
উগান্ডার কিবালে ন্যাশনাল পার্কে গত আট বছর ধরে চলছে শিম্পাঞ্জিদের এক রক্তক্ষয়ী ‘গৃহযুদ্ধ’। সম্প্রতি বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র মানুষের মধ্যকার গোষ্ঠীগত সহিংসতার প্রচলিত ধারণাগুলোকে নতুন করে মূল্যায়নের তাগিদ দিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কীভাবে ২০০ সদস্যের একটি সুসংগঠিত শিম্পাঞ্জি সমাজ হঠাৎ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে একে অপরের প্রাণঘাতী শত্রুতে পরিণত হয়েছে।
গবেষকেরা ২০১৯ সালে ‘ব্যাসি’ নামের ৩৬ বছর বয়সী এক পুরুষ শিম্পাঞ্জির ওপর বর্বরোচিত হামলার ঘটনা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে একই দলে থাকা ১৩টি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ শিম্পাঞ্জি হঠাৎ একজোট হয়ে ব্যাসিকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। তারা তাকে গাছ থেকে টেনে নিচে নামায় এবং সংগঠিতভাবে আক্রমণ শুরু করে। শিম্পাঞ্জিগুলো পালাক্রমে তাকে কামড়ে ও আঘাত করে নিথর করে দেয়। টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক এবং এই গবেষণার প্রধান লেখক অ্যারন স্যান্ডেল বলেন, ‘সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, শিম্পাঞ্জিরা তাদেরই হত্যা করছে যারা একসময় তাদেরই দলের অবিচ্ছেদ্য সদস্য ছিল।’
এর আগে ১৯৭০-এর দশকে তানজানিয়ার গোম্বে স্ট্রিম ন্যাশনাল পার্কে প্রখ্যাত গবেষক জেন গুডাল শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে এমন ভয়াবহ সংঘাত লক্ষ্য করেছিলেন। তিনি তখন শিম্পাঞ্জিদের চরিত্রের এই ‘অন্ধকার দিক’ দেখে এতটাই বিচলিত হয়েছিলেন যে এটি মেনে নিতে তাঁর দীর্ঘ সময় লেগেছিল।
যেভাবে শুরু হলো এই গৃহযুদ্ধ
কয়েক দশক ধরে ‘এনগোগো’ শিম্পাঞ্জি সম্প্রদায়টি প্রায় ২০০ সদস্য নিয়ে একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ দল হিসেবে মিলেমিশে বাস করত। তারা একসঙ্গে খাবার সংগ্রহ করত এবং একে অপরের যত্ন নিত। গবেষকদের মতে, এমন একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে হঠাৎ সংঘাতের প্রধান কারণগুলো হলো:
১. প্রবীণ নেতৃত্বের শূন্যতা: ২০১৪ সালে শ্বাসকষ্ট সম্পর্কিত এক মহামারীতে দলের ৫টি প্রভাবশালী বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষ এবং একটি নারী শিম্পাঞ্জি মারা যায়। এই প্রবীণরাই মূলত দলের বিভিন্ন উপদলের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতো। তাদের মৃত্যুতে দলের অভ্যন্তরীণ সামাজিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।
২. নতুন নেতৃত্বের আগ্রাসন: ২০১৫ সালে এক নতুন আলফা মেল বা প্রধান পুরুষ ক্ষমতা দখল করে। এই পরিবর্তনের ফলে দলের ভেতর প্রতিযোগিতা এবং অস্থিরতা চরমে পৌঁছায়।
৩. বিশাল সামাজিক আকার: সাধারণত শিম্পাঞ্জিদের দল ছোট হয়, কিন্তু ২০০ সদস্যের এই বিশাল বহরটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। ফলে সদস্যরা একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে।
২০১৮ সাল নাগাদ এই ফাটল পূর্ণতা পায় এবং দলটি ‘পশ্চিমপাড়া’ ও ‘মধ্যপাড়া’—এই দুই শত্রু শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
সহিংসতার পরিসংখ্যান
২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে গবেষকেরা পশ্চিমপাড়া গ্রুপের শিম্পাঞ্জিদের দ্বারা মধ্যপাড়া গ্রুপের ওপর ৭টি ভয়াবহ হামলা এবং ১৭টি নবজাতক শিম্পাঞ্জি হত্যার ঘটনা রেকর্ড করেছেন। গড়ে প্রতি বছর একটি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং দুটি নবজাতক এই যুদ্ধের বলি হয়। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক জন মিতানি আক্ষেপ করে বলেন, ‘গতকালকের প্রিয় বন্ধু কেন আজকের চরম শত্রু হয়ে উঠল? যাদের আমি তিন দশক ধরে জানি এবং ভালোবাসি, তাদের এভাবে একে অপরের ওপর চড়াও হতে দেখা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক।’
গবেষকেরা লক্ষ্য করেছেন, এই আক্রমণগুলো ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। তারা কেবল সুযোগ পেলেই আক্রমণ করে না, বরং ওত পেতে থেকে দুর্বল সদস্যদের খুঁজে বের করে। মায়েদের কাছ থেকে নবজাতকদের ছিনিয়ে নিয়ে হত্যার ধরনটি প্রমাণ করে যে তাদের মধ্যে গোষ্ঠীগত বিদ্বেষ কতটা শিকড় গেড়েছে।
মানুষের সহিংসতায় এই গবেষণার গুরুত্ব
এই গবেষণাটি মানুষের গোষ্ঠীগত সহিংসতার কারণ অনুসন্ধানে সমাজবিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবাচ্ছে। সাধারণত মনে করা হয়, ভাষা, ধর্ম বা সংস্কৃতির মতো সাংস্কৃতিক চিহ্নের কারণে মানুষের মধ্যে সংঘাত হয়। কিন্তু শিম্পাঞ্জিদের এই সংঘাত প্রমাণ করে:
ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভাঙন: কোনো সাংস্কৃতিক পার্থক্য ছাড়াই কেবল ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সামাজিক বন্ধন ভেঙে যাওয়ার ফলে চরম গোষ্ঠীগত সহিংসতা তৈরি হতে পারে।
গোষ্ঠীগত পরিচয়: যখনই শিম্পাঞ্জিরা একে অপরকে ‘পর’ বা ‘বহিরাগত’ মনে করতে শুরু করেছে, তখনই তারা খুনি হয়ে উঠেছে।
সহিংসতার মূলে সম্পর্ক: মানুষের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মূলে বৃহত্তর আদর্শগত পার্থক্যের চেয়েও ছোট ছোট ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্কের ভাঙন হয়তো অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
গবেষণাপত্রটির উপসংহারে বলা হয়েছে, শিম্পাঞ্জি সমাজের এই মেরুকরণ ও বিভাজন মানুষের সহিংসতার জৈবিক ও সামাজিক উৎস বোঝার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল।

পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো প্রাণের অস্তিত্বের এখনো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত খুঁজে চলেছেন এবং মহাবিশ্বে আমরা সত্যিই একা নই, এমন কোনো ইঙ্গিতের জন্য সংকেতও শুনে চলেছেন। এবার হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স এবং ইউনিভার্সিটি অব ওরেগনের...
৫ দিন আগে
পৃথিবীর আলো, উষ্ণতা ও প্রাণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস এই সূর্যকে আমাদের কাছে চিরস্থায়ী মনে হয়। কিন্তু মহাবিশ্বের কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। একসময় সূর্যও তার বর্তমান রূপ হারিয়ে ফেলবে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, এই পরিবর্তন ঘটতে এখনো বিপুল সময় বাকি।
৯ দিন আগে
আফ্রিকা মহাদেশ ধারণার চেয়েও দ্রুত দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার পথে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ভূতত্ত্ববিদেরা। মহাদেশটির একটি সক্রিয় রিফট বা ভূত্বক বিচ্ছিন্ন হওয়া অঞ্চল ইতিমধ্যে ‘গুরুত্বপূর্ণ সীমা’ বা ক্রিটিক্যাল থ্রেশহোল্ডে পৌঁছে গেছে। ফলে আগামী কয়েক মিলিয়ন বছরের মধ্যে এই অঞ্চল ভেঙে গিয়ে সেখানে...
৯ দিন আগে
মানব মস্তিষ্ক বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো, মস্তিষ্কের ভেতরেই একজন ‘মানুষের’ টিকে থাকা। কারণ মানুষ জীবিত থাকা অবস্থায় তার মস্তিষ্কের গ্রে ম্যাটার বা ধূসর পদার্থ নিয়ে বিজ্ঞানীরা ইচ্ছেমতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারেন না। ফলে মস্তিষ্ক কীভাবে বিকশিত হয়, কীভাবে এর বিভিন্ন অংশের মধ্যে সংযোগ তৈরি হয়...
১০ দিন আগে