Ajker Patrika

১০০ বছরের কাছাকাছি এসেও টিকে থাকার লড়াই

ক্রীড়া ডেস্ক    
১০০ বছরের কাছাকাছি এসেও টিকে থাকার লড়াই
এবারের কমনওয়েলথ গেমসে একাই সর্বোচ্চ ৬ টি স্বর্ণপদক জিতেছেন অস্ট্রেলিয়ার নারী সুইমার মেঘ হ্যারিস। ছবি : এক্স

মাত্র ১০টি খেলা, সীমিত বাজেট, ফাঁকা গ্যালারি আর অনেক শীর্ষ তারকার অনুপস্থিতি—এসব নিয়েই শেষ হয়েছে গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমস। ২০২৬ আসরটি সফলভাবে আয়োজন করে গ্লাসগো আপাতত বহুদিনের পুরোনো এই প্রতিযোগিতাকে বাঁচিয়ে রাখলেও, শতবর্ষপূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে কমনওয়েলথ গেমসের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।

১৯৩০ সালে ‘ব্রিটিশ এম্পায়ার গেমস’ নামে যাত্রা শুরু করা এই আসর ২০২৩ সালে বড় ধরনের সংকটে পড়ে। অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণ দেখিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্য আয়োজকের দায়িত্ব ছেড়ে দিলে পুরো আয়োজনই অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ২০১৪ সালে সফলভাবে গেমস আয়োজনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে গ্লাসগো বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে স্বল্প ব্যয়ে আয়োজনের দায়িত্ব নেয়। যেখানে বার্মিংহাম গেমসে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৭৮০ মিলিয়ন পাউন্ড, সেখানে গ্লাসগো পুরো আসর শেষ করেছে মাত্র ১৬০ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ে।

গ্লাসগো থেকে গেমসের ব্যাটন গেছে ভারতের আহমেদাবাদের হাতে। ২০৩০ সালে গেমস শতবর্ষে পা দেবে। সেই আসরে আবারও খেলার সংখ্যা বাড়িয়ে ১৫ থেকে ১৭টিতে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, শতবর্ষের পরও কি এই গেমস আগের গুরুত্ব ধরে রাখতে পারবে?

এই প্রশ্নে কমনওয়েলথ স্পোর্টসের সভাপতি ড. ডোনাল্ড রুকারের উত্তর—‘হ্যাঁ’। তিনি মনে করেন, এই গেমস এখনো ভবিষ্যতের চ্যাম্পিয়ন তৈরির অন্যতম সেরা মঞ্চ। অলিম্পিকের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত হওয়ায় অনেক তরুণ ক্রীড়াবিদের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরু হয় এখান থেকেই।

এর প্রমাণ দিয়েছেন ক্যামেরুনের স্প্রিন্টার ইমানুয়েল এসেমে। গ্লাসগোতে ১০০ মিটারে ৯.৮৩ সেকেন্ড সময় নিয়ে সোনা জয়ের পর তিনি জানিয়েছেন, চার বছর আগের কমনওয়েলথ গেমসই তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ২০২২ সালে জাতীয় রেকর্ড গড়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘কমনওয়েলথ গেমস আমার জন্য সাফল্যের দরজা খুলে দিয়েছে।’

শুধু বড় দেশ নয়, তুলনামূলক ছোট ও কম পরিচিত দেশগুলোর জন্যও এই গেমস গুরুত্বপূর্ণ। এবার জার্সি, ডমিনিকা ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসের মতো দেশগুলোও সোনা জিতেছে। অলিম্পিক ট্রিপল জাম্প চ্যাম্পিয়ন থিয়া লাফন্ড বলেন, ‘আমার আন্তর্জাতিক যাত্রার শুরু এবং সম্ভবত সমাপ্তিও কমনওয়েলথ গেমসেই।’

এ প্রতিযোগিতার আরেকটি বিশেষ দিক হলো, অলিম্পিকে যেসব ক্রীড়াবিদ একীভূত দলের হয়ে অংশ নেন, তাঁরা এখানে নিজেদের অঞ্চল বা দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান। স্কটল্যান্ডের জশ কার যেমন গ্রেট ব্রিটেন নয়, নিজের দেশের হয়ে সোনা জিতে ‘ফ্লাওয়ার অব স্কটল্যান্ড’ জাতীয় সংগীত শুনতে পারার অনুভূতিকে ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মুহূর্ত বলে বর্ণনা করেছেন।

এসব ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি আছে উদ্বেগও। গ্লাসগোতে অংশ নেননি অনেক বড় তারকা। মধ্য পাল্লার ব্রিটিশ দৌড়বিদ কিলি হজকিনসন ইউরোপিয়ান অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপকে প্রাধান্য দিয়েছেন। একইভাবে অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন জুলিয়েন আলফ্রেড ও কানাডার সাঁতার তারকা সামার ম্যাকইটোশও এবারের কমনওয়েলথ গেমস এড়িয়ে গেছেন। আর তারকাদের অনুপস্থিতির প্রভাব পড়েছে দর্শক উপস্থিতিতেও। গ্যালারির অনেক আসনই ছিল ফাঁকা। অথচ মাত্র ১২ বছর আগে একই শহরে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ গেমসে বিক্রি হয়েছিল প্রায় ১৩ লাখ টিকিট।

আয়োজক সংকটও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ডারবান ২০২২ সালের আয়োজক হওয়ার পর সরে দাঁড়িয়েছিল। এরপর ভিক্টোরিয়ার প্রত্যাহারের কারণে টানা দ্বিতীয় আসরেও আয়োজক বদলাতে হয়েছে। যদিও কমনওয়েলথ স্পোর্টসের প্রধান নির্বাহী কেটি স্যাডলেয়ার জানিয়েছেন, নিউজিল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশ ২০৩৪ ও পরবর্তী আসর আয়োজনের আগ্রহ দেখিয়েছে।

তারপরও বাস্তবতা হলো, আয়োজনের ক্রমবর্ধমান ব্যয়, অলিম্পিক ও অন্যান্য বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং শীর্ষ ক্রীড়াবিদদের আগ্রহ কমে যাওয়ায় কমনওয়েলথ গেমস কঠিন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আহমেদাবাদের শতবর্ষের আসর হয়তো নতুন করে প্রাণ ফেরানোর সুযোগ এনে দেবে, কিন্তু তার পরেও এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিযোগিতা আগের মর্যাদা ধরে রাখতে নিয়ে যে প্রশ্ন এখন উঠেছে, সেটি হয়তো মুছে যাবে না!

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত