Ajker Patrika

কোচের ‘ফলস নাইন’ বাজিতে সফল কুনিয়া

আনোয়ার সোহাগ, ঢাকা
কোচের ‘ফলস নাইন’ বাজিতে সফল কুনিয়া
ব্রাজিলের মাথিয়াস কুনিয়ার দ্বিতীয় গোল উদ্‌যাপন। গতকাল ফিলাডেলফিয়ায় হাইতির বিপক্ষে। ছবি: এএফপি

ব্রাজিলের ৯ নম্বর জার্সিটার ওজনই আলাদা। রোনালদো নাজারিও এই জার্সি পরেই বিশ্ব মাতিয়েছেন, ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছেনও। তবে রোনালদো-পরবর্তী যুগে কেউই সেভাবে সেই জার্সির ভার সেভাবে বহন করতে পারেননি।

স্বাভাবিকভাবে ২০২৬ বিশ্বকাপে জার্সিটি যখন মাথিয়াস কুনিয়ার গায়ে ওঠে, তখন অজান্তেই একটা শঙ্কা কাজ করে, পারবেন তো?

প্রথম ম্যাচে মরক্কোর বিপক্ষে ড্র করার পর সেই সংশয় আরও বাড়ে। কিন্তু ফিলাডেলফিয়ায় হাইতির বিপক্ষে ম্যাচে কোচ কার্লো আনচেলত্তির বাজি ছিলেন কুনিয়াই। ইগর থিয়াগোকে বসিয়ে কুনিয়াকে যখন শুরুর একাদশে নামানো হলো, তখন ম্যাচটা তাঁর জন্য ছিল একটা বড় পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষায় কুনিয়া পাস করলেন কোনো যদি কিন্তু ছাড়াই। তিন গোলের জয়ে জোড়া গোল করে বনে গেলেন নায়ক। তবে গোল করার চেয়ে মাঠে তিনি যে ভূমিকাটা পালন করেছেন, সেটাই বেশি নজর কেড়েছে।

কুনিয়া মাঠে প্রথাগত স্ট্রাইকারের পরিবর্তে খেলেছেন ‘ফলস নাইন’ হিসেবে। মাঝমাঠে নেমে এসে বল কেড়ে নেওয়া, উইংয়ে থাকা রাফিনিয়া আর ভিনিসিয়ুসের জন্য ফাঁকা জায়গা তৈরি করে দেওয়া—সবই করেছেন নিখুঁতভাবে। লিভারপুলের রবার্তো ফিরমিনো যেমন আড়ালে থেকে দলের জন্য খাটতেন, কুনিয়াও যেন সেই ভূমিকাতেই অবতীর্ণ হয়েছিলেন।

নিজের খেলার ধরন নিয়ে কুনিয়া নিজেই বলেছেন, ‘আমি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা স্ট্রাইকার নই। মাঠে ঘুরেফিরে খেলতে বেশি পছন্দ করি। দুই লাইনের মাঝে সংযোগ তৈরি করা আর ফাঁকা জায়গা ভরাট করে সুযোগ বানানোই আমার কাজ। দলের প্রয়োজনে আমি যেকোনো ভূমিকা নিতে রাজি, তবে একজন ফরোয়ার্ড হিসেবে গোল করাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং সেই চেষ্টাই আমি সব সময় করি।’

মরক্কোর বিপক্ষে ড্র করে ব্রাজিলের ড্রেসিংরুমের মনোবল যে কিছুটা দমে গিয়েছিল, তা কুনিয়া অকপটে স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের শুধু বাইরের মানুষকে দেখানোর জন্য নয়, নিজেদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার জন্যও এই জয়টা খুব দরকার ছিল। আমরাও তো মানুষ, আমাদের মনেও ভয় বা সংশয় জাগে। এই জয় আমাদের মনে শান্তি দেবে, যা সামনের রাউন্ডগুলোতে আরও ভালো খেলতে সাহায্য করবে।’

কুনিয়ার এই স্বীকারোক্তিই বলে দেয়, কতটা চাপের মধ্যে থেকে এই পারফরম্যান্স বের করে এনেছে দল। ম্যাচে কুনিয়ার দ্বিতীয় গোলটি ছিল দেখার মতো। কাসেমিরোর কাছ থেকে বল পেয়ে ভিনিসিয়ুস যখন নিখুঁত একটা থ্রু-পাস বাড়ালেন, কুনিয়া তখন তীব্র গতিতে ছুটছেন। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা যখন তাঁকে ব্লক করার চেষ্টা করছেন, ঠিক তখনই ভারসাম্য হারিয়ে মাঠে পড়ে যাওয়ার মুহূর্তে বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শটে বল জালে জড়ান তিনি। ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে তখন একসঙ্গে খেলা দেখছিলেন ব্রাজিলের দুই মহাতারকা রোনালদো নাজারিও আর রোনালদিনহো। কুনিয়ার এই গোল গ্যালারির দর্শকদেরও নস্টালজিক করে তোলে। গোল করেই কুনিয়া মেতে ওঠেন এক অদ্ভুত উদ্‌যাপনে। মাঠে উপুড় হয়ে শুয়ে কাল্পনিক এক সার্ফবোর্ডে ভেসে যাওয়ার ভঙ্গি করেন তিনি। প্রথম গোলের পর তাঁর উদ্‌যাপন ছিল বোর্ডে ঝুঁকে থাকার মতো।

গ্যালারিতে বসে সন্তানের এমন অবিস্মরণীয় মুহূর্ত দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি তাঁর মা লুজিয়ানা কুনিয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘কে ভেবেছিল, এই গর্ভ আমাকে এত বড় পূর্ণতা এনে দেবে?’

ফুটবলের বাইরে কুনিয়ার এক বড় পরিচয়, তিনি ছয়টি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন। পর্তুগিজ, স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ, ইংলিশ, জার্মান ও ইতালিয়ান—ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে খেলার সুবাদেই এই ভাষাগুলো রপ্ত করেছেন তিনি। তবে ভাষা শেখার চেয়ে ঢেউয়ের বুকে সার্ফিং করে সুখ খুঁজে পান এই ফরোয়ার্ড। অলিম্পিকজয়ী সার্ফার ইতালো ফেরেরার বন্ধু কুনিয়া অবসর পেলেই ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে কৃত্রিম ঢেউয়ের মধ্যে সার্ফিং করেন। নিজের এই শখ নিয়ে কুনিয়া বলেন, ‘ছুটি কাটাতে রিও গ্রান্দে দো নর্তের বাহিয়া ফোর্মোসাতে গিয়ে প্রথম সার্ফিংয়ের প্রেমে পড়ি। তখন থেকে সুযোগ পেলেই এই খেলা খেলি। আমি জোয়াও পেসোয়ার ছেলে, সার্ফিং আমার জীবনের অংশ। সত্যি বলতে, আমি ফুটবলের চেয়ে সার্ফিংই মনে হয় বেশি দেখি।’

ফিলাডেলফিয়ার সবুজ ঘাসে আঁকা কুনিয়ার সেই কাল্পনিক সার্ফবোর্ডের ওপর ভর করে বিশ্বকাপের বাকি পথটা পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন বুনতেই পারে ব্রাজিল।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত