
আচ্ছা বলুন তো, একজন ভারতীয় ‘চাচা’কে কীভাবে চিনবেন। তাঁকে চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো তাঁর মুখের এক চেনা বাক্য—‘আমাকে বলতে দাও/দিন।’ এর ঠিক পরপরই তিনি একটি লম্বা বক্তব্য দেওয়া শুরু করবেন। তাঁর বক্তব্যের বিষয়বস্তু হবে—দেশের আসলে কোথায় সমস্যা বা কিসের অভাব। তাঁর আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো না চাইতেই উপদেশ দেওয়া। ক্যারিয়ারের থেকে শুরু করে খাদ্যাভ্যাসের নিয়ম পর্যন্ত যেকোনো কিছু হতে পারে তাঁর এই লেকচার।
তাঁরা বলতে পারেন যে মেয়েরা কেবলই সাহিত্য নিয়ে পড়ে কিংবা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে প্রতিদিন পাঁচটা ভেজানো কাঠবাদাম খাওয়া উচিত। তবে ভারতীয় চাচাদের সবচেয়ে বড় ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আজকের তরুণ প্রজন্মের প্রতি সীমাহীন অবজ্ঞা ও বিরক্তি। তাঁদের চোখে আজকের তরুণেরা হলো—ফোনে আসক্ত এবং অলস ফাঁকিবাজ, যাদের কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে রাখা দরকার।
ধর্ম, জাতপাত এবং ভাষার সব দেয়াল ভেঙে ভারতের সব জায়গায়ই এই চাচাদের রাজত্ব। মধ্যবয়সে পা দেওয়ার পরপরই তারা এক অদ্ভুত ও আকাশচুম্বী আত্মবিশ্বাস পেয়ে যান এবং নিজেকে সবজান্তা মনে করতে শুরু করেন। হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের এই ‘চাচাগিরি’র বাণী প্রচার করলেও, সাধারণ চাচাদের ক্ষমতা আসলে কেবল নিজ পরিচিত মহলেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু যে চাচারা পুরো ভারত শাসন করছেন, তাঁদের ক্ষমতার কোনো সীমা নেই। তাঁরা তাঁদের সেই প্রাচীন ও মান্ধাতা আমলের চিন্তাভাবনা পুরো দেশের ওপর চাপিয়ে দেন। ভারত যেন এখন চাচাদের এক প্রজাতন্ত্র—যা চাচাদের দ্বারা, চাচাদের মাধ্যমে এবং চাচাদের জন্যই পরিচালিত; গণচাচাতন্ত্রী ভারত।
আর এই কারণেই এই দেশে এমন সব অদ্ভুত ও শিশুসুলভ নীতিমালা তৈরি হয়। যেমন গুজরাটের সেই পরিকল্পনার কথাই ধরুন, যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক যুগল আইনত বিয়ে করতে চাইলে মা-বাবার অনুমতি বা সই লাগবে। কিংবা গোয়ার সরকারি কলেজের প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক ইউনিফর্মের নিয়ম। অথবা দিল্লির কথা ধরা যাক, যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক তরুণ ১৮ বছর বয়সে ভোট দিতে পারেন, ২১ বছর বয়সে বিয়ে করতে পারেন, কিন্তু ২৫ বছর বয়সের আগে এক গ্লাস বিয়ার খাওয়ার অনুমতি পান না।
একইভাবে ভারতীয়রা উচ্চ আদালতের বিদ্বান বিচারকদের বিভিন্ন মন্তব্যের মুখোমুখি হন, যাঁদের ৮৫ শতাংশেরই বেশি আবার মধ্যবয়সী পুরুষ। ২০২৩ সালে কলকাতা হাইকোর্ট তরুণীদের পরামর্শ দিয়েছিলেন, তাঁরা যেন মাত্র দুই মিনিটের যৌন আনন্দ উপভোগ করার চেয়ে নিজেদের যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। কর্ণাটকের এক বিচারক মন্তব্য করেছিলেন, ১৮ বা ২১ বছর বয়স পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়াটা দেশের জন্য আরও ভালো হবে। আর গত ১৫ মে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি আক্ষেপ করে বলেন—কিছু তরুণ তেলাপোকার মতো, তারা কোনো চাকরি পায় না এবং পেশাগত জীবনেও তাদের কোনো জায়গা নেই।
নেতার কাতারে থাকা প্রধান ‘চাচা’র এই মন্তব্যের ঠিক এক দিনের মাথায়, বোস্টনে থাকা এক ভারতীয় ছাত্র মজা করে একটি রাজনৈতিক দল খুলে বসেন। নাম দেওয়া হয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি বা তেলাপোকা জনতা পার্টি’। খুব দ্রুত ইনস্টাগ্রামে এর ফলোয়ার সংখ্যা ২২ মিলিয়ন বা ২ কোটি ২০ লাখ পার হয়ে যায়। এই সংখ্যা ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির চেয়েও দ্বিগুণের বেশি। এর ফলে তরুণদের মনের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ নিয়ে ইন্টারনেটে আলোচনার বন্যা বয়ে যায়। পরে প্রধান বিচারপতি অবশ্য ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি আসলে ভুয়া ল ডিগ্রিধারীদের কথা বুঝিয়েছিলেন। তবে এর সঙ্গে তিনি এ কথা যোগ করতেও ভুলেননি যে তরুণেরা তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মান করে। তবে তাঁর এই বোঝাপড়া আসলে প্রতিটি চাচারই এক বিভ্রম।
সমালোচনার জবাব দেওয়ার জন্য ভারতীয় চাচাদের ঝুলিতে খুব বেশি অস্ত্র থাকে না। পারিবারিক ক্ষেত্রে তাঁদের একমাত্র কথা হলো, ‘একদম মুখের ওপর তর্ক করবে না বলে দিলাম।’ চাচাদের এই রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্রও ঠিক একই পথ বেছে নিল, তবে এবার সঙ্গে ছিল রাষ্ট্রের ক্ষমতা। দেশের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা একে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ বলে উল্লেখ করল। সরকার এই ‘তেলাপোকাদের’ এক্স অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিল এবং একে ভারতের সার্বভৌমত্বের জন্য এক হুমকি হিসেবে দেখাল। এক বিজেপি নেতা তো এই ‘মিম’কে সীমান্তবর্তী অঞ্চলের এক অপপ্রচার বা ষড়যন্ত্র বলেও আখ্যা দিলেন। ভারতীয় চাচাদের মাথায় এটা কিছুতেই ঢোকে না যে, তরুণদের নিজস্ব বুদ্ধি বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকতে পারে।
চাচারা যে সবকিছু না-ও জানতে পারেন, এটা তাঁরা নিজেরাও বিশ্বাস করতে পারেন না। অথচ ভারতের অর্ধেক জনসংখ্যার বয়স ৩০ বছরের নিচে। প্রতিবছর ভারত ৫ মিলিয়ন বা ৫০ লাখ গ্র্যাজুয়েট তৈরি করে, কিন্তু তাঁদের মধ্যে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ তরুণ নিয়মিত বেতনের চাকরি পান। চাকরি দেওয়ার সুযোগ কেন এত কম, সেই প্রশ্ন কিন্তু চাচারা তোলেন না। তার চেয়ে তরুণদের দোষ দেওয়াটা অনেক বেশি সহজ। কয়েক বছর আগে সাবেক এক সত্তরোর্ধ্ব বিলিয়নিয়ার নারায়ণ মূর্তি তরুণদের সপ্তাহে ৭০ ঘণ্টা কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, ভারতের আরও শক্তিশালী কাজের মানসিকতা প্রয়োজন। তার চেয়ে এক কাঠি ওপরে গিয়ে আরেক কোম্পানির চেয়ারম্যান সপ্তাহে ৯০ ঘণ্টা কাজ করার কথা বলেন এবং প্রশ্ন তোলেন যে বাড়িতে বসে আপনারা কী করেন এবং নিজের স্ত্রীর দিকে আর কতক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায়।
অথচ অনেক তরুণ ইতিমধ্যেই এর চেয়েও বেশি সময় ধরে খাটছে। তারা স্কুল বা ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছে, বাড়তি কোচিং ক্লাসে অংশ নিচ্ছে এবং বাড়ি ফিরে আরও পড়াশোনা করছে। মে মাসে প্রায় ২০ লাখেরও বেশি পরীক্ষার্থী মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার মেডিকেল আসনের জন্য জাতীয় পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। কিন্তু এর ৯ দিন পরেই পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার কারণে পুরো পরীক্ষা বাতিল করে দেওয়া হয়। একই মাসে ১৮ লাখ শিক্ষার্থী দ্বাদশ শ্রেণীর পরীক্ষার রেজাল্ট পায়, যা ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। কিন্তু সেই রেজাল্টও ছিল ভুলে ভরা। এখন একটি সংসদীয় কমিটি এই দুটি কেলেঙ্কারি তদন্ত করে দেখছে। অর্থাৎ, চাচাদের ভুল এখন চাচারাই মূল্যায়ন করবেন।
মা-বাবার চাপ, রাষ্ট্রের জুলুম, সিস্টেমের অযোগ্যতা এবং চাকরির অভাবের মুখে দাঁড়িয়েও এই তরুণেরা যে কেবল একটা সাধারণ মিম বানিয়েই শান্ত আছে, সেটাই এক মস্ত বড় অলৌকিক ঘটনা। প্রতিবেশী দেশ নেপাল, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার তরুণেরা কিন্তু তাদের বয়োবৃদ্ধ নেতাদের সঙ্গে আরও অনেক বেশি কঠোর আচরণ করেছে। তাই ভারতের চাচাদের জন্য একটি না চাওয়া উপদেশ হলো—এই তেলাপোকাদের ইন্টারনেটে একটু আনন্দ করতে দিন, এটা আপনাদের নিজেদের মঙ্গলের জন্যই। আর হ্যাঁ, সকালবেলা আপনাদের সেই পাঁচটা ভেজানো কাঠবাদাম খেতে কিন্তু ভুলবেন না।
অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

বিমানবন্দরের স্ক্যানার ভুলবশত মসলাকে হেরোইন হিসেবে শনাক্ত করায় টানা ৫৭ দিন কারাগারে থাকতে হয়েছে ভারতের এক ব্যবসায়ীকে। পরে আদালত তাঁকে প্রায় ৯ হাজার পাউন্ড ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
৮ দিন আগে
বাংলাদেশে এক অদ্ভুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তারকাকে ঘিরে শোরগোল তৈরি হয়েছে। তবে এই তারকা কোনো অভিনেতা বা গায়ক নয়, বরং সোনালি চুলওয়ালা এক অ্যালবিনো মহিষ। কয়েক দিনের মধ্যেই কোরবানির জন্য জবাই হওয়ার কথা এই মহিষটির। কিন্তু তার আগেই এটিকে একনজর দেখতে আর ছবি তুলতে ভিড় করছেন অসংখ্য মানুষ।
১১ দিন আগে
ঈদুল আজহা এলে প্রতিবছরই বাংলাদেশে একটি ‘ট্রেন্ড’ দেখা যায়, সেটি হলো কোরবানির হাটে তোলা পশুর নামকরণ। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এবার বাজারে এসেছে ‘ট্রাম্প’ ও ‘নেতানিয়াহু’ নামের পশু। আর এই নামকরণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টেও....
১৬ দিন আগে
হাঙ্গেরির রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা হলো। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা জাতীয়তাবাদী নেতা ভিক্টর ওরবানকে পরাজিত করে দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন পিটার ম্যাগিয়ার। গতকাল রোববার হাঙ্গেরির পার্লামেন্ট ভবনের সামনে হাজার হাজার মানুষের উল্লাসের মধ্য দিয়ে এই ঐতিহাসিক অভিষেক...
২১ দিন আগে