Ajker Patrika

কে এই কুনাল শাহ, কেন দর্শনের ছাত্রকে হোয়াটসঅ্যাপের দায়িত্ব দিল মেটা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
কে এই কুনাল শাহ, কেন দর্শনের ছাত্রকে হোয়াটসঅ্যাপের দায়িত্ব দিল মেটা
ভারতীয় উদ্যোক্তা সেলিব্রিটি কুনাল শাহ। ছবি: সংগৃহীত

এতদিন কুনাল শাহ নামটি মূলত ভারতের স্টার্টআপ এবং বিনিয়োগকারীদের বৃত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ভারতীয় ফিনটেক জায়ান্ট ‘ক্রেড’ (Cred)-এর এই প্রতিষ্ঠাতা শুধু ব্যবসাই করেননি, বরং নিজের পডকাস্ট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নানা তাত্ত্বিক পোস্টের মাধ্যমে প্রযুক্তি মহলে একটি বড় অনুসারী দল তৈরি করেছিলেন।

তবে এবার বিশ্বমঞ্চের স্পটলাইটে চলে এসেছেন তিনি। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটা কুনাল শাহকে তাদের জনপ্রিয় মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম হোয়াটসঅ্যাপের গ্লোবাল প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে।

কুনাল শাহের এই নিয়োগটি এমন এক সময়ে এল, যখন মেটা কুনালের প্রতিষ্ঠিত সংস্থা ক্রেড-এ ৯০ কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ এখন সাধারণ চ্যাটিং অ্যাপের গণ্ডি পেরিয়ে পেমেন্ট বা লেনদেন, ব্যবসায়িক সেবা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত পণ্যের দিকে নিজেদের পরিধি বাড়াতে চাচ্ছে।

কে এই কুনাল শাহ?

এর আগে সুন্দর পিচাই কিংবা সত্য নাদেলার মতো ভারতীয় বংশোদ্ভূত কর্মকর্তারা বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিলেও, ভারতের নিজস্ব স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম থেকে উঠে এসে বিশ্বজুড়ে ৩০০ কোটিরও বেশি ব্যবহারকারীর একটি প্ল্যাটফর্মের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম। কুনাল শাহই হতে যাচ্ছেন হোয়াটসঅ্যাপের নেতৃত্ব দেওয়া প্রথম ভারতীয়।

ভারতের অন্যান্য সুপরিচিত প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তাদের মতো কুনাল শাহ আইআইটি বা আইআইএম-এর মতো কোনো অভিজাত ইঞ্জিনিয়ারিং বা ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট থেকে পড়াশোনা করেননি। মুম্বাইয়ে বেড়ে ওঠা কুনাল কলেজে পড়েছেন দর্শন নিয়ে।

ভারতের শীর্ষস্থানীয় উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী সঞ্জীব বিকচন্দানি একবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ স্মৃতিচারণ করে লিখেছিলেন, কুনাল মূলত ক্লাসের সময়ের সুবিধার জন্য দর্শন বিষয়টি বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর পরিবারের ব্যবসায়িক মন্দা দেখা দেওয়ায় কুনালকে সকালের শিফটে ক্লাস করতে হতো, যাতে তিনি বাকিটা সময় ফুল-টাইম কাজ করতে পারেন।

বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও পডকাস্টে কুনাল নিজেও পড়াশোনার পাশাপাশি হরেক রকম ছোটখাটো কাজ করার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। সেই কঠিন দিনগুলো পার করেই তিনি ২০১০ সালে মোবাইল রিচার্জ প্ল্যাটফর্ম ‘ফ্রিচার্জ’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা তাঁকে প্রথম জাতীয় স্তরে পরিচিতি এনে দেয়। ২০১৫ সালে ই-কমার্স জায়ান্ট স্ন্যাপডিল তৎকালীন অন্যতম বৃহত্তম স্টার্টআপ অধিগ্রহণের মাধ্যমে ফ্রিচার্জ কিনে নেয়।

এরপর কুনাল বেশ কয়েক বছর তরুণ প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের মেন্টরিং বা পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেন। তিনি বিশ্বখ্যাত স্টার্টআপ এক্সিলারেটর ‘ওয়াই কম্বিনেটর’ এবং সেকুইয়া ক্যাপিটালের উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন।

২০১৮ সালে কুনাল তাঁর দ্বিতীয় বড় উদ্যোগ ‘ক্রেড’ চালু করেন। সময়মতো ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধের জন্য গ্রাহকদের পুরস্কৃত করার এক অভিনব মডেলের ওপর ভিত্তি করে এটি গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে ক্রেড ঋণ দেওয়া, বিমা, ই-কমার্স এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনার মতো আর্থিক সেবার দিকে হাত বাড়ায়।

মেটার সাম্প্রতিক বিনিয়োগের পর ক্রেডের বর্তমান বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলারে। আর্থিক খাতের চেয়েও ক্রেড ভারতের গ্রাহকদের কাছে বেশি পরিচিতি পায় তাদের দুর্দান্ত বিজ্ঞাপন ক্যাম্পেইনের জন্য। রসবোধ, নস্টালজিয়া এবং জনপ্রিয় তারকাদের অনাকাঙ্ক্ষিত উপস্থিতির মাধ্যমে তাদের বিজ্ঞাপনগুলো দারুণ সাড়া ফেলেছিল।

তবে এই দ্রুত উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে সমালোচনাও কম হয়নি। ক্রেডের ব্র্যান্ড ভ্যালু ও প্রবৃদ্ধি নিয়ে প্রশংসা থাকলেও, এটি আদৌ কোনোদিন লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হতে পারবে কি না, তা নিয়ে অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় ছিল। গত বছর স্টার্টআপে টেকসই লাভের অভাব নিয়ে ওঠা এক বিতর্কে কুনাল অবশ্য যুক্তি দিয়েছিলেন, উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নেন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন বলেই তাঁদের মূল্যায়ন হওয়া উচিত।

কেন কুনাল শাহকে বেছে নিল মেটা?

অনেকের ধারণা, কুনাল শাহের ফিনটেক বা ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণেই মেটা তাঁকে বেছে নিয়েছে। তবে প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা বিষয়টিকে আরও বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন।

প্রযুক্তি বিষয়ক নিউজ ওয়েবসাইট মিডিয়ানামা-র প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক নিখিল পাহওয়া বিবিসির কাছে মন্তব্য করেন, ‘কুনাল শাহ এমন একজন মানুষ যিনি বছরের পর বছর ধরে পণ্য, গ্রাহকের আচরণ ও প্রবৃদ্ধি নিয়ে গভীরভাবে কাজ করেছেন। তাঁর ব্যবসায় পেমেন্ট ছিল কেবল গ্রাহক আকর্ষণের একটি মাধ্যম মাত্র। এটি কোনো সাধারণ পেমেন্ট-ভিত্তিক নিয়োগ নয়, বরং মেটা এমন একজন নির্মাতাকে বেছে নিয়েছে যিনি গ্রাহক-কেন্দ্রিক ব্যবসাকে বড় পরিসরে নিয়ে যেতে দক্ষ।’

মেটা আনুষ্ঠানিকভাবে কুনাল শাহকে বেছে নেওয়ার নির্দিষ্ট কারণ বিস্তারিত না জানালেও, প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী মার্ক (সিইও) জাকারবার্গ তাঁর ‘গড়ে তোলার মানসিকতা’ এবং ‘বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি’-এর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

হোয়াটসঅ্যাপকে যখন চ্যাটিং অ্যাপ থেকে একটি বিশ্বজনীন ব্যবসায়িক প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করার চেষ্টা চলছে, তখন কুনাল শাহের ওপর অর্পিত এই গুরুদায়িত্ব তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।

ক্রেডের ক্ষেত্রে কুনাল মূলত সামাজিকভাবে একটু এগিয়ে থাকা বা আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে পণ্য তৈরি করেছিলেন। তাঁর গ্রাহক ছিল মূলত উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং প্রযুক্তিপ্রেমী একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী।

কিন্তু হোয়াটসঅ্যাপের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে তাঁকে এমন একটি সেবার দেখভাল করতে হবে যা বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের, সব শ্রেণি ও পেশার মানুষ প্রতিদিন ব্যবহার করে। ৩০০ কোটির এই বৈচিত্র্যময় গ্রাহকগোষ্ঠীর প্রত্যাশা পূরণ করা এবং একই সঙ্গে মেটার ব্যবসায়িক লক্ষ্য অর্জন করাই এখন কুনাল শাহের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত