
সময়ের হিসাব রাখার প্রযুক্তিতে বহু দশকের গবেষণার পর বড় ধরনের অগ্রগতি এসেছে। থোরিয়াম-২২৯ পরমাণুর নিউক্লিয়াই (নিউক্লিয়াসের বহুবচন) ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা এমন একটি কার্যকর নিউক্লিয়ার ঘড়ি তৈরি করেছেন, যা প্রচলিত পারমাণবিক ঘড়ির মতো ইলেকট্রনের শক্তি পরিবর্তনের ওপর নয়, বরং পরমাণুর নিউক্লিয়াসের শক্তি পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে সময় গণনা করে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সাফল্য একই সময়ে অর্জন করেছে ইউরোপ ও চীনের দুইটি স্বাধীন গবেষক দল। তাদের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে এআরএক্সআইভি নামক জার্নালে।
ভিয়েনার টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ লুকা তোসকানি দে কোলের নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় দল বলেছে, তাদের তৈরি ব্যবস্থা হলো এমন প্রথম নিউক্লিয়ার ঘড়ি, যা একটি পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংসম্পূর্ণ ডিভাইস হিসেবে কাজ করতে পারে। বর্তমানে ব্যবহৃত পারমাণবিক ঘড়ি প্রথম তৈরি হয় ১৯৫০-এর দশকে। এই প্রযুক্তি এতটাই নিখুঁত যে তাত্ত্বিকভাবে কয়েক বিলিয়ন বছরেও এক সেকেন্ডের বেশি সময়ের বিচ্যুতি হওয়ার কথা নয়।
এই ঘড়িগুলো কাজ করে ইলেকট্রনের নির্দিষ্ট শক্তিস্তরের মধ্যে যাওয়া-আসার ছন্দ পরিমাপ করে। লেজারের প্রভাবে ইলেকট্রন যখন এক শক্তি অবস্থা থেকে অন্যটিতে যায়, সেই পরিবর্তনই সময়ের মান নির্ধারণ করে।
অন্যদিকে নিউক্লিয়ার ঘড়ির ধারণা প্রথম সামনে আসে ২০০৩ সালে। এখানে সময় গণনা করা হয় পরমাণুর নিউক্লিয়াসের শক্তি পরিবর্তন অনুসরণ করে। কিন্তু এই প্রযুক্তি বাস্তবায়ন ছিল কঠিন, কারণ নিউক্লিয়ার রূপান্তরের জন্য সাধারণত ইলেকট্রনের তুলনায় অনেক বেশি শক্তি প্রয়োজন হয় এবং অধিকাংশ লেজার প্রযুক্তি সেই সীমায় পৌঁছাতে পারে না।
তবু গবেষকেরা নিউক্লিয়ার ঘড়ি নিয়ে কাজ চালিয়ে গেছেন একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণে। ইলেকট্রন পরমাণুর বাইরের অংশে অবস্থান করায় পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাব সহজেই পড়ে। ফলে পারমাণবিক ঘড়িও কিছুটা প্রভাবিত হতে পারে। কিন্তু নিউক্লিয়াস পরমাণুর গভীর কেন্দ্রে অবস্থান করে এবং বাইরের প্রভাব থেকে অনেক বেশি সুরক্ষিত থাকে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই বৈশিষ্ট্যের কারণে নিউক্লিয়ার ঘড়ি বর্তমান পারমাণবিক ঘড়ির তুলনায় আরও বেশি স্থিতিশীল হতে পারে। একই সঙ্গে এটি ডার্ক ম্যাটার অনুসন্ধান এবং প্রকৃতির মৌলিক ধ্রুবকগুলোর সম্ভাব্য পরিবর্তন পরীক্ষা করার শক্তিশালী উপকরণ হয়ে উঠতে পারে।
এর আগে, ২০০৩ সালের গবেষণায় দেখানো হয়েছিল, থোরিয়াম-২২৯ এই প্রযুক্তির জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। কারণ এর একটি অত্যন্ত নিম্ন-শক্তির রূপান্তর অবস্থা রয়েছে, যা নির্ভুল লেজার স্পেকট্রোস্কোপির আওতায় আনা সম্ভব। এরপর ২০২৪ সালে অস্ট্রিয়া ও জার্মানির গবেষকেরা থোরিয়াম-২২৯-এ সফলভাবে শক্তির রূপান্তর ঘটান এবং নিউক্লিয়াসকে ‘টিকটিক’ করাতে সক্ষম হন।
এর পরের চ্যালেঞ্জ ছিল সেই টিকটিককে বাস্তব সময় পরিমাপের যন্ত্রে রূপ দেওয়া। সেই ধাপই এখন সফলভাবে অতিক্রম করেছে দুই গবেষক দল। উভয় দলই ক্যালসিয়াম ফ্লুরাইড স্ফটিকের মধ্যে থোরিয়াম-২২৯ নিউক্লিয়াস স্থাপন করে এবং শূন্যস্থান-অতিবেগুনি লেজার ব্যবহার করে তাদের ঘড়ি পরিচালনা করে। তবে এরপর তাদের পদ্ধতিতে পার্থক্য দেখা যায়।
ইউরোপীয় দল তাদের ঘড়িকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যবস্থা হিসেবে তৈরি করে, যেখানে থোরিয়াম নিউক্লিয়াসের সাহায্যে একটি লেজারের কম্পাঙ্ক ধারাবাহিকভাবে স্থিতিশীল রাখা হয়। তারা তাদের প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাই করতে এটি একটি প্রতিষ্ঠিত ইটারবিয়াম-আয়ন পারমাণবিক ঘড়ির সঙ্গে তুলনা করে। পরীক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও কার্যক্ষমতার প্রমাণ পাওয়া যায়।
