণ করতে হয়।
নুহা নিজে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করতে করতেই একের পর এক শোক নেমে আসে পরিবারে। তাঁর চাচাতো বোন ক্যানসারে মারা যান। তার কিছুদিন আগে আরেক চাচাতো ভাই মাত্র ৪৫ বছর বয়সে ব্লাড ক্যানসারে মারা যান। প্রায় এক বছর আগে নুহার এক চাচাও মারা যান একই রোগে। তারও আগে একই রোগে মারা যান তাঁর নানা।
ক্যানসার মানেই জীবন থেমে যাওয়া নয়—নুহা তার জীবন্ত উদাহরণ। তিনি বলেন, ‘জীবনে যে অবস্থাই আসুক না কেন, ধৈর্য ধরে চেষ্টা করে যেতে হবে। অজুহাত দেখিয়ে নিজেকে কোনোভাবে পিছিয়ে রাখা যাবে না।’ নুহার শরীরে এখন কোনো ক্যানসার কোষ নেই বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। এটি আশার আলো নুহার জীবনে। নিজের ও পরিবারের ইচ্ছায় তিনি আইন বিষয়ে লেখাপড়া করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ভবিষ্যতে নুহার জীবনে সাফল্য আসুক, আলো আসুক।

বাসার বাইরে এটাই আমার প্রথম রোজা। আমি এ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। আমার গ্রামের বাড়ি খুলনায়। ঢাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। রমজান মাসে ক্লাস বন্ধ না দেওয়ার কারণে আমি বাড়িতে যেতে পারছি না। কিন্তু আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে, মানসিকভাবে। কখনোই পরিবার ছাড়া এভাবে থাকা হয়নি কিংবা...
২ ঘণ্টা আগে
১৩ দিন আগে সৌদি আরব থেকে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় দেশে ফিরেছিলেন রিজিয়া বেগম (৪০)। হাতে ছিল না পাসপোর্ট বা কোনো পরিচয়পত্র। চিনতে পারছিলেন না কাউকেই। অবশেষে ব্র্যাক অভিবাসন ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রযুক্তির সহায়তায় মিলেছে তাঁর পরিচয়।
১৪ ঘণ্টা আগে
অবশেষে সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরত আসা রিজিয়া বেগমের পরিবারের সন্ধান মিলেছে। দেশে ফেরার ১২ দিন পর আঙুলের ছাপ বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, তাঁর বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার মামদনগর গ্রামে।
১ দিন আগে
প্রবাদ বলে, প্রত্যেক সফল পুরুষের পেছনে একজন নারী থাকেন। এই প্রবল নারী বিরোধিতার যুগেও সেটা দেখা গেল পার্বত্য চট্টগ্রামে। সে অঞ্চলের রাজনীতির আকাশে অনন্য নাম অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান। এই রাজনীতিবিদের এবারের ভূমিধস বিজয়ের পেছনে প্রচ্ছন্ন নয়, একেবারে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আছে তাঁর সহধর্মিণী মৈত্রী...
৬ দিন আগে