Ajker Patrika

৪০০ বছর বাঁচে যে হাঙর, দীর্ঘায়ু ও মৃত্যুর রহস্য উন্মোচনের সূত্র খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৬, ১৩: ০২
৪০০ বছর বাঁচে যে হাঙর, দীর্ঘায়ু ও মৃত্যুর রহস্য উন্মোচনের সূত্র খুঁজছেন বিজ্ঞানীরা
সম্প্রতি আয়ারল্যান্ড উপকূলে ভেসে এসেছে ১৫০ বছর বয়সী এক হাঙর। ছবি: সংগৃহীত

আয়ারল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে কাউন্টি স্লিগোর এক কাদা চরে ভেসে এসেছে একটি গভীর সমুদ্রের গ্রিনল্যান্ড হাঙরের মৃতদেহ। প্রায় তিন মিটার দীর্ঘ এবং ২০০ কেজি ওজনের এই হাঙরটির বয়স অন্তত ১৫০ বছর বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা।

এটিই আয়ারল্যান্ডের উপকূলে কোনো গ্রিনল্যান্ড হাঙর আটকে পড়ার প্রথম ঘটনা। তবে ৪০০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারা এই প্রজাতির জন্য ১৫০ বছর বয়সকে ‘বেশ তরুণ’ বলেই বিবেচনা করছেন গবেষকেরা।

আইরিশ হোয়েল অ্যান্ড ডলফিন গ্রুপের সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী এমিলি ডি লুজ বলেন, ‘এটি খুবই দুঃখজনক। একটি হাঙরের প্রজননক্ষম হতে এবং বংশবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে অন্তত ১৫০ বছর সময় লাগে। এই হাঙরটি হয়তো সেই সুযোগটি পাওয়ার আগেই মারা গেল।’

আটলান্টিক মহাসাগরের ঝড়ে আয়ারল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে প্রায়শই মৃত সামুদ্রিক প্রাণী ভেসে এলেও, গ্রিনল্যান্ড হাঙরের আগমন এবারই প্রথম। স্থানীয় ভলান্টিয়ার ও বিজ্ঞানীরা মরদেহটি দেখতে পেয়ে পাখনা ও চোখ সুরক্ষায় সামুদ্রিক শৈবাল দিয়ে ঢেকে দেন, যাতে সামুদ্রিক চিল বা অন্যান্য পাখি ক্ষতি করতে না পারে।

পরদিন আয়ারল্যান্ডের ন্যাশনাল মিউজিয়ামের তত্ত্বাবধানে ক্রেন এবং লরির সাহায্যে মৃতদেহটি একটি আঞ্চলিক ভেটেরিনারি গবেষণাগারে স্থানান্তরিত করা হয়। প্রাচীন এই প্রজাতিটিতে শত শত বছর আগের অবিকৃত ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি থাকতে পারে—এমন আশঙ্কায় সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যবিধি মেনে এর ময়নাতদন্ত শুরু হয়।

ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্ক-এর সামুদ্রিক পরিবেশবিদ্যার গবেষক জেসমিন স্টেভেনো জেরেমালম বলেন, ‘মৃত প্রাণী নিয়ে কাজ করার সুবিধা হলো, এটি জীবিত প্রজাতি সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য জানিয়ে দেয়।’

মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘজীবী হিসেবে পরিচিত গ্রিনল্যান্ড হাঙর। এরা সাধারণত ৩০০ থেকে ৫০০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। বর্তমানে সমুদ্রে সাঁতার কেটে বেড়ানো প্রবীণ হাঙরগুলোর জন্ম হতে পারে বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক উইলিয়াম শেক্‌সপিয়ারের যুগে।

রানি ভিক্টোরিয়া ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের আমলে জন্ম নেওয়া এই হাঙরটির দেহে কোনো আঘাত বা জালের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এর শরীর থেকে প্রজনন অঙ্গ, ৩৪ কেজি ওজনের বিশাল হৃৎপিণ্ড, ৫০ কেজি ওজনের কলিজা এবং পাকস্থলী আলাদা করে পরীক্ষা করা হচ্ছে।

ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব আয়ারল্যান্ডের কিউরেটর অ্যামি গ্যারাটি জানান, হাঙরটির চামড়া সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে মিউজিয়ামে সর্বসাধারণের প্রদর্শনের জন্য রাখা হতে পারে।

গভীর ও শীতল মেরু অঞ্চলে বসবাসকারী এই হাঙরগুলোর বেঁচে থাকার কৌশল বিজ্ঞানীদের চমকে দিয়েছে। চলতি বছর প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে সুইজারল্যান্ডের বাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লিলি ফগ জানান, হাঙরটির চোখে বিশেষ পরজীবী থাকলেও এদের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয় না।

তিনি বলেন, ‘মানুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিশক্তি কমে গেলেও এই হাঙরের শতবর্ষী চোখে আলো শনাক্তকারী কোষগুলো পুরোপুরি সতেজ থাকে। কম আলোতে শিকারের সুবিধার্থে এদের চোখ লো-লাইট ক্যামেরার মতো কাজ করে।’

বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, গ্রিনল্যান্ড হাঙরের ডিএনএ স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেরামত করার বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে, যা বয়সের ছাপ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অকেজো হওয়া প্রতিরোধ করে। তা ছাড়া এদের ৩৪ কেজি ওজনের জরাজীর্ণ হৃৎপিণ্ড শত শত বছর ধরে কীভাবে সচল থাকে, তাও গবেষণার বিষয়।

উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক মহাসাগরে বিস্তার হলেও এই প্রজাতি সম্পর্কে খুব কমই জানতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা। আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ওশেনস নর্থ’-এর বিজ্ঞানী ব্রিন ডিভাইন বলেন, ‘এত বড় এবং বিস্তৃত একটি প্রজাতি হওয়া সত্ত্বেও এদের সম্পর্কে আমাদের জানা তথ্য অত্যন্ত সীমিত। এরা কোথায় প্রজনন করে বা একসঙ্গে কয়টি বাচ্চা দেয়—তা আজও রহস্য।’

গবেষকেরা হাঙরটির চোয়াল পরীক্ষা করে দেখেছেন, এর ওপরের সারির সোজা ধারালো দাঁত এবং নিচের করাতের মতো দাঁত সমুদ্রের তলদেশে মৃত প্রাণীর মাংস কেটে খাওয়ার উপযোগী।

পাকস্থলী খালি থাকলেও অন্ত্রে হজম হওয়া খাবারের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে। তবে ১৫০ বছরের এই হাঙরটির হঠাৎ মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ অনুসন্ধানে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও টিস্যু ল্যাবে আরও গভীর বিশ্লেষণের জন্য পাঠানো হয়েছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত