Ajker Patrika

পাহাড়ের এক মৈত্রী চাকমা

হিমেল চাকমা রাঙামাটি
পাহাড়ের এক মৈত্রী চাকমা
মৈত্রী চাকমা। ছবি: সংগৃহীত

প্রবাদ বলে, প্রত্যেক সফল পুরুষের পেছনে একজন নারী থাকেন। এই প্রবল নারী বিরোধিতার যুগেও সেটা দেখা গেল পার্বত্য চট্টগ্রামে। সে অঞ্চলের রাজনীতির আকাশে অনন্য নাম অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান। এই রাজনীতিবিদের এবারের ভূমিধস বিজয়ের পেছনে প্রচ্ছন্ন নয়, একেবারে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ আছে তাঁর সহধর্মিণী মৈত্রী চাকমার। বলা চলে এবারের নির্বাচনী যুদ্ধে মৈত্রী ছিলেন দীপেন দেওয়ানের ছায়াসঙ্গী।

শান্তস্বভাবের স্কুলশিক্ষক থেকে মৈত্রীর রাজপথের লড়াকু সৈনিক হয়ে ওঠার এ গল্পটি কেবল দাম্পত্য সম্পর্ক আর রাজনৈতিক আনুগত্যের নয়। বরং চরম প্রতিকূল অবস্থায় এক নারীর ঘুরে দাঁড়ানোর দারুণ এক গল্প।

আয়েশি জীবনের মোহ ত্যাগ করে রাজনীতির কণ্টকাকীর্ণ পথে হাঁটা দীপেন দেওয়ানের বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ ছিল অঢেল। সেই সম্পদ দিয়ে তাঁরা চাইলে অনায়াসেই বিলাসবহুল পরিবেশে আয়েশি জীবন কাটাতে পারতেন, সেটা দেশে হোক বা বিদেশে। কিন্তু দীপেন দেওয়ানের ধমনিতে ছিল রাজনীতি আর জনসেবার নেশা। ২০০৫ সালে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি নিজের নিরাপদ বিচারকের (যুগ্ম জজ) জীবন ছেড়ে রাঙামাটি বিএনপির হাল ধরেন।

নির্বাচনী প্রচারণায় মৈত্রী চাকমা। ছবি: সংগৃহীত
নির্বাচনী প্রচারণায় মৈত্রী চাকমা। ছবি: সংগৃহীত

মৈত্রী চাকমা বলেন, ‘২০০১ সালে যখন ম্যাডাম জিয়া দীপেনকে রাজনীতিতে আসতে অনুরোধ করেন, সে সময় আমিই তাঁকে বাধা দিয়েছিলাম। কারণ সন্তানেরা ছোট ছিল। তাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বাধা দিয়েছিলাম। কিন্তু তার ভেতরে মানুষের জন্য কাজ করার যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা আমি অনুভব করতে পারতাম।’

২০০৮ সাল। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনি জটিলতায় দীপেন দেওয়ান প্রার্থী হতে না পারলে মৈত্রী চাকমা নিজেই ধানের শীষের পতাকা তুলে নেন। চক-ডাস্টার ফেলে তিনি নামেন পাহাড়ের দুর্গম নির্বাচনী ময়দানে। সেবার ৫৬ হাজার ৪২৯ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হলেও তিনি পাহাড়ের মানুষের মনে এক জায়গা করে নেন। কিন্তু এর পরই শুরু হয় কালো অধ্যায়।

একদিকে তৎকালীন সরকারের দমন-পীড়ন, অন্যদিকে দলের ভেতর একশ্রেণির নেতার নোংরা রাজনীতি। সেখানে পিছু হটতে হয় দীপেন দেওয়ানকে। নিজের পেশা বিসর্জন দিয়ে রাজপথের সেনাপতি স্বামীর এই অপমানে দমে না গিয়ে মৈত্রী চাকমা রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

২০১৯ সালে স্কুল থেকে চাপ আসে, শিক্ষকতা করলে স্বামীর রাজনীতি করা চলবে না। মৈত্রী চাকমা দ্বিধা না করে শিক্ষকতার চাকরিকে বিদায় জানান। মৈত্রী বলেন, ‘আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমি হার মানলে দীপেন দেওয়ান নামের মানুষটির স্বপ্ন চিরতরে হারিয়ে যাবে।’ এরপর থেকে শুরু হয় তৃণমূলের ঘরে ঘরে যাওয়া। দলীয় কার্যালয়ে গিয়ে নানা অপমান সহ্য করে কাজ করে যাওয়া।

দুর্গম পাহাড়ের প্রতিটি পাড়ায় গিয়ে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে সুসংগঠিত করার কাজ করেছেন মৈত্রী একাগ্রচিত্তে। এ সময় দীপেন দেওয়ান গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। নার্ভের সমস্যায় তিনি যখন প্রায় অচল হয়ে যাচ্ছিলেন, মৈত্রী চাকমা তখন কেবল স্ত্রী নন, হয়ে ওঠেন এক নিবেদিতপ্রাণ সেবিকা। সিঙ্গাপুরে নিয়ে তাঁর সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। চিকিৎসকেরা যখন দীপেনের দ্রুত উন্নতি দেখতেন, তাঁরাও অবাক হতেন।

মৈত্রী চাকমা জানিয়েছেন, এবারের বিজয়ের খবর শুনে সেই চিকিৎসকেরাও বিস্ময় প্রকাশ করে তাঁকে বলেছেন, ‘তুমি শেষ পর্যন্ত দীপেনকে এমপি করেই ছাড়লে!’

এমন বিভিন্ন ত্যাগের ফসল এই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে দীপেন দেওয়ানের বিজয় কেবল একটি আসনের জয় নয়; এটি দীর্ঘ দুই দশকের নানামুখী লড়াইয়ের বিরুদ্ধে জয়। মৈত্রী চাকমার নিরলস শ্রম আর ত্যাগের কারণে পাহাড়ের সাধারণ মানুষ তাঁদের প্রিয় নেতাকে নির্বাচিত করেছেন।

মৈত্রী বলেছেন, ‘আজ যখন তাঁকে সংসদ সদস্য হিসেবে দেখি, মনে হয় আমাদের সব ত্যাগ সার্থক হয়েছে। পৈতৃক সম্পদ ভোগ না করে তিনি তা মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেছেন। পাহাড়ের মানুষের চোখের এই হাসি আজ আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় বিলাসিতা।’

মৈত্রী চাকমা আজ কেবল একজন সংসদ সদস্যের স্ত্রী নন, তিনি পাহাড়ের নারীশক্তির সেই প্রতীক—যিনি প্রমাণ করেছেন ধৈর্য, সাহস আর পরিশ্রম থাকলে প্রতিকূলতার পাহাড় টপকানো সম্ভব।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত