
চীন এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আমদানি বাজার। চীন থেকে শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, খেলনা ও ভোগ্যপণ্য থেকে শুরু করে বহু ধরনের পণ্য কিনতে বাংলাদেশকে বছরে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হচ্ছে। কিন্তু শতকোটি জনসংখ্যার বাজার সেই চীনেই বাংলাদেশি পণ্য বিক্রি হচ্ছে ১ বিলিয়ন ডলারেরও কম। সোজা ভাষায় বললে, বিশাল অর্থনীতির চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশ ১০০ টাকার পণ্য কিনলে তার বিপরীতে সেখানে বিক্রি করতে পারছে মাত্র প্রায় ৪ টাকার পণ্য। বলা হচ্ছে, উদ্যমহীনতা ও অনিশ্চয়তা নিয়ে আশঙ্কা বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগীদের তুলনায় পিছিয়ে রাখছে।
চীনের বাজারে বাংলাদেশকে প্রায় ৯ হাজার পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালের জুলাই থেকে শূন্য শুল্ক সুবিধা কার্যকর হয়। ২০২৪ সালে এর আওতা আরও বাড়ানো হয়। বাংলাদেশের প্রথাগত রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্য, হিমায়িত মাছ, কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য এই সুবিধার আওতায় রয়েছে। কিন্তু এ সুবিধা কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ।
চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ১০টি খাতের মাত্র ১৮১টি পণ্য শূন্য শুল্কের সুবিধা নিয়ে চীনে রপ্তানি হয়েছে। অর্থাৎ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার যোগ্য সাড়ে ৮ হাজারের বেশি পণ্যের ক্ষেত্রে এখনো সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। এই ফাঁকে বাংলাদেশের জায়গা নিচ্ছে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশ।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, শুল্ক সুবিধা থাকলেই কোনো দেশের বাজার পাওয়া যায় না। এ জন্য প্রথমে প্রয়োজন সরকারের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ আর ব্যবসায়ীদের বাড়তি উদ্যম। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের চীনের বিষয়ে বিদ্যমান অস্বস্তি বা উদ্বেগ কাটিয়ে ওঠা দরকার। তাদের দরকার চীনের বাজার ভালো করে বুঝে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরি, গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—পণ্য বিক্রির জন্য বাজারে উপস্থিত থাকা। এসব জায়গায় বাংলাদেশের অনেক দুর্বলতা রয়ে গেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, ২০১৫–১৬ অর্থবছরে চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানি ছিল ৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ১৮ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক দশকে আমদানি বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ার বদলে বরং কমেছে। গত কয়েক বছরেও রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলারের নিচেই আটকে ছিল। ২০১৫–১৬ অর্থবছরে রপ্তানি ছিল ৮০৮ দশমিক ১৪ মিলিয়ন ডলার। আশ্চর্য শোনালেও সত্যি, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৯৪ দশমিক ৪৯ মিলিয়ন ডলারে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) ও জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তথ্য অনুযায়ী, চীন ২০২৫ সালে আমদানি করেছে ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য। এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশ সহজ করতে ২০২৪ সালে দ্বিতীয় দফায় প্রায় ৯৮–৯৯ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়। কিন্তু তাতে স্পষ্টতই কোনো ফল আসেনি।
এর কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি মো. খোরশেদ আলম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের ব্যবসায়ীদের মধ্যে চীন নিয়ে এক ধরনের ভয় কাজ করে—দেশটি সব পণ্যই তৈরি করে, তাই বাংলাদেশি পণ্য সেখানে বিক্রি হবে না। আবার সরাসরি চীনের বাজারে গেলে অন্য আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অর্ডার কমিয়ে দিতে পারে, এমন আশঙ্কাও কারও কারও রয়েছে।’
এই ‘ভয় ও উদ্যমহীনতা’ কাটাতে বিসিসিসিআই চীনের বড় শপিং সেন্টারের কাছে ২০টি বিক্রয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছে। সেখানে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্য বিক্রির মাধ্যমে আগামী ছয় মাস চীনা ক্রেতাদের চাহিদা ও মনোভাব বোঝার চেষ্টা করা হবে।
চীনের বাজার নিয়ে বাংলাদেশের প্রথাগত ধারণারও পরিবর্তন দরকার বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। একসময় চীনকে শুধু সস্তা পণ্যের উৎপাদক দেশ হিসেবে দেখা হতো। এ দেশে অনেকেই এখনো তেমন ভাবেন। কিন্তু দেশটির মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার মান তুলনামূলকভাবে বেশ দ্রুত বেড়েছে। ফলে ভোক্তাদের চাহিদাতেও পরিবর্তন এসেছে। পোশাক পণ্য রপ্তানিতে শীর্ষে থাকা দেশটির নজর এখন উচ্চমূল্যের ও মানের পোশাকের দিকে। সারা বিশ্বের অনেক দেশে তৈরি দামি বিলাসদ্রব্যের গন্তব্য চীনের বাজার।
বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘চীনের মানুষের জীবনযাত্রার মান বেড়েছে। ফলে সেখানে এখন নতুন ধরনের পণ্যের চাহিদা তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের বড় সমস্যা হচ্ছে, চীনের বাজারে নিজেদের পণ্যের প্রচার ও বিক্রির ব্যবস্থা তৈরি করতে না পারা।’
২০২১ সালে চীন–ভিয়েতনাম দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ছিল প্রায় ১৬৫ বিলিয়ন ডলারের। ২০২৫ সালে তা অনেকটাই বেড়ে ২৫২ থেকে ২৯৬ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে পৌঁছেছে। ভিয়েতনাম তৈরি পোশাক ছাড়াও সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, ফ্ল্যাট প্যানেল ডিসপ্লে, ডেনিম ও সুতি কাপড়, ভারী যন্ত্রপাতি, ফল, রাবার এবং রাসায়নিক দ্রব্যসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করছে। তাদের প্রতিবেশী কম্বোডিয়াও এগিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালে চীন–কম্বোডিয়া দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বেড়ে ১৯ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ভারসাম্যে কম্বোডিয়া বিপুলভাবে এগিয়ে। কারণ সে বছর চীনই কম্বোডিয়া থেকে আমদানি করেছিল ১৮ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। কম্বোডিয়ার রপ্তানিপণ্যের মধ্যে ছিল মূলত ওভেন ও নিট ফ্যাব্রিক, পোশাক, নির্মাণসামগ্রী, যন্ত্রপাতি, প্লাস্টিক ও পরিবহনসামগ্রী।
চীনের সঙ্গে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার সাংস্কৃতিক ও জনগোষ্ঠীগত মিলও বাংলাদেশের তুলনায় বেশি। এটাও তাদের কিছুটা হলেও এগিয়ে রাখছে।
অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জুতা, মাছ ও চিংড়ি, কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং ওষুধে চীনের বাজারে যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের।
সিপিডির গবেষণায় তৈরি পোশাক, মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্য এবং জুতাসহ কয়েকটি খাতে চীনের বাজারে বাংলাদেশের অব্যবহৃত রপ্তানি সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, শুধু কম দামে পণ্য বিক্রি করে টিকে থাকা কঠিন। তাই বাংলাদেশকে পণ্যের মান, নকশা, ব্র্যান্ডিং ও মূল্য সংযোজন বাড়াতে হবে।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘৯৯ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকলেও বাংলাদেশ চীনের আমদানি বাজারের উপযোগী পণ্য তৈরি করতে পারছে না। একই সঙ্গে চীনের বাজারমুখী বিনিয়োগও বাড়ানো যায়নি। রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্যের অভাব একটা বড় সমস্যা।’
চীনের বাজারে বিদেশি পণ্য প্রবেশের জন্য খাদ্য ও কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি বা এসপিএস শর্ত পূরণ গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া রয়েছে চীনের বাজার সম্পর্কে তথ্যের ঘাটতি। বিশাল ভৌগোলিক ও জাতিগত বৈচিত্রপূর্ণ দেশটির কোনো প্রদেশে কোনো পণ্যের চাহিদা বেশি, কী ধরনের প্যাকেজিং ও মান প্রয়োজন, বিপণন কীভাবে হবে—এসব বিষয়ে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের অনেকেই পর্যাপ্ত তথ্য রাখেন না।
ভাষাও একটি বড় বাধা, যা চীনা ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করে। অথচ স্থানীয় পরিবেশক, গুদাম ও বিপণনব্যবস্থা না থাকলে চীনের বাজারে টিকে থাকা কঠিন হবে।
রিশোরিং ইনিশিয়েটিভ ও কার্নির গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে চীন থেকে উৎপাদন সরিয়ে নেওয়ার অন্তত ২৪৪টি করপোরেট সিদ্ধান্ত নথিভুক্ত হয়েছে। এর বড় অংশ গেছে ভিয়েতনাম, ভারত, মেক্সিকো, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান ও যুক্তরাষ্ট্রে। চীনা বিনিয়োগ আনতে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বিশেষ অর্থনৈতিক জোন করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানে বিনিয়োগ বাড়তে হবে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থনীতি বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)-এর চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বাংলাদেশকে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর পাশাপাশি চীনা বিনিয়োগ আনতে হবে। চীনা উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে কারখানা করে তৈরি পণ্য নিজেদের দেশসহ অন্যান্য দেশে রপ্তানি করলে আমাদের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়বে।’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো. ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কেন বাড়ছে না, তা খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশ ও চীন যৌথ গবেষণা প্রকল্প নিয়েছে। ওই গবেষণার প্রতিবেদন পাওয়ার পর সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশিদের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন তথ্যমতে, চলতি বছর জুলাইয়ে বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ডধারীরা বিদেশে মোট ৫২৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা খরচ করেছেন।
২ ঘণ্টা আগে
ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক পিএলসির (এনসিসি ব্যাংক) ১২ তম বিশেষ সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় ব্যাংকের সংঘবিধির ধারা ১০৮ (১) সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদিত হয়...
৪ ঘণ্টা আগে
মোবাইলে আর্থিক সেবাদানের ক্ষেত্রে অপরাধ শনাক্তকরণ, নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের লক্ষ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস নগদ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের ডিস্ট্রিবিউটরদের মধ্যে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধবিষয়ক (এএমএল) একটি কর্মশালা সম্পন্ন করেছে...
৪ ঘণ্টা আগে
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ৪৩তম বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জহির হোসেন এতে সভাপতিত্ব করেন।
৪ ঘণ্টা আগে