এ ছাড়া গবেষকেরা এই ঘড়ি ব্যবহার করে অতিহালকা ডার্ক ম্যাটারের সম্ভাব্য উপস্থিতিরও অনুসন্ধান চালান এবং কয়েকটি প্রচলিত তাত্ত্বিক মডেলের ওপর নতুন সীমা নির্ধারণ করেন। গবেষকদের ভাষ্য, থোরিয়াম-২২৯ রূপান্তরের উচ্চ সংবেদনশীলতার কারণে এই ফলাফল ডার্ক ম্যাটার ও ফোটনের পারস্পরিক সংযোগ নিয়ে বিশ্বের সেরা পারমাণবিক ঘড়িগুলোর পর্যায়ের প্রতিযোগিতামূলক তথ্য দিয়েছে। একই সঙ্গে শক্তিশালী বল ও কোয়ার্কের সঙ্গে সম্ভাব্য সংযোগ নিয়ে আগের গবেষণার চেয়েও উন্নত সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে।
অন্যদিকে চীনের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ বেইচেন হুয়াংয়ের নেতৃত্বাধীন চীনা দল ভিন্ন পথে অগ্রসর হয়। তাঁরা স্বাধীনভাবে তৈরি দুটি স্ফটিক ব্যবহার করে পরীক্ষা চালায়, যাতে বোঝা যায় প্রতিটি ডিভাইস একইভাবে সময় গণনা করতে পারে কি না। ফলাফলে দেখা যায়, দুই ঘড়ির কম্পাঙ্ক প্রায় অভিন্ন। এটি সলিড-স্টেট নিউক্লিয়ার ঘড়ির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি অগ্রগতি। কারণ যদি স্ফটিকভেদে নিউক্লিয়ার কম্পাঙ্ক বদলে যেত, তাহলে প্রতিটি ঘড়ির জন্য আলাদা ক্যালিব্রেশন প্রয়োজন হতো।
কিন্তু পরীক্ষার ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভবিষ্যতে নিউক্লিয়ার ঘড়ি পুনরুৎপাদনযোগ্য মানদণ্ডে পরিণত হতে পারে এবং গবেষণাগারের সীমা ছাড়িয়ে ব্যবহারিক প্রযুক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। চীনা গবেষক দল বলেছে, লেজার দিয়ে নিয়ন্ত্রিত পরমাণবিক নিউক্লিয়াসকে কার্যকর সময়মান হিসেবে ব্যবহার করার মাধ্যমে তারা কোয়ান্টাম মেট্রোলজিকে ইলেকট্রনিক রূপান্তর থেকে নিউক্লিয়ার রূপান্তরের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এর ফলে ক্ষুদ্রাকৃতির ঘড়ি, সলিড-স্টেট নিউক্লিয়ার কোয়ান্টাম সেন্সর এবং মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানের নির্ভুল পরীক্ষার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
যদিও নতুন এই নিউক্লিয়ার ঘড়িগুলো এখনো বিশ্বের সেরা পারমাণবিক ঘড়িকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি, গবেষকেরা মনে করছেন এটি কেবল সময়ের ব্যাপার। কারণ পারমাণবিক ঘড়ি প্রযুক্তির পেছনে প্রায় ৭০ বছরের উন্নয়ন ইতিহাস রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক এই সাফল্য একটি বিষয় পরিষ্কার করেছে, নিউক্লিয়ার ঘড়ি আর কেবল তাত্ত্বিক ধারণা নয়। এটি বাস্তবে কাজ করছে। আর যদি ২০২৪ সালে ভিয়েনার টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ থর্স্টেন শুমের পূর্বাভাস সত্যি হয়, তাহলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই নিউক্লিয়ার ঘড়ি সময় পরিমাপের বর্তমান মানদণ্ডকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।

প্রতিদিন পুরুষ থেকে নারী, আবার নারী থেকে পুরুষ—অ্যাভোকাডোগাছের ফুলের এই বিস্ময়কর লিঙ্গ পরিবর্তনের রহস্য অবশেষে উদ্ঘাটন করেছেন বিজ্ঞানীরা। নতুন এক গবেষণায় জানা গেছে, একটি নির্দিষ্ট প্রোটিন-কোডিং জিন অ্যাভোকাডোগাছের ফুলকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট ছন্দে লিঙ্গ পরিবর্তনে সহায়তা করে।
৩ দিন আগে
মানুষের আগে যদি পৃথিবীতে কোনো উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতা গড়ে উঠত, আমরা কি আজ তার কোনো চিহ্ন খুঁজে পেতাম? প্রশ্নটি শুনতে কল্পবিজ্ঞানের মতো মনে হলেও, বিজ্ঞানীরা একে পুরোপুরি অসম্ভব বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
৬ দিন আগে
আয়ারল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে কাউন্টি স্লিগোর এক কাদা চরে ভেসে এসেছে একটি গভীর সমুদ্রের গ্রিনল্যান্ড হাঙরের মৃতদেহ। প্রায় তিন মিটার দীর্ঘ এবং ২০০ কেজি ওজনের এই হাঙরটির বয়স অন্তত ১৫০ বছর বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা।
৬ দিন আগে
গণিত শাস্ত্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা হিসেবে পরিচিত ‘ফিল্ডস মেডেল’ অর্জন করেছেন চীন থেকে উঠে আসা দুই তরুণ গণিতবিদ। প্রায় এক শতাব্দী ধরে সমাধানহীন থাকা অত্যন্ত জটিল দুটি গাণিতিক সমস্যার সমাধান করে তাঁরা এই ইতিহাস গড়েছেন। ফিল্ডস মেডেলের দীর্ঘ ইতিহাসে এই প্রথম চীন থেকে পড়াশোনা শুরু করা কোনো নাগরিক...
৭ দিন আগে