Ajker Patrika

হাইতি: ফুটবল যেখানে শান্তির ঠিকানা

১১ জুন শুরু হবে ২০২৬ বিশ্বকাপ । যুক্তরাষ্ট্র , কানাডা ও মেক্সিকোয় শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপে এই প্রথম খেলছে ৪৮ দল । ‘বিশ্বকাপের দল’ শীর্ষক এই ধারাবাহিকে কোন দল কেমন , সেটি তুলে ধরার প্রয়াস—

ক্রীড়া ডেস্ক    
হাইতি: ফুটবল যেখানে শান্তির ঠিকানা
৫২ বছর পর বিশ্বকাপে হাইতি। ছবি: সংগৃহীত

পর্তোপ্রাঁসে দখল নেওয়া সশস্ত্র গ্যাংস্টারদের তাণ্ডব কিংবা প্রায় ১৫ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার হাহাকার—সবকিছুই যেন গত ১৮ নভেম্বর ঢাকা পড়ে গিয়েছিল এক অভূতপূর্ব উল্লাসে। রাজধানীর প্রতিটি অলিগলিতে তখন মানুষের ঢল। দীর্ঘ ৫২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে ক্যারিবীয় দেশ হাইতি। নিকারাগুয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে লে গ্রেনাডিয়ারদের এই জয় যেন কেবল ফুটবলীয় সাফল্য নয়, বরং বিপর্যস্ত এক জাতির বেঁচে থাকার নতুন সঞ্জীবনী।

বিস্ময়কর হলেও সত্য, হাইতি জাতীয় দলের এই রূপকথার প্রধান কারিগর ফরাসি কোচ সেবাস্তিয়েন মিগনে আজ পর্যন্ত হাইতির মাটিতে পা রাখতে পারেননি। চরম নিরাপত্তা সংকটের কারণে মিগনেকে তাঁর পুরো রণকৌশল সাজাতে হয়েছে বিদেশের মাটিতে বসে। এমনকি পরিস্থিতির ভয়াবহতায় হাইতিকে তাদের সব ‘হোম ম্যাচ’ খেলতে হয়েছে নিরপেক্ষ ভেন্যু কুরাসাওয়ে। কিন্তু মাঠের বাইরে প্রতিকূলতা যত বেড়েছে, মাঠের ভেতরে হাইতিয়ানদের জেদও তত চওড়া হয়েছে।

গ্রুপ পর্বে কুরাসাওয়ের কাছে ৫-১ ব্যবধানে হারের বড় ধাক্কা সামলে নিয়ে তৃতীয় রাউন্ডে অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়ায় দলটি। হন্ডুরাস ও কোস্টারিকার মতো অভিজ্ঞ শক্তিকে পেছনে ফেলে কনক্যাকাফ বাছাইপর্বের গ্রুপসেরা হয়েই বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নিয়েছে তারা।

হাইতির সাবেক সিনেটর ও প্রখ্যাত ক্রীড়া বিশ্লেষক প্যাট্রিস ডুমন্টের মতে, এটি গত দুই দশকের মধ্যে হাইতির সেরা ফুটবল দল। প্রথমবারের মতো ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে মাঠ মাতাচ্ছেন হাইতির তিন ফুটবলার। উলভারহ্যাম্পটনের জাঁ-রিকার বেলগার্ড, বার্নলির হানেস দেলক্রো এবং এজে অসেরের জসু কাসিমিরদের মতো প্রবাসে থাকা তারকাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ছেন ডানলি জিন জেকস, রিকাদো আদে ও দন দিদসনদের মতো স্থানীয়রা। এমন মিশ্রণই হাইতিকে করে তুলেছে অপ্রতিরোধ্য।

ফুটবলাররা এখন দেশটির মানুষের কাছে কেবল নন, বরং হয়ে উঠেছেন শান্তির দূত। ২০০৬ সালে আইভরি কোস্টের গৃহযুদ্ধ থামাতে দিদিয়ের দ্রগবা যে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিলেন, হাইতির ফুটবলাররাও আজ সেই পথেই হাঁটছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁরা ছড়িয়ে দিয়েছেন হ্যাশট্যাগ ‘দেশকে উন্মুক্ত করো’ (#ouvèpeyia)। তাঁদের এই স্লোগান কেবল ফুটবল ম্যাচ আয়োজনের জন্য নয়, বরং এটি হাইতির মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তা ফেরানো এক আকুল আবেদন। খেলোয়াড়েরা চান, বিশ্বকাপের খেলার আনন্দ তাঁরা যেন নিজ দেশে ফিরে পরিবারের সঙ্গে নিরাপদে উদ্‌যাপন করতে পারেন।

যে দেশে অর্ধেকের বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে এবং প্রায় ৬০ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে, সেখানে ফুটবলই এখন একমাত্র ঐক্যের সুতো। ১৮০৩ সালের ১৮ নভেম্বর হাইতি যেমন ফরাসি উপনিবেশ থেকে মুক্তি পেয়েছিল। জন্ম দেয় প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ শাসিত প্রজাতন্ত্রের সেই ১৮ নভেম্বরই বিশ্বকাপে খেলতে পারার গরিমা এনে দেয়। জুনে যখন ‘সি’ গ্রুপে ব্রাজিল, স্কটল্যান্ড ও মরক্কোর বিপক্ষে লড়াইয়ে নামবে, তখন পেছনে কোনো রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা থাকবে না; থাকবে শুধু এক টুকরা সম্মান আর শান্তিতে বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। হাইতির এই উত্তরণ মনে করিয়ে দেয়—মাঠের লড়াই কখনো কখনো রাষ্ট্রের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে।

কোচ সেবাস্তিয়ান মিগনে

২০২৪ সালে হাইতির দায়িত্ব নিয়ে সেবাস্তিয়ান মিগনে দলটিকে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে পথ দেখান। নব্বইয়ের দশকে ইংল্যান্ডের নিচু স্তরের লিগে খেলা এই ফরাসি কোচ মাত্র ২৬ বছর বয়সেই কোচিং শুরু করেন। জঁ-পিয়ের পাপাঁর সহকারী হিসেবে কাজ করার পর তিনি ওমান, কঙ্গো ও কেনিয়ার মতো দলের হয়ে। ২০১৯ সালে তাঁর অধীনেই কেনিয়া ১৫ বছর পর আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে ফেরে। ক্যামেরুনের সহকারী কোচ হওয়ার পাট চুকিয়ে বর্তমানে তিনি হাইতির ফুটবল ঐতিহ্যে নতুন ইতিহাস লিখে বয়ে এনেছেন সাফল্য।

তারকা

ডাকেন্স নাজোঁ

ডাকেন্স নাজোঁ—হাইতির ফুটবল ইতিহাসের জীবন্ত কিংবদন্তি বর্তমানে দেশটির সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। বাছাইপর্বে কোস্টারিকার বিপক্ষে জাদুকরি হ্যাটট্রিক করে হাইতির বিশ্বমঞ্চে অংশ নেওয়ার পথ অনেকটাই সুগম করে দেন এই স্ট্রাইকার। ব্যক্তিগত জীবনে সন্তানের জন্মের মুহূর্ত উপেক্ষা করে কেইলর নাভাসের মতো গোলরক্ষককে পরাস্ত করা অদম্য দেশপ্রেমেরই বহিঃপ্রকাশ। বর্তমানে ইরাকি ক্লাব এস্তেঘলালে খেলা নাজোঁর হাত ধরেই দীর্ঘ ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরছে হাইতি।

গ্রুপপর্বে হাইতির ম্যাচগুলো
তারিখপ্রতিপক্ষভেন্যুসময়
জুন ১৪স্কটল্যান্ডবোস্টনসকাল ৭টা
জুন ২০ব্রাজিলফিলাডেলফিয়াসকাল ৭টা
জুন ২৫মরক্কোআটলান্টাভোর ৪টা

বিশ্বকাপ ইতিহাস

বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ: ২ বার

সর্বোচ্চ সাফল্য: ১৯৭৪ সালে গ্রুপ পর্ব।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

জামুকা সংশোধনে বিল পাস, জামায়াতের আপত্তি, এনসিপির সমর্থন

ফুয়েল পাস অ্যাপ রেজিস্ট্রেশন ও ব্যবহার করবেন যেভাবে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের শীর্ষ ৫২ জনই নিহত

টিকিট না কেটে ট্রেন ভ্রমণ, ৫০ বছর পর সেই ভাড়া ফেরত দিলেন বৃদ্ধ

ফ্রান্সের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ইতালির রাজকুমারীর প্রেমের গুঞ্জন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত