Ajker Patrika

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন: সামনের সারি থেকে অস্তিত্বের লড়াইয়ে

অর্চি হক, ঢাকা 
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন: সামনের সারি থেকে অস্তিত্বের লড়াইয়ে

দেশে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল অবদান। নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য অনন্য ভূমিকা রেখেছিল। তার কয়েক দশক পরে শেখ হাসিনার দীর্ঘ একনায়কতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটানোর সূচনাটি হয়েছিল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়েই। সরকারি চাকরির কোটা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তরুণসমাজের মধ্যে যে ক্ষোভের বারুদ জমতে থাকে, তাই একসময় ধসিয়ে দেয় শেখ হাসিনার মসনদ। এই আন্দোলনের পতাকাটি ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের (বৈছাআ) হাতে।

২০২৪ সালে বৈছাআকে কেন্দ্র করেই দানা বেঁধেছিল জুলাইয়ের শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলন। ৩৬ দিনের এই আন্দোলনে রাজপথের মূল সংগঠন ছিল এটি। দেশব্যাপী বিক্ষোভ গড়ে তোলে বৈছাআ। চাকরির কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন শেষমেশ সরকার পতনের এক দফা দাবিতে রূপ নেয়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে সেই এক দফা দাবি পূরণ হয়।

যেভাবে রূপ পায় বৈছাআ

২০১৮ সালে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটাব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট সেই বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করলে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহালের পথ তৈরি হয়। ১ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে এর বিরুদ্ধে শুরু হয় আন্দোলন। শিক্ষার্থীরা কোটা না রেখে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করার দাবি জানান। আন্দোলনকে সংগঠিত করার জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়কারীরা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামে সমন্বিত প্ল্যাটফর্মটি গড়ে তোলেন। এর আওতায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ, সমাবেশ, সড়ক অবরোধের মতো বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতে থাকেন।

রক্তঝরা আন্দোলনে সাফল্য

সরকার ক্রমেই বেশি করে কঠোরভাবে আন্দোলন দমন করতে থাকে। এতে শিক্ষার্থী ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণির কর্মজীবী এমনকি কিছু শিশুসহ বহু মানুষ হতাহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আওয়ামী লীগ সরকার কারফিউ জারি, সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং ইন্টারনেট সীমিত বা বন্ধ রাখার মতো পদক্ষেপ নেয়। ১৯ জুলাই মধ্যরাতে বৈছাআর সমন্বয়ক আবদুল কাদের ৯ দফা দাবি ঘোষণা করেন। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল ছাত্র হত্যার দায় স্বীকার করে জাতির কাছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমা চাওয়া; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ চার মন্ত্রীর পদত্যাগ; তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) ও প্রক্টরদের পদত্যাগ; শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারী পুলিশ সদস্য ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মী ও এসবের নির্দেশদাতাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় লেজুড়ভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা ইত্যাদি।

জুলাইয়ের শেষ দিকে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয় ছয় সমন্বয়ককে। চাপের মুখে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন তাঁরা। তবে বাইরে থাকা ছাত্রনেতৃত্ব তা প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন চালিয়ে যান। ৩১ জুলাই রাতে সমন্বয়কেরা মুক্তি পাওয়ার পর ৩ আগস্ট হাসিনা সরকার পতনের এক দফার ডাক আসে। তার ৪৮ ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে পতন ঘটে হাসিনার।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পেছনে সাধারণ মানুষ ও মূলধারার বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন ছিল। তবে সবাইকে এক করে চব্বিশের আন্দোলনকে সফল পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব অকুণ্ঠভাবে শিক্ষার্থী তথা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকেই দেওয়া হয়। অথচ জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে জুলাইপন্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের কর্মসূচি থাকলেও বৈছাআর উল্লেখযোগ্য কোনো কার্যক্রম নেই। তবে নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের পাহাড় জমতে থাকায় গত বছরের জুলাইতেই সারা দেশের সব কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছিল। এ বছর কেন্দ্রীয় কমিটিও স্থগিত করা হয়।

যেভাবে গৌরব হারিয়ে এনসিপির ছায়ায়

৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বৈছাআ সদস্যদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠতে শুরু করে। অন্তর্কোন্দলের ঘটনাও সামনে আসতে শুরু করে। ক্রমে দুর্বল হতে থাকে সাংগঠনিক কার্যক্রম। এর ধারাবাহিকতায় জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের অনেককে নিয়ে ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ করে রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বৈছাআর বেশির ভাগ শীর্ষ নেতা এনসিপিতে যোগ দেন। কয়েক মাসের মধ্যেই সংগঠনের নেতৃত্ব সংকট, বিভক্তি এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস বেশি করে সামনে আসতে থাকে।

২০২৫ সালের ২৫ জুন কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়েছিল বৈছাআ। সেই কমিটিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হন যথাক্রমে রিফাত রশিদ ও ইনামুল হাসান। সারা দেশ থেকে সমন্বয়কদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আসা এবং চাঁদাবাজির অভিযোগে সমন্বয়ক গ্রেপ্তার হওয়ার প্রেক্ষাপটে গত বছরের ২৭ জুলাই সংবাদ সম্মেলন করে কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়া দেশের সব কমিটির কার্যক্রম স্থগিতের ঘোষণা দেন সভাপতি রিফাত রশিদ। এরপর চলতি বছর ১৮ এপ্রিল বৈছাআর কেন্দ্রীয় কমিটিও স্থগিত করা হয়। পরদিনই সর্বশেষ কমিটির সভাপতি রিফাত রশিদ ও মুখ্য সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলামসহ তিনজন এনসিপিতে যোগ দেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজধানীর রূপায়ণ ট্রেড সেন্টার ভবনের একটি তলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অফিস হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। পরবর্তী সময়ে এনসিপি ও তাদের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো সেখানে কার্যক্রম শুরু করে। এরপর কাটাবন এলাকায় একটি অফিস ভাড়া নেয় বৈছাআ। বর্তমানে তাদের আদৌ কোনো অফিস নেই বলে জানা গেছে।

কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যক্রম স্থগিত রেখে গঠিত পাঁচ সদস্যের উপদেষ্টা পর্ষদকে ৩০ দিনের মধ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম পুনর্গঠন করতে বলা হয়েছিল। তবে তিন মাস পেরিয়ে গেলেও নতুন কমিটি হয়নি।

উপদেষ্টা পর্ষদের সদস্য শাহাদাত হোসেন এবং অন্যদিকে সিনথিয়া আয়শাসহ নেতাদের একাংশ দুটি আলাদা পক্ষের প্রতিনিধিত্ব করছেন। উভয় পক্ষই কমিটি গঠন করে সংগঠনকে পুনরুজ্জীবিত করার কথা বলেছেন। কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত এবং পাঁচ সদস্যের উপদেষ্টা পর্ষদকে প্রত্যাখ্যান করেছেন সিনথিয়া আয়শা।

সব মিলিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কার্যত এখন নিষ্ক্রিয়। সংগঠনের প্রথম কমিটিতে থাকা সমন্বয়কেরাই অনেকে এই প্ল্যাটফর্মটির আদৌ অস্তিত্ব আছে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান। নানা অনিয়ম ও অভিযোগের কারণে বৈছাআ সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়েছে বলে মনে করেন তাঁদের কেউ কেউ।

বৈছাআর প্রথম কমিটির অন্যতম সমন্বয়ক এবং জুলাই আন্দোলনে ‘নয় দফার ঘোষক’ হিসেবে পরিচিত আব্দুল কাদের বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তার স্বতন্ত্র রূপ হিসেবে অভ্যুত্থানের সময় যেভাবে ভূমিকা পালন করেছে, প্রত্যাশা ছিল অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও শহীদদের বিষয়, আহতদের চিকিৎসা, একই সঙ্গে অভ্যুত্থানের স্পিরিট (চেতনা) সমুন্নত রাখার জন্য কাজ করবে। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে, সেটা আদতে সেভাবে পেরে ওঠে নাই।...বৈছাআ মনে হয় এখন বিলুপ্ত অবস্থায় আছে।’

বৈছাআ বর্তমানে নিষ্ক্রিয় কি না, এ প্রশ্নে সর্বশেষ কমিটির সভাপতি রিফাত রশিদ বলেন, ‘বর্তমানে যাঁরা দায়িত্বে, তাঁরা এর উত্তর দেবেন। আমি এইটার সঙ্গে এখন জড়িত নই।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত