Ajker Patrika

কম্পিউটার গেম, যুদ্ধ ও প্রোপাগান্ডা: ইসরায়েলে ইরানের আক্রমণ নিয়ে গেম বানানো ইস্যুতে বিতর্ক

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২৬, ১৫: ১৯
কম্পিউটার গেম, যুদ্ধ ও প্রোপাগান্ডা: ইসরায়েলে ইরানের আক্রমণ নিয়ে গেম বানানো ইস্যুতে বিতর্ক
কল অব ডিউটি: মডার্ন ওয়ারফেয়ারের একটি দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

জনপ্রিয় ভিডিও গেম সিরিজ কল অব ডিউটির এক সহপ্রতিষ্ঠাতা বলেছেন, প্রকাশক অ্যাকটিভিশন ব্লিজার্ড ‘ইরান ইসরায়েল আক্রমণ করছে’—এমন একটি গেম বানানোর জন্য ডেভেলপারদের জন্য ‘চাপ’ দিয়েছিল। তবে কল অব ডিউটির কর্মকর্তারা এই চাপ প্রত্যাখ্যান করেন।

লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের খবরে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একাধিক পোস্টে চ্যান্স গ্লাসকো বলেন, এই চাপ ডেভেলপারদের ‘স্তম্ভিত’ করেছিল এবং তারা ধারণাটি প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ, এটি ‘অ্যাকটিভিশনের পক্ষ থেকে চাপিয়ে দেওয়া রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা’ বলে মনে হয়েছিল।

কিছুদিন আগে হোয়াইট হাউসের অফিশিয়াল এক্স অ্যাকাউন্ট একটি ভিডিও মন্তাজ প্রকাশ করে। সেখানে ইরানে মার্কিন সামরিক হামলার দৃশ্য দেখানো হয়। এই ভিডিওতে এমন গ্রাফিকস ব্যবহার করা হয়, যা কল অব ডিউটির অ্যানিমেশন স্টাইলের অনুকরণ। এর পরপরই কল অব ডিউটির তরফ থেকে এমন বিষয় সামনে এল।

মন্তাজে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং মার্কিন হামলায় ইরানি অস্ত্রভান্ডার ধ্বংস হয়ে বিস্ফোরণ ঘটছে। ভিডিওটির প্রতিক্রিয়ায় গ্লাসকো লেখেন, ‘এতে আমি অবাক নই। রেসপন এন্টারটেইনমেন্ট গঠনের পর অ্যাকটিভিশন দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আমাদের ওপর খুব অস্বস্তিকর চাপ ছিল, যাতে পরবর্তী কল অব ডিউটির গল্প হয় ইসরায়েলে ইরানি আক্রমণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভাগ্যক্রমে আমাদের অধিকাংশ ডেভেলপার এই ধারণায় ঘৃণা বোধ করেছিলেন এবং বিষয়টি বাতিল হয়ে যায়।’ তিনি নির্দিষ্ট কোনো তারিখ উল্লেখ করেননি। তবে ইনফিনিটি ওয়ার্ডে তাঁর সহপ্রতিষ্ঠাতারা অ্যাকটিভিশনের সঙ্গে সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে ২০১০ সালে চাকরি হারান এবং পরে রেসপন এন্টারটেইনমেন্ট প্রতিষ্ঠা করেন। গ্লাসকো অবশ্য কোম্পানিতেই থেকে যান।

কল অব ডিউটি সর্বকালের সবচেয়ে লাভজনক ভিডিও গেম ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর একটি। ২০০৩ সালে প্রথম প্রকাশের পর থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এই সিরিজ প্রকাশকদের জন্য ৩১ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেছে। এই ফ্র্যাঞ্চাইজিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ঠান্ডা যুদ্ধ, ভবিষ্যতের সংঘাত এবং বিকল্প বাস্তবতার যুদ্ধসহ নানা প্রেক্ষাপটের গেম রয়েছে।

ভক্তরা উচ্চগতির অ্যাকশন, চমকপ্রদ গ্রাফিকস ও সিনেম্যাটিক উপস্থাপনার জন্য সিরিজটির প্রশংসা করলেও সমালোচকদের মতে এটি যুদ্ধকে তুচ্ছ করে দেখায়। যেকোনো সময় গড়ে প্রায় ৪৫ হাজার মানুষ অনলাইনে এই সিরিজের কোনো না কোনো গেম খেলে।

ইরান-ইসরায়েল সংঘাত কখনো সিরিজের মূল কাহিনি না হলেও ২০২২ সালের কল অব ডিউটি: মডার্ন ওয়ারফেয়ার-২তে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের বিশেষ শাখা কুদস ফোর্সকে দেখানো হয়। গেমটিতে জেনারেল ঘোরবরানি নামের এক চরিত্রকে হত্যা করা হয়, যিনি ইরানি কমান্ডার কাসেম সোলাইমানির আদলে তৈরি। ২০২০ সালে বাগদাদে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সোলাইমানি নিহত হন।

সিরিজের অন্যান্য গেম সাধারণত রুশ অতিরাষ্ট্রবাদী গোষ্ঠী বা তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ ঘিরে নির্মিত। এক সমালোচক প্রশ্ন করেন, গ্লাসকো কেন ইরান-ইসরায়েল কাহিনি নিয়ে আপত্তি তুলেছেন, কিন্তু সিরিজে অন্য সংঘাত নিয়ে আপত্তি করেননি। জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার বক্তব্য হলো, সরকার বড় ইস্যুতে জনমত প্রভাবিত করতে বিনোদন মাধ্যম, এমনকি ভিডিও গেমও ব্যবহার করতে দ্বিধা করবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘বহু (মার্কিন) প্রশাসন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য দশকের পর দশক চাপ দিচ্ছিল। আপনি যে পরিস্থিতিগুলোর কথা বলেছেন, সেগুলো ততটা নয়।’

যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে বিনোদন মাধ্যম ব্যবহার করে যুদ্ধকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করেছে এবং তা নিয়োগ প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করেছে। টপ গান (১৯৮৬) সিনেমাটি টম ক্রুজের ক্যারিয়ারের বড় মোড় ঘোরানোর পাশাপাশি সামরিক বাহিনীতে নিয়োগও ব্যাপক বাড়িয়ে দেয়। ধারণা করা হয়, এই চলচ্চিত্রের কারণে মার্কিন নেভিতে নিয়োগ ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল।

ভিডিও গেম শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তরুণদের কাছে সামরিক জীবনের আকর্ষণ তুলে ধরার ক্ষেত্রে গেম অনেকটা চলচ্চিত্রের জায়গা দখল করেছে। ২০২৪ সালের দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মেমফিসের একটি নৌঘাঁটিতে দায়িত্ব পালনরত মার্কিন নাবিকেরা গেম খেলতেন, যাতে গেমপ্রেমীদের মধ্যে নিয়োগে আগ্রহ তৈরি হয়।

মার্কিন সেনাবাহিনী নিজেও গেম তৈরি করেছে। ২০০২ সালে প্রকাশিত আমেরিকাস আর্মির লক্ষ্য ছিল যোগদানের আগে খেলোয়াড়দের সামরিক জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার ধারণা দেওয়া। তবে গেমিং শিল্প ও সামরিক বাহিনীর সম্পর্ক শুধু নিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অগ্রাধিকারের প্রসারেও ভূমিকা রাখে। ২০২২ সালে সাংবাদিক ও গবেষক অ্যালান ম্যাকলিওড ‘মিলিটারি-এন্টারটেইনমেন্ট কমপ্লেক্স’ নিয়ে লেখেন এবং পেন্টাগন ও গেম ডেভেলপারদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তুলে ধরেন।

তথ্য অধিকার আইনের আওতায় পাওয়া নথির উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি ২০১৮ সালে ফ্লোরিডার একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে অ্যাকটিভিশন কর্মকর্তাদের সফরের কথা উল্লেখ করেন। সেখানে তাদের ‘স্পেশাল ট্যাকটিক্স এয়ারম্যান’ এবং আকাশ থেকে স্থল হামলার সক্ষমতা নিয়ে সরাসরি অভিজ্ঞতা দেওয়ার আয়োজন করা হয়।

এক কর্মকর্তা এই সফরকে ‘শিক্ষা দেওয়ার চমৎকার সুযোগ’ হিসেবে বর্ণনা করেন, যাতে অংশগ্রহণকারীরা ‘আমাদের জন্য আরও বিশ্বাসযোগ্য সমর্থক’ হয়ে ওঠেন।

এই বিনিময় শুধু একমুখী নয়; যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও গেম শিল্পে কাজ নিয়েছেন। ২০২১ সালের এক উদাহরণে অ্যাকটিভিশন সাবেক বুশ প্রশাসনের কর্মকর্তা ফ্রান্সিস টাউনসেন্ডকে কমপ্লায়েন্স প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়। টাউনসেন্ড যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি ২০০৯ সালে সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওয়াটারবোর্ডিংসহ নির্যাতন পদ্ধতির ব্যবহারকে সমর্থন করেন।

তাঁর দাবি ছিল, ‘সীমিত পরিস্থিতিতে এসব কৌশল সন্ত্রাসী হামলা ঠেকাতে কার্যকর হতে পারে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

হাদি হত্যা: ফয়সালদের সীমান্ত পার করা ফিলিপ সাংমার স্বীকারোক্তিতে নতুন তথ্য

সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন: সময় শেষ, এখন কী হবে

প্রাকৃতিক দুর্গ ইরান কেন দুর্জেয়, স্থল অভিযানে যেসব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে যুক্তরাষ্ট্র

আজকের রাশিফল: অন্যের ব্যক্তিগত জীবনে উঁকি মারা বন্ধ করুন, মোবাইল পাসওয়ার্ড বদলান

৯ হাজার ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ হবে: সংসদে শিক্ষামন্ত্রী

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত