Ajker Patrika
সাক্ষাৎকার

‘দলকে আমার এখনো অনেক কিছুই দেওয়ার আছে’

‘দলকে আমার এখনো অনেক কিছুই দেওয়ার আছে’

বাংলাদেশের প্রথম নারী ক্রিকেটার হিসেবে সাতবারের মতো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলার অপেক্ষায় ফাহিমা খাতুন। ১২ জুন ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে শুরু হতে যাওয়া সেই বিশ্বকাপের আগে প্রস্তুতির অংশ হিসেবে স্কটল্যান্ডে একটি ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলবে নিগার সুলতানা জ্যোতির দল। ত্রিদেশীয় সিরিজ এবং টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে আজ ঢাকা ছাড়বেন ফাহিমা। যাওয়ার আগে আজকের পত্রিকার সঙ্গে নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ার, ভবিষ্যৎ, উঠে আসার পেছনে পরিবারের অবদান, ক্রিকেট নিয়ে নিজের আবেগসহ আরও কিছু বিষয়ে কথা বলেছেন এই লেগ স্পিনার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কারিমুল ইসলাম

আপডেট : ২৬ মে ২০২৬, ১২: ৫৫

প্রশ্ন: বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে সপ্তম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে যাবেন। অনুভূতি কেমন?

ফাহিমা খাতুন: অনেক ভালো লাগা কাজ করছে। সব থেকে বড় উৎসাহের জায়গাটা হচ্ছে আমার পরিবার। পরিবার খুব সাপোর্ট করে। প্রথম দিকে না করলেও এখন খুব সাপোর্ট করে। তারা আমাকে নিয়ে গর্বও করে। আমার ভালো লাগার জায়গাটা হলো, লম্বা সময় ধরে, মানে ১৩ বছরের বেশি সময় দেশের হয়ে খেলছি। এখন সপ্তম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলার অপেক্ষা।

প্রশ্ন: আজকের এই অবস্থানের জন্য পরিবারকে কৃতিত্ব দিতে চান? তাই তো?

ফাহিমা: হ্যাঁ, অবশ্যই। আমার বাবা সরকারি চাকরি করতেন, তিনি বাইরে থাকতেন সব সময়। আমরা তিন বোন, এক ভাই। গার্ডিয়ান হিসেবে আমার বড় ভাই ছিলেন। তিনি প্রথমে চাইতেন না, আমি খেলাধুলা করি। আমি তাঁর অগোচরেই খেলাধুলা করেছি। আমার বড় বোন সব সময় সাপোর্টিভ ছিলেন। ছোটবেলা থেকে আমি যা-ই করতে চেয়েছি, যেদিকে আমার প্রতিভা ছিল, তিনি সাপোর্ট করেছেন। তো বলতেই হয়, অবদান আমার বড় বোনের। যেখানেই এই প্রসঙ্গ আসে, বড় বোনের কথাই বলি। তবে হ্যাঁ, পুরো পরিবারই পাশে ছিল সব সময়।

প্রশ্ন: ২০১৪ সালের প্রথম বিশ্বকাপ আর ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ—দুই সময়ের বাংলাদেশ দলকে কীভাবে দেখেন?

ফাহিমা: ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে আমরা মনে হয় দুইটা অথবা একটা ম্যাচ জিতেছিলাম। সে সময়ের তুলনায় বর্তমান দলে অনেক পরিবর্তন এসেছে। মেয়েদের ক্রিকেটটা আগের মতো নেই। বিশ্ব ক্রিকেটে মেয়েরা যেভাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, সেদিক থেকে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটেও অনেক উন্নতি হয়েছে। ২০১৮ সালে আমরা এশিয়া কাপ জিতেছি। সেখান থেকে আমাদের উৎসাহের জায়গাটা তৈরি হয়েছে। আমাদের দলে অভিজ্ঞ-তারুণ্যের একটা মেলবন্ধন আছে। সবাই খুব ভালো করছে। এখন আমাদের লক্ষ্য শুধু ভালো ক্রিকেট খেলা নয়, এখন জয়ের দিকে লক্ষ্য থাকে।

প্রশ্ন: এত বছর ধরে জাতীয় দলে টিকে থাকার বড় রহস্য কী?

ফাহিমা: ছোটবেলা থেকে আমার ফিটনেস অনেক ভালো ছিল। খাবারের প্রতি আমার নিয়ন্ত্রণ আছে। অস্বাস্থ্যকর কিছু খাই না। আমার মনে হয়, যখন আপনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন, আপনার ফিটনেস ভালো থাকবে, তখন আপনি যেটা চাইবেন, দ্রুত ফল না পেলেও একটা সময় পাবেন। কারণ, শরীর ভালো থাকলে ব্রেন অনেক ভালো কাজ করবে। তো আমি বলব, খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে আমার প্যাশন, কঠোর পরিশ্রম—সবকিছুই ঠিক রাখতে পারি। চেষ্টা করি নিজের কাজটুকু করার। এমন চিন্তা কখনো আসেনি যে লম্বা সময় খেলছি, দলে আমার জায়গা স্থায়ী হয়েছে। সবকিছু মেনে চলার চেষ্টা করি। এটাই রহস্য হতে পারে।

২০১৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সেই ম্যাচে দারুণ বোলিং করেছিলেন ফাহিমা। কিন্তু ব্যাটিং-ব্যর্থতায় বাংলাদেশ ম্যাচটা হেরে যায়। ছবি: আইসিসি
২০১৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সেই ম্যাচে দারুণ বোলিং করেছিলেন ফাহিমা। কিন্তু ব্যাটিং-ব্যর্থতায় বাংলাদেশ ম্যাচটা হেরে যায়। ছবি: আইসিসি

প্রশ্ন: ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন সময় কোনটা ছিল?

ফাহিমা: এটাকে আসলে বাজে সময় বলব না। ’১৮-র এশিয়া কাপের কোয়ালিফায়ারের আগের ঘটনা। আমি চোট পেয়েছিলাম। তবে কোয়ালিফায়ার খেলতে যাওয়ার আগে মেডিকেল টিম থেকে আমাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল। এরপরও ভয় থেকে সেবার কোয়ালিফায়ার খেলতে যাইনি। সে সময়কার নির্বাচক আতহার আলী খান আমার ওপর অনেক রেগে গিয়েছিলেন। আমি বলেছি, ‘স্যার, আমি দেশের কথা ভেবেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মনে হয়, আমার জায়গায় যদি পুরোপুরি ফিট একজন ক্রিকেটার যায়, দলের জন্য ভালো হবে।’ সেটাই আমার জন্য কঠিন একটা সময় ছিল। মনে রাখার মতো ওটাই। ওই পরিস্থিতি সুন্দরভাবে সামলেছি, আবার দলে ফিরেছি।

প্রশ্ন: প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের কোন স্মৃতি এখনো বেশি মনে পড়ে?

ফাহিমা: সেবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচটা স্মরণীয় হয়ে আছে। সেই ম্যাচে দুইটা রান আউট করেছিলাম, দুইটা ক্যাচ ধরেছিলাম আর দুইটা উইকেট পেয়েছিলাম। সেই ম্যাচে আমরা হেরে গেছি। তাই কিছুটা আক্ষেপও আছে, আবার ভালো লাগাও আছে। জিতলে হয়তো দিনটা আমারই হতো।

প্রশ্ন: গত এক দশকে নারী ক্রিকেটে কতটা পরিবর্তন দেখছেন?

ফাহিমা: ১০ বা ১২ বছর আগে আমাদের স্পিন বা পেস বোলিং কোচ ছিল না। নির্দিষ্ট কোনো ট্রেইনার ছিল না। এখন সবকিছু আছে। আমি মনে করি, মেয়েরা এখন নিজের যত্ন সম্পর্কে এখন খুব ভালোভাবে জানে। আগে হয়তো পাওয়ার হিটের জন্য আমাদের দু-একজন ক্রিকেটারের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন আমাদের দলে বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার আছে, যারা পাওয়ার হিট করতে পারে। টপ অর্ডার ব্যর্থ হলে মিডল অর্ডার হাল ধরছে। আবার মিডল অর্ডার ব্যর্থ হলে লোয়ার অর্ডার দায়িত্ব নিচ্ছে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের কোন ক্রিকেটারদের নিয়ে আপনি আশাবাদী?

ফাহিমা: সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন ক্রিকেটার নিজেদের প্রতি অনেক যত্নশীল হয়েছে। যেমন সোবহানা মোস্তারি অনেক ভালো করছে। আমার মনে হয় একজন ব্যাটার হিসেবে তার ভেতর অনেক সম্ভাবনা আছে। এ ছাড়া স্বর্ণা আছে, রাবেয়া আছে। এরা সবাই সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার। যদি এভাবে খেলতে পারে, কোনো চোট না হয়, নিয়ম মানতে পারে, তাহলে সবাই বাংলাদেশ দলকে অনেক দিন সার্ভিস দেবে।

প্রশ্ন: এবারের বিশ্বকাপে আপনার লক্ষ্য কী?

ফাহিমা: আগে যত টুর্নামেন্টে খেলেছি, সেগুলোর আগে আমার লক্ষ্য সবার সঙ্গে শেয়ার করেছি। এবার সেটা গোপনই থাক। একজন অলরাউন্ডার হিসেবে, আমার যখনই সুযোগ আসে, সেটা ব্যাটিং, বোলিং বা ফিল্ডিংয়ে—তিনটা বিভাগেই ভূমিকা রাখার চেষ্টা করি। আপাতত লক্ষ্য এতটুকুই। আলাদা কিছু লক্ষ্য ঠিক করে রেখেছি। সেটা গোপনই থাক।

প্রশ্ন: নিজের বোলিংয়ে কী কী পরিবর্তন এনেছেন?

ফাহিমা: আমার বোলিংয়ে বেশ পরিবর্তন এনেছি। প্রথম দিকে লেগ স্পিনটাই আমার অস্ত্র ছিল। অনেক বেশি টার্ন করাতে পারতাম এবং জোরে বল করতাম। বিভিন্ন কোচের আন্ডারে কাজ করে আসলে অনেক ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এখন টপ স্পিন খুব ভালো করতে পারি, গুগলিটাও পারি। কোচ বলেছেন আরও কিছু বৈচিত্র্য আনতে। বড় দলগুলোতে ভালো ভালো বাঁহাতি ব্যাটার আছে। তাদের বিপক্ষে আমাকে গুগলি, টপ স্পিন, স্লাইডার, কুইকার, ওয়াইডিশ ইয়র্কার করতে হবে।

উইকেট নেওয়ার পর সতীর্থ সোবহানা মোস্তারির সঙ্গে ফাহিমার উদ্‌যাপন। গোটা ক্যারিয়ারে এমন উপলক্ষ অনেক পেয়েছেন তিনি। ছবি: বিসিবি
উইকেট নেওয়ার পর সতীর্থ সোবহানা মোস্তারির সঙ্গে ফাহিমার উদ্‌যাপন। গোটা ক্যারিয়ারে এমন উপলক্ষ অনেক পেয়েছেন তিনি। ছবি: বিসিবি

প্রশ্ন: এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ কত দূর যাবে বলে মনে করেন?

ফাহিমা: বাংলাদেশ দল হিসেবে পারফর্ম করে। এটা ঠিক থাকলে আমরা যেকোনো দলকে হারানোর ক্ষমতা রাখি। এমন নয় যে আমাদের একজন খেলোয়াড় খুব বেশি ভালো খেলে দল জিতিয়ে ফেলে। হয়তোবা ব্যক্তিগত কিছু পারফরম্যান্স থাকে। সে ক্ষেত্রে জয়ের হার খুব কম। মনে করি, আমাদের দলগত পারফরম্যান্সটা খুব দরকার। এটা করতে পারলে মনে হয় আমরা অনেক দূর যেতে পারব।

প্রশ্ন: জাতীয় দলে অভিষেকের সময় কি কখনো ভেবেছিলেন, এতগুলো বিশ্বকাপ খেলবেন?

ফাহিমা: ২০১৩ সালে যখন অভিষেক হয়, তখন আমার বিশ্বাস ছিল যে ফিটনেস, অনুশীলন—সব ঠিক থাকলে অনেক দিন বাংলাদেশের হয়ে খেলতে পারব। আমি যতটুকু বা যেখানে অবদান রাখতে পেরেছি, সেখানেই দল ভালো করেছে। শুরুর দিকে আমার বড় বোন বলত—তুমি এক দিন বাংলাদেশের অধিনায়কত্ব করবে। কথাটা আমাকে অনুপ্রাণিত করত। ভালো লাগে যে একবার হলেও অধিনায়ক ছিলাম। আমার আসল কাজ হলো দলের জন্য পারফর্ম করা। আমি অনেক আত্মবিশ্বাসী যে এখনো দলকে অনেক কিছুই দেওয়ার আছে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের হয়ে ৯৯টা টি-টোয়েন্টি খেলেছেন। কেমন লাগে?

ফাহিমা: বাংলাদেশের হয়ে খেলতে সব সময় ভালো লাগে। যখন সবাই বলে যে তুমি বাংলাদেশের হয়ে এতগুলো ম্যাচ খেলেছ, এটা শুনতে খুব ভালো লাগে। ক্রিকেটকে আমি শুধু পেশা হিসেবে চিন্তা করি না। মনে হয়, ক্রিকেটের সঙ্গে আমার আত্মার একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। যারা ক্রিকেটার, লম্বা সময় ধরে খেলছে, তারা এই অনুভূতিটা বুঝতে পারবে। ক্রিকেটের সঙ্গে একটা রক্তের সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। একটা সময় ক্রিকেট খেলব না—ওই চিন্তা করতে গেলেও খারাপ লাগে। এরপরও তো কিছু করার নেই। একদিন তো ছাড়তেই হবে।

প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোন ব্যাটারকে বল করতে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং মনে হয়েছে?

ফাহিমা: অস্ট্রেলিয়ার অ্যালিসা হিলি অনেক প্রিয় ক্রিকেটার। এখনো তার উইকেট নেওয়া হয়নি। যখন তাকে প্রথম বল করেছিলাম, সেটা আমার জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল। কারণ, জানতাম, সে ৩৬০ ডিগ্রি খেলতে পারে। অন্যান্য ব্যাটারের বিপক্ষে ভালো হয়েছে, আবার খারাপও হয়েছে। কিন্তু অ্যালিসা হিলিকেই চ্যালেঞ্জিং মনে হয়েছে।

প্রশ্ন: বিশ্বকাপের আগে নিজেদের মাঠে শ্রীলঙ্কার কাছে দুটি সিরিজ হেরেছে বাংলাদেশ। এটা কি আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেবে?

ফাহিমা: নিজেদের মাঠে ম্যাচ হারলে কারোরই ভালো লাগে না। আমাদের চেষ্টা ছিল। হয়তো কিছু ভুলের কারণে সিরিজ হাতছাড়া করেছি। আমরা ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করব। হয়তো এই সিরিজে পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলতে পারিনি। এটা থেকে বের হওয়ার জন্য আমাদের আলোচনা হচ্ছে।

প্রশ্ন: এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ইংল্যান্ড-ওয়েলসে। সেই কন্ডিশন বাংলাদেশের জন্য কতটা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে?

ফাহিমা: অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং হবে। দেশের বাইরে যেখানেই খেলা হোক, সব জায়গাতেই স্পোর্টিং উইকেট। তবে বিশ্বকাপের আগে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য অনুশীলন থাকছে। আগেও আমরা অনুশীলন করেছি। আমাদের হাতে যতটুকু সময় আছে, নিজেদের ঝালিয়ে নেব। কিছু দলের বিপক্ষে আমরা এগিয়ে থাকব। তবে সব দলের বিপক্ষেই আমাদের একই পরিকল্পনা থাকবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত