Ajker Patrika

এআই মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করবে: কাল্পনিক আতঙ্ক নাকি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
এআই মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করবে: কাল্পনিক আতঙ্ক নাকি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে
খুনি রোবট কতটা বাস্তব। ছবি: স্ক্রিনশট

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আগামী এক দশকের মধ্যে পৃথিবীর ৮৩০ কোটি মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে—প্রযুক্তি খাতেরই একদল বিশেষজ্ঞের এমন চরম সতর্কবার্তায় বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে তোলপাড়। তবে এই ভয়ংকর পূর্বাভাস কতটা বিজ্ঞানসম্মত আর কতটা অনুমাননির্ভর, তা নিয়ে প্রযুক্তিবিদ, কম্পিউটার বিজ্ঞানী এবং আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে গভীর মতভেদ।

সম্প্রতি এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক-এর প্রকৌশলী জেকবস কক্সন পদত্যাগ করে দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানটির তৈরি প্রযুক্তি মানবজাতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এর পরপরই প্রতিষ্ঠানটির গবেষক ইভান হাবিনগার ভবিষ্যদ্বাণী করেন, আগামী ১০ বছরের মধ্যে এআই-এর কারণে মানবজাতি বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকি ১০ শতাংশেরও বেশি।

মেশিন ইন্টেলিজেন্স রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এমআইআরআই) সভাপতি নেট সোয়ার্স বিষয়টিকে আরও ভয়াবহ রূপ দিয়ে বলেন, ‘এটি কোনো অতিশয়োক্তি নয়; বাস্তবে পৃথিবীর শেষ মানুষের শেষ নিশ্বাস ত্যাগের পরিস্থিতির কথা বলা হচ্ছে।’

তবে মূলধারার বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা প্রশ্ন তুলছেন—কম্পিউটার সফটওয়্যার কীভাবে বাস্তব বিশ্বের জটিল সব ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক বাধা অতিক্রম করে শত কোটি মানুষের প্রাণহানি ঘটাবে?

তিন দৃশ্যপট: বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ও বাস্তবতা

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একাংশের তুলে ধরা কাল্পনিক প্রলয়ংকরী দৃশ্যপটগুলোর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পর্যালোচনা করলে বাস্তবতার সঙ্গে নানা ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

জৈব মারণাস্ত্র ও সুপার-প্যাথোজেন

অতিমানবিক ক্ষমতাসম্পন্ন (সুপার ইন্টেলিজেন্ট) এআই কোনো মানুষকে প্রলুব্ধ করে বা স্বয়ংক্রিয় ল্যাব ব্যবহার করে বিশ্বব্যাপী মারাত্মক ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারে।

তবে কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেশিন লার্নিং ও মাইক্রোবায়োলজির অধ্যাপক এরিক সিং এই আশঙ্কাকে ‘নির্দেশিকা ছাড়া লেগো সেটের টুকরো মেলানোর চেষ্টা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, ল্যাবে বসে ভাইরাস তৈরি করা নিখাদ প্রোগ্রামিং নয়; এর জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট তাপমাত্রা, সঠিক রসায়ন ও আণবিক বিন্যাস। এ ছাড়া, রাসায়নিক ও জৈব অস্ত্রের ফর্মুলা ইন্টারনেটে থাকলেও বাস্তব বিশ্বের কড়া আইনি ও সরবরাহ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণের কারণে তা সংগ্রহ বা তৈরি করা প্রায় অসম্ভব।

স্বয়ংক্রিয় কিলার রোবট বাহিনী

স্বয়ংক্রিয় কারখানার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এআই নিজের মতো করে রোবট ও জ্বালানি অবকাঠামো তৈরি করবে এবং মানুষের আদেশ অমান্য করে মানবজাতির ওপর চড়াও হবে।

কিন্তু বাস্তবে স্বয়ংক্রিয় রোবটের প্রযুক্তি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইলন মাস্ক দীর্ঘদিন ধরে ‘অপটিমাস’ রোবটের বাণিজ্যিক উৎপাদনের কথা বললেও সময়সূচি অনুযায়ী লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে বারবার ব্যর্থ হয়েছেন।

পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ

সাইবার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এআই বিশ্বের পরমাণু অস্ত্রাগারগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রগুলো সাধারণ ইন্টারনেট সংযোগ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এবং অতি-সুরক্ষিত ভৌত নিরাপত্তার আওতাধীন। এআই নাউ ইনস্টিটিউটের প্রধান বিজ্ঞানী হেইডি ক্লাফ উল্লেখ করেন, এ ধরনের সুরক্ষিত ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করতে হলে সরাসরি ভৌত ড্রাইভের (যেমন স্টাক্সনেট হামলার ক্ষেত্রে ঘটেছিল) প্রয়োজন হয়, যা কেবল দূরবর্তী কোনো এআই-এর পক্ষে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র রিসার্চ স্কলার হারবার্ট লিন মনে করেন, কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের অনন্য সাফল্য প্রকৌশলীদের মধ্যে এক ধরনের আত্মতুষ্টি ও মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে।

লিন বলেন, ‘কম্পিউটারে কোডিং করে একটি নির্জীব ব্যবস্থার মধ্যে প্রাণ সঞ্চারের যে অভিজ্ঞতা, তা অত্যন্ত প্রবল। ফলে এআই প্রযুক্তি একধাপ এগোলেই তাঁরা সেটিকে সীমাহীন এবং অনিয়ন্ত্রিত ধরে নেন।’

বিজ্ঞানীদের মতে, যে কোনো বৈজ্ঞানিক দাবির প্রধান শর্ত হলো তা পরীক্ষাযোগ্য বা প্রমাণযোগ্য হতে হবে। হেইডি ক্লাফের মতে, ‘পরীক্ষার সুযোগ না থাকলে কোনো দাবিকে ধর্মের বা বিশ্বাসের বিতর্কের বাইরে রাখা যায় না।’

রূপকথা নাকি বাস্তব ঝুঁকি?

সম্প্রতি ওপেনএআই স্বীকার করেছে, তাদের কিছু পরীক্ষাধীন মডেল নিজস্ব সীমাবদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, যাকে তারা ‘মিসঅ্যালাইনমেন্ট’ বলছে। এই ঘটনা ঝুঁকি বাড়ালেও, গবেষকদের মতে কেয়ামতের কাল্পনিক চিত্র নীতি-নির্ধারণে ভুল বার্তা দিচ্ছে।

অধ্যাপক এরিক সিং জোর দিয়ে বলেন, ‘বিজ্ঞান বা আইনি কাঠামোর ক্ষেত্রে আমাদের সরাসরি ভৌত প্রমাণ, পরিমাপযোগ্য ঝুঁকি ও কার্যকারণ সম্পর্কের ওপর নির্ভর করতে হবে। কেবল কল্পকাহিনীর ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক নীতি তৈরি করা যায় না।’

বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, দূরবর্তী কোনো মহাপ্রলয়ের অনুমানের দিকে অতি-মনোযোগ দেওয়ার ফলে এআই-এর বর্তমান বাস্তব ঝুঁকি—যেমন ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়া, কর্মসংস্থান হ্রাস, সাইবার অপরাধ এবং নজরদারি বৃদ্ধি—আড়ালে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত