Ajker Patrika

রোনালদোদের হারিয়ে বাবার উদ্‌যাপনে ছেলেকে উপহার

ক্রীড়া ডেস্ক    
আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৬, ২১: ৪২
রোনালদোদের হারিয়ে বাবার উদ্‌যাপনে ছেলেকে উপহার
যোগ করা সময়ে মিকেল মেরিনোর গোলে নিশ্চিত হয় স্পেনের জয়। পর্তুগালকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পর এভাবেই উদযাপন করেন তিনি। ছবি: রয়টার্স

চোট কাটিয়ে শেষ মুহূর্তে বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়া, আর ঠিক শেষ সময়ে গোল করে দলকে জেতানো—মিকেল মেরিনোর গল্পটা যেন কোনো রোমাঞ্চকর সিনেমার চিত্রনাট্য। যুক্তরাষ্ট্রের আর্লিংটনের গ্যালারিতে যখন উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে, ঠিক তখনই স্প্যানিশ ফুটবলকে আরেকটি স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিলেন এই মিডফিল্ডার। গোলের পর কর্নার ফ্ল্যাগের চারপাশে তাঁর সেই চেনা উদ্‌যাপন ফিরিয়ে আনল ৩৩ বছর আগের এক স্মৃতি। ঠিক একইভাবে তাঁর বাবা আনহেল মিগেল ওসাসুনার হয়ে গোল করে উদ্‌যাপন করেছিলেন।

মেরিনো তাঁর এই গোলটি উৎসর্গ করেছেন দুই মাসের ছেলে মার্কো আর পুরো স্পেনের মানুষকে। কাকতালীয়ভাবে, যেদিন মেরিনো স্পেনের জয়ের নায়ক হলেন, সেদিনই তাঁর শহর পামপ্লোনাতে শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ‘সান ফারমিন’ উৎসব। শহরের মানুষ যখন লাল-সাদা পোশাকে উৎসবে মেতেছিল, ঠিক তখনই হাজার মাইল দূরে স্পেনের জার্সিতে মেরিনো পুরো দেশকে মাতালেন শেষ আটে ওঠার উচ্ছ্বাসে।

ম্যাচের নির্ধারিত সময় তখন শেষের পথে। গ্যালারিজুড়ে দর্শকদের মেক্সিকান ওয়েভের মাঝেই ডি-বক্সের ঠিক বাইরে ফাউলের শিকার হন মেরিনো। অন্য খেলোয়াড়েরা যখন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়েছেন, মাত্র ছয় মিনিট আগে বদলি হিসেবে নামা মেরিনো তখনো পুরোপুরি সতেজ। একটুও সময় নষ্ট না করে তিনি দ্রুত ফ্রি-কিক নিলেন। বল বাড়ালেন ফাবিয়ান রুইসকে, সেখান থেকে ফেরান তোরেস হয়ে চমৎকার এক ফিরতি পাসে বল আবার চলে আসে মেরিনোর পায়ে। ডি-বক্সের ভেতরে নিখুঁত শটে পর্তুগিজ গোলরক্ষক দিয়োগো কস্তাকে পরাস্ত করলেন তিনি। স্পেনের তিন বদলি খেলোয়াড়ের দারুণ বোঝাপড়ায় নিশ্চিত হলো জয়।

দুই বছর আগে ইউরো ২০২৪-এর কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে ঠিক এভাবেই খেলা শেষের ৬৫ সেকেন্ড আগে গোল করে স্পেনকে সেমিফাইনালে তুলেছিলেন মেরিনো। এবার বিশ্বমঞ্চেও তার চেয়েও কম সময় বাকি থাকতে স্পেনের ত্রাতা হলেন তিনি।

তবে এই রূপকথার পেছনে রয়েছে এক আত্মত্যাগের গল্প। গত আট সপ্তাহের মধ্যে পাঁচ সপ্তাহই মেরিনো কাটিয়েছেন দেশের বাইরে। অথচ কয়েক মাস আগেও তাঁর বিশ্বকাপে খেলা নিয়ে তৈরি হয়েছিল ঘোর অনিশ্চয়তা। পায়ে চিড় ধরার খবর যখন প্রথম শোনেন, মেরিনো ভেবেছিলেন বিশ্বকাপ স্বপ্ন ওখানেই শেষ। কিন্তু স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে তাঁর ওপর ভরসা হারাননি, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন। চোটের কারণে মেরিনোকে টানা দুই মাস ক্রাচে ভর দিয়ে চলতে হয়েছে। জানুয়ারি থেকে বিশ্বকাপের আগপর্যন্ত মাঠে মাত্র ২৮ মিনিট খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। এমনকি চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে দলের সঙ্গে থাকলেও মাঠে নামার মতো ফিটনেস ছিল না তাঁর।

এই কঠিন লড়াইয়ে মেরিনোর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন তাঁর স্ত্রী লোলা। মেরিনো নিজেই জানিয়েছেন, সেই দিনগুলো লোলার জন্য কতটা কঠিন ছিল। লোলার নিজেরই তখন বিশ্রামের প্রয়োজন, অথচ সাত-আট মাসের গর্ভবতী হয়েও তিনি মেরিনোকে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে সাহায্য করতেন। একাকিত্ব আর অনিশ্চয়তার সেই দিনগুলোতে মেরিনো বই পড়ে আর কঠোর পরিশ্রম করে নিজেকে মানসিকভাবে ধরে রেখেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বিপদে মানুষ যতটা ভেঙে পড়ে, আসলে সে তার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী।

যে মানুষটি তিন মাস আগেও ঠিকমতো এক কদম ফেলতে পারছিলেন না, আজ তাঁর গোলেই স্পেন বিশ্বকাপের ট্রফির দিকে আরও একধাপ এগিয়ে গেল। ম্যাচ শেষে গলায় সান ফারমিনের সেই ঐতিহ্যবাহী লাল স্কার্ফ জড়িয়ে মেরিনো আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘যখন এমন কিছু ঘটে, তখন পেছনের সব কষ্ট আর ত্যাগের কথা মনে পড়ে যায়। চোটের দিনগুলো কিংবা সদ্যোজাত সন্তানের মুখটা দেখতে না পাওয়ার বেদনা—সবকিছুকে আমি শক্তি বানিয়ে মাঠে নেমেছিলাম। পরিবারের শেখানো কঠোর পরিশ্রমেরই ফল এই গোল।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত