Ajker Patrika
সাক্ষাৎকার

‘আমার ক্যারিয়ারে আর অবশিষ্ট কী রইল’

‘আমার ক্যারিয়ারে আর অবশিষ্ট কী রইল’

এসএ গেমসে টানা দুবারের সোনাজয়ী ভারোত্তোলক মাবিয়া আক্তার সীমান্ত। আরও একটি সোনা জয়ের প্রস্তুতি যখন নিচ্ছিলেন, তখন শুনতে পেলেন ডোপ টেস্টে পজিটিভ হওয়ার খবর। যাঁর ফলে দুই বছর নিষিদ্ধ হতে হলো তাঁকে। তাঁর শরীরে পাওয়া যায় ফুরোসেমাইড এবং ক্যানরেনোন, যা মূত্রবর্ধক পদার্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মাবিয়া অবশ্য শরীরে নিষিদ্ধ ড্রাগের উপস্থিতি জানতেন না। ডোপ টেস্টে পজিটিভ হওয়ার পেছনে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন বিওএর মেডিকেল কমিটির সদস্যসচিব চিকিৎসক শফিকুর রহমানকে। আজকের পত্রিকার কাছে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনোয়ার সোহাগ

প্রশ্ন: ডোপ টেস্টে নিষিদ্ধ হওয়ার মতো এত বড় ঘটনা! ভুলটা কোথায় হয়েছে আসলে?

মাবিয়া আক্তার সীমান্ত: আমি ওষুধ খেয়েছি এটা ঠিক, কিন্তু সেটা ছিল চিকিৎসার প্রয়োজনে। চিকিৎসক দাবি করছেন, আমি সবকিছু জেনে-শুনে নিষিদ্ধ দ্রব্য ব্যবহার করেছি, বিষয়টি তা নয়। পুরো বিভ্রান্তিটা চিকিৎসক শফিকের তৈরি করা, আমার নয়। তিনি বলেছেন, ডোপ টেস্টের দিন আমি নাকি তাঁকে চিকিৎসার কথা জানাইনি কিংবা প্রেসক্রিপশন দেখাইনি—এটি সম্পূর্ণ ভুল তথ্য। আমি ওনাকে প্রেসক্রিপশন দেখিয়েছি এবং আমি যে চিকিৎসাধীন ছিলাম, তার সব নথিপত্র আমার কাছে আছে। এমনকি উনি যে সেই প্রেসক্রিপশন দেখেছেন, তার প্রমাণও আমার কাছে আছে। মূলত নিজের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে সেই দায় এড়াতে উনি এখন আমার ওপর দোষ চাপাচ্ছেন। আমি তাঁকে বারবার বিষয়টি বলেছি এবং প্রেসক্রিপশন দেখিয়েছি। এখন বলা হচ্ছে, বিওএকে (বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন) এসব আগে জানাতে হয়। আমরা কোনো দিন কোনো সেমিনারে শুনিনি, চিকিৎসার প্রয়োজনে ওষুধ খেলে অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনকে আগে কাগজ দিতে হয়। চিকিৎসক শফিক কোনো দিন আমাদের সেমিনারে এই নিয়ম বলেননি। এটা জানতামই না। গত ২৯ অক্টোবরে বিওএ ভবনেই আমার স্যাম্পল নেওয়া হয়েছিল।

এখন পর্যন্ত আমি কোনো আইনি কাগজপত্র হাতে পাইনি; শুধু অলিম্পিক থেকে একটি সাময়িক নিষেধাজ্ঞার চিঠি পাঠানো হয়েছে। এখন আমি অলিম্পিকের সঙ্গে বসব এবং আলোচনা করব। আমার সামনে আপিলের একটি সুযোগ আছে। আপিল করলে যদি আমার ক্যারিয়ার বাঁচে বা শাস্তি মওকুফ হয়, তাহলে অবশ্যই আপিল করব। আর যদি দেখি, সেটি আমার বিরুদ্ধেই যাচ্ছে, তবে আপিল না করে মানবিক আবেদনের পথে হাঁটব। অলিম্পিকের সঙ্গে বৈঠকের পরেই সিদ্ধান্ত নেব, আমি আসলে কী করতে পারি।

প্রশ্ন: এখানে কোনো ষড়যন্ত্র আছে বলে মনে করেন?

মাবিয়া: ষড়যন্ত্রের বিষয়টি আমি নিশ্চিত নই, তবে চিকিৎসক শফিকের কথাবার্তা এবং তাঁর দেওয়া বিবৃতি নিয়ে আমার আপত্তি আছে। একজন চিকিৎসকের দায়িত্বশীল জায়গা থেকে তিনি যেভাবে সংবাদমাধ্যমে ভুল তথ্য দিচ্ছেন, তা করার এখতিয়ার তাঁর নেই। আরেকটি বিষয় যা আমার কাছে খারাপ লেগেছে—বাংলাদেশে আমিই প্রথম অ্যাথলেট নই যে ডোপ টেস্টে পজিটিভ হয়েছি। এর আগে অলিম্পিকভুক্ত ও অলিম্পিক-বহির্ভূত অনেক ডিসিপ্লিনের খেলোয়াড়ই পজিটিভ হয়েছেন। কিন্তু গত ১৫ বছরে আমি এমন খবরের প্রচার দেখিনি। আমি কি বাংলাদেশে প্রথম যে ডোপ পজিটিভ হলাম? এর আগে কোনো খেলোয়াড়কে নিয়ে আমি এত খবর দেখিনি। চিকিৎসক শফিক যেভাবে ইন্টারভিউ দিয়েছেন, তাতে আমার মনে হওয়াই স্বাভাবিক, তিনি কারও সঙ্গে জড়িয়ে ষড়যন্ত্র করছেন। তিনি কি আমাকে নিষিদ্ধ করে নিজে ফ্রন্টলাইনে আসতে চাইছেন? এখানে তাঁর ব্যক্তিগত অনেক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে এবং তিনি আমাকে নিয়ে ভুল তথ্য ছড়াচ্ছেন। তিনি বলছেন, আমি নাকি সৌদি আরবে টেস্ট করিয়ে পজিটিভ হয়েছি, অথচ সেখানে আমার কোনো টেস্টই হয়নি।

প্রশ্ন: ক্যারিয়ার নিয়ে নিশ্চয় উদ্বেগ বাড়ছে আপনার?

মাবিয়া: আমার ক্যারিয়ারের ক্ষতি তো হয়েই গেছে। গত ১৫ জানুয়ারি থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় চার মাস আমাকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা, খেলা এবং সিলেকশন থেকে দূরে রাখা হয়েছে। অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন থেকে ফেডারেশনে ফোন করে বলা হয়েছে, আমাকে যেন মাঠের বাইরে রাখা হয়। এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মৌখিকভাবে; ফেডারেশনকে লিখিত কোনো ডকুমেন্ট দেওয়া হয়নি। আমার এই শাস্তির বিষয়ে ফেডারেশন বা আন্তর্জাতিক ভারোত্তোলন ফেডারেশন—কেউই কিছু জানে না। একমাত্র চিকিৎসক শফিক আমার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেছেন এবং অলিম্পিক আমাকে জানিয়েছে। এর বাইরে লিখিত বা অলিখিতভাবে কেউ কিছু জানে না।

আমাকে চার মাস ধরে বসিয়ে রাখা হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন এ বছর বড় দুটি গেমস রয়েছে। আমার বর্তমান পারফরম্যান্স অনুযায়ী কমনওয়েলথ গেমসে ব্রোঞ্জ জেতার উজ্জ্বল সম্ভাবনা ছিল। সেখানে আমাকে এভাবে অব্যাহতি দেওয়া কি ক্যারিয়ারকে ঝুঁকিতে ফেলা নয়? আগামী বছর এসএ গেমস আছে, এই সময়ে আমাকে দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দেওয়া এবং এ নিয়ে কারও মাথাব্যথা না থাকাটা সত্যিই দুঃখজনক। আমার ক্যারিয়ারে আর অবশিষ্ট কী রইল? দুই বছর পর আবার খেলায় ফিরব কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন। আমার ব্যক্তিগত জীবন আছে। বাংলাদেশে এত দিন কোনো সরকারি সাপোর্ট ছাড়াই ক্যারিয়ার টেনে নিয়ে আসছি। এখন যখন কিছু সুবিধা পাওয়ার সুযোগ এল, তখনই আমাকে অ্যান্টি-ডোপিং রুলস ভায়োলেশনের দোহাই দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসক শফিক বলছেন, আমি নিয়ম ভেঙেছি। যদি নিয়ম ভঙ্গ করে থাকি, তবে যেদিন স্যাম্পল নেওয়া হয়েছিল, সেদিন চিকিৎসক নিজেও নিয়ম ভেঙেছেন। আমি তাঁকে সব নথিপত্র দিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি সেগুলো যাচাই না করে ব্যস্ততা দেখিয়ে তাড়াহুড়ো করে স্যাম্পল নিয়েছেন। ডোপ টেস্টের নিয়ম অনুযায়ী একজন অভিভাবকের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়, যেটা সেদিন নেওয়া হয়নি।

প্রশ্ন: আপনি তাঁকে ব্যবস্থাপত্র সরাসরি দেখিয়েছেন, নাকি অন্য কোনো মাধ্যমে?

মাবিয়া: তাঁকে সরাসরি দিয়েছি। অ্যালার্জি ও পায়ের চিকিৎসা চলছিল। ওনাকে সরাসরি দিয়েছি।

প্রশ্ন: ডোপ টেস্ট করতে যখন আপনাকে ডাকা হলো, তখন কি সন্দেহ হয়েছিল?

মাবিয়া: ভয়ের বা আশঙ্কার তো প্রশ্নই আসে না; কারণ, জানি, অনৈতিক কিছু করিনি। আমি তো কিছু খাইনি বা নিইনি, তাহলে ভয় পাব কেন? হ্যাঁ, অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের প্রতি এইটুকু আশাবাদী যে তারা সঠিক বিচার করবে। একজন খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ার এভাবে যেন নষ্ট না হয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত