Ajker Patrika

প্রযুক্তি ও পুঁজি: নিয়ন্ত্রণ, সুবিধা ও মালিকানা কার হাতে

আব্দুর রহমান, ঢাকা
প্রযুক্তি ও পুঁজি: নিয়ন্ত্রণ, সুবিধা ও মালিকানা কার হাতে
বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ মানুষের স্বার্থ বা জনকল্যাণের চেয়ে মুনাফাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি।

প্রযুক্তি দুনিয়ায় একটি বড় প্রশ্ন হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহৃত হবে, নাকি বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এটিকে মুনাফা ও নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে? বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় অনেকের মতে উত্তরটি স্পষ্ট—বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ মানুষের স্বার্থ বা জনকল্যাণের চেয়ে মুনাফাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো ওপেনএআই। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি অলাভজনক সংস্থা হিসেবে ‘মানবতার কল্যাণে নিরাপদ এআই’ স্লোগান নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল এটি। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে ওপেনএআই কার্যত লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। মাইক্রোসফটের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইতে বিনিয়োগ করে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ২৭ শতাংশ মালিকানা অর্জন করেছে, যার আনুমানিক মূল্য ১৩৫ বিলিয়ন ডলার। এই পরিবর্তন দেখাচ্ছে, এআইয়ের জনকল্যাণমূলক সম্ভাবনার চেয়ে মুনাফাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের সাম্প্রতিক প্রস্তাব একটি ভিন্ন পথের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ বছরের জুন মাসে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি একটি ‘এআই সার্বভৌম সম্পদ তহবিল’ গঠনের প্রস্তাব দেন। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক ও এক্সএআইয়ের মতো বড় এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের ৫০ শতাংশ এককালীন কর হিসেবে সরকারি তহবিলে স্থানান্তর করা হবে।

স্যান্ডার্সের ধারণা হলো, এই তহবিল থেকে অর্জিত আয় সরাসরি মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে বিতরণ করা হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও আবাসন নিশ্চিত করার মতো সামাজিক খাতে ব্যয় করা হবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘ভবিষ্যৎকে কে মালিকানায় রাখবে এবং নিয়ন্ত্রণ করবে? এর সুফল কে পাবে, আর ক্ষতির শিকারই-বা কে হবে?’ তাঁর যুক্তি, এআই থেকে আসা সম্ভাব্য ট্রিলিয়ন ডলারের মুনাফা শুধু বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের আরও ধনী করার জন্য ব্যবহার হওয়া উচিত নয়; বরং তা সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজে লাগানো উচিত।

স্যান্ডার্স ও কংগ্রেসম্যান রো খান্না চলতি বছরের মার্চে ‘মেক বিলিয়নিয়ার্স পে দেয়ার ফেয়ার শেয়ার অ্যাক্ট’ নামের একটি প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেসে উত্থাপন করেন। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ৯৩৮ জন বিলিয়নিয়ারের ওপর বার্ষিক ৫ শতাংশ সম্পদ কর আরোপের কথা বলা হয়েছে। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, এই কর থেকে ১০ বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার রাজস্ব আদায় সম্ভব। সেই অর্থ ব্যবহার করা হবে সরকারি স্কুলশিক্ষকদের ন্যূনতম ৬০ হাজার ডলার বেতন নিশ্চিত করা, মেডিকেয়ার কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং শিশু পরিচর্যার ব্যয় সীমিত করার মতো সামাজিক কর্মসূচিতে।

তবে স্যান্ডার্সের এআই তহবিল প্রস্তাব বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের আইনি বাধা রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাধা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর ‘টেকিংস ক্লজ’। এই ধারায় বলা হয়েছে, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ছাড়া ব্যক্তিগত সম্পত্তি জনস্বার্থে অধিগ্রহণ করা যাবে না।

অনেক বিশ্লেষকের যুক্তি, এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর ৫০ শতাংশ শেয়ার সরকারকে হস্তান্তরের প্রস্তাবটি কার্যত ব্যক্তিগত সম্পত্তি অধিগ্রহণের শামিল। অথচ এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা হয়নি। ফলে এটি মার্কিন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাও এই প্রস্তাবের পথে বড় বাধা। স্যান্ডার্স বর্তমানে সিনেটে সংখ্যালঘু অবস্থানে রয়েছেন। ফলে তাঁর প্রস্তাব আইনে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সম্ভাবনাও রয়েছে।

আইনি বাধা ছাড়া আরেকটি বড় দিক হলো মার্কিন প্রশাসনে প্রযুক্তি খাতের লবিং। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে শীর্ষ ১১টি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান লবিংয়ের পেছনে প্রায় ২ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক যথাক্রমে প্রায় ১০ লাখ ২০ হাজার এবং ১৫ লাখ ৬০ হাজার ডলার লবিংয়ে ব্যয় করেছে। ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক, মাইক্রোসফট এবং এনভিডিয়া মিলিয়ে ওয়াশিংটনে মোট ৩০৭ জন লবিস্ট নিয়োজিত রয়েছে। সহজ হিসাবে, গড়ে প্রতি দুজন কংগ্রেস সদস্যের বিপরীতে একজন লবিস্ট নিয়োগ করে রেখেছে প্রতিষ্ঠানগুলো।

সব মিলিয়ে বর্তমান বাস্তবতা হলো, এআই খাত থেকে উৎপন্ন বিপুল অর্থনৈতিক মূল্য মূলত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতেই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। তবে স্যান্ডার্সের প্রস্তাব জানাচ্ছে, ভিন্ন ধরনের নীতিমালা ও সরকারি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এই সম্পদের একটি অংশ সাধারণ মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করার ধারণাও আছে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক ও আইনি পরিস্থিতিতে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোই এখনো এআই খাতের নিয়ন্ত্রণ ও মুনাফার প্রধান সুবিধাভোগী এবং জনকল্যাণমূলক ব্যবহারের প্রশ্নটি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্ক হিসেবে তুলে রাখা আছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত