Ajker Patrika

এআই ও পারমাণবিক যুদ্ধে ২১০০ সালের মধ্যে মানবজাতি বিলুপ্তির শঙ্কা, ল্যানসেটের প্রতিবেদন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১৭: ৩৫
এআই ও পারমাণবিক যুদ্ধে ২১০০ সালের মধ্যে মানবজাতি বিলুপ্তির শঙ্কা, ল্যানসেটের প্রতিবেদন
আগামী ৭৫ বছরে মানবস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ১৭টি হুমকি চিহ্নিত করেছেন গবেষকেরা। ছবি: এএফপি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ক্ষতিকর ব্যবহার কিংবা পারমাণবিক সংঘাতের কারণে ২১০০ সালের মধ্যে মানবজাতি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে নতুন এক বৈশ্বিক ঝুঁকি মূল্যায়নে। আগামী ৭৫ বছরে মানবস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ১৭টি হুমকির তালিকায় শীর্ষে রয়েছে এ দুটি ঝুঁকি। তালিকায় আরও রয়েছে ধনী দেশগুলোর উন্নয়ন সহায়তা ব্যয় কমানো, জলবায়ুসংকট ও শিশুদের অপুষ্টি।

‘দ্য ল্যানসেট কমিশন অন টোয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি গ্লোবাল থ্রেটস টু হেলথ’-এর বিশেষজ্ঞরা এই তালিকা তৈরি করেছেন। তাঁরা বলছেন, এসব ঝুঁকি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রতিটি ঝুঁকি মোকাবিলায় বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও জোর দিয়েছেন তাঁরা।

কমিশনের সহসভাপতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের পরিচালক অধ্যাপক ক্রিস্টোফার মারে বলেন, ‘আজ নেতারা যেসব সিদ্ধান্ত নেবেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলবে।’

হুমকির তালিকা তৈরি করতে কমিশন বর্তমান প্রবণতা বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি ঝুঁকির কারণে অসুস্থতা, অক্ষমতা কিংবা অকালমৃত্যুর ফলে কত বছরের সুস্থ জীবন হারাতে পারে, তার মডেল তৈরি করেছে। এ পরিমাপকে বলা হয় প্রতিবন্ধিতার কারণে সমন্বিত জীবনবর্ষ বা ‘ডিজঅ্যাবিলিটি-অ্যাডজাস্টেড লাইফ ইয়ারস’ (ড্যালিস)।

ল্যানসেটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘জৈব অস্ত্রসহ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ক্ষতিকর ব্যবহার এবং পারমাণবিক সংঘাতের সঙ্গে পারমাণবিক শীত ও দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি আগামী ৭৫ বছরে মানবজাতির বিলুপ্তির কারণ হতে পারে।’

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এসব ঘটনার সম্ভাবনা কম হলেও পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। পারমাণবিক সংঘাতের ক্ষেত্রে বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে পর্যাপ্ত পরিমাণ কণা ছড়িয়ে সূর্যের আলো আটকে দেওয়া হতে পারে। এতে দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে, এআইয়ের মাধ্যমে তৈরি জৈব অস্ত্রও মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

প্রতিবেদনটির সঙ্গে একই সময়ে প্রকাশিত দ্য ল্যানসেট-এর একটি সম্পাদকীয়তে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এসব ঝুঁকি বাস্তবে রূপ নিলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা মানবজাতির ওপর এক মহাপ্রলয় ডেকে আনবে।

যেসব ঝুঁকির কারণে সম্মিলিতভাবে ১০০ কোটির বেশি ‘ড্যালিস’ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে, সেগুলোকে বড় ধরনের বিপর্যয়কর হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এসব ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বায়ুদূষণ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা জীবাণুর ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে ওঠা, শৈশবে অপুষ্টি এবং জলবায়ুব্যবস্থার বিপর্যয়।

এ ছাড়া রয়েছে প্রচলিত যুদ্ধ ও সংঘাত, বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়া, অতিরিক্ত মদ্যপান, উচ্চ রক্তচাপ, আয়বৈষম্য, শিক্ষার নিম্নমান, প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট মহামারি, স্থূলতা, দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্য, ধূমপান এবং অস্বাস্থ্যকর বার্ধক্য।

তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য কোনো ঝুঁকির কারণে বিপুল পরিমাণ সুস্থ জীবন হারানোর আশঙ্কা থাকাই যথেষ্ট ছিল না; সেটি মোকাবিলার সম্ভাব্য সমাধানও থাকতে হয়েছে।

কমিশনের সদস্য এবং ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (ইউসিএল) সংক্রামক রোগের মহামারিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ইব্রাহিম আবুবকর বলেন, ‘আমরা এমন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজটি শুরু করিনি যে, দেখুন, আমরা আপনাদের ভয় দেখাতে চাই এটা বলে যে মানবজাতির সামনে এতগুলো হুমকি রয়েছে। বরং আমরা এ ধারণা থেকে কাজ শুরু করেছি যে, আপনি যদি আজ বিশ্বব্যাপী বহুপক্ষীয় পর্যায়ে কিংবা জাতীয় পর্যায়ে নীতিনির্ধারক হন, তাহলে এসব সম্ভাব্য হুমকির মুখোমুখি হতে পারেন। আর আপনি পদক্ষেপ নিলে কতটা পরিবর্তন আনতে পারবেন, তার মাত্রাও এখানে তুলে ধরা হয়েছে।’

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ৪ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে দেওয়ার পরিবর্তে তা প্রায় ১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখার পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ১৮৯ কোটি বছর সুস্থ জীবন হারানো ঠেকানো সম্ভব হতে পারে। প্রতিটি হুমকির ক্ষেত্রে সর্বোত্তম ও সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির মডেল তৈরি করে এ হিসাব করেছে কমিশন।

উচ্চ আয়ের অঞ্চলগুলোতে স্থূলতা ও দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্যের মতো অসংক্রামক রোগ প্রধান হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, নিম্ন আয়ের অঞ্চলগুলোতে শিক্ষার নিম্নমানের মতো বিষয়গুলো স্বাস্থ্যগত ক্ষতির বড় কারণ।

এদিকে গত এক বছরে উন্নয়ন সহায়তা ব্যয়ে বড় ধরনের কাটছাঁটের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ অনেক বড় দাতা দেশ। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসহায়তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা ব্যাপকভাবে কমে গেলে ২১০০ সালের আগে সর্বোচ্চ ১৫০ কোটি ‘ড্যালিস’ হারাতে পারে বিশ্ব। কমিশনের হিসাবে, এর প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষতি হবে সাব-সাহারান আফ্রিকায়। শিশুদের অপুষ্টির সবচেয়ে বড় বোঝাও বহন করছে এ অঞ্চল।

৩৫ জন বিশেষজ্ঞকে নিয়ে এই কমিশনটি গঠিত। স্থানীয় সময় আজ রোববার তাঁদের মূল্যায়নের ফলাফল জার্মানির বার্লিনে অনুষ্ঠেয় ওয়ার্ল্ড হেলথ সামিটে উপস্থাপন করা হবে। চিহ্নিত ১৭টি হুমকি নতুন তথ্য ও উদীয়মান ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে পুনর্মূল্যায়নের জন্য প্রতিবছর এ মূল্যায়ন হালনাগাদ করা হবে।

ঝুঁকিগুলো সংকটে রূপ নেওয়ার আগেই মোকাবিলার জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন গবেষকেরা। এ জন্য প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে বিনিয়োগ এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

ক্রিস্টোফার মারে বলেন, ‘তিন বছর আগে আমরা যখন এ প্রক্রিয়া শুরু করেছিলাম, তখন ভেবেছিলাম বড় তিনটি হুমকির কথা, সেগুলো হলো সংঘাত, জলবায়ু ও মহামারি। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, উদ্বেগের আরও অনেক বিষয় রয়েছে। এসব হুমকি আগেভাগে শনাক্ত করা, প্রতিরোধ করা এবং প্রস্তুতি নেওয়ার কাজে সরকারগুলোকে অর্থ ও জনবল বরাদ্দ করতে হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